এভাবেই, দিনে দিনে বড়ো হতে লাগলো আমাদের বাহিনী। কখনও কখনও যখন বাতাস ধরে আসতো, আমাদের জাহাজের সমান্তরালে পৌঁছে যেতো হিকসস্ রথবহর। কিন্তু, চিরকালের মতেই, নদীর দেবী মাতা হাপি আমাদের সহায় ছিলেন, স্রোত ঠেলে আমাদের গ্যালিবহরে পৌঁছুতে সাহস করেনি কোনো হিকসস্ যোদ্ধা। তারপর আবার বাতাস আমাদের অনুকূলে বইতে লাগলো, আবারো রথবহর থেকে অনেক এগিয়ে গেলাম আমরা। ধুলোর মেঘ উত্তর দিগন্তে ক্রমশ হারিয়ে যেতে লাগলো।
ঘোড়া নিয়ে ওরা আমাদের ধরতে পারবে না, বারোতম দিন সকালে ট্যানাসকে বললাম আমি।
একেবারে নিশ্চিত হয়ো না। ফারাও মামোসের সম্পদের লোভ আছে স্যালিতিসের, দ্বৈত মুকুটের উত্তরাধিকারীও রয়েছে আমাদের সাথে। এতো সহজে হাল ছাড়বে না ওরা, ট্যানাস উত্তরে বলেছিলো। স্বর্ণ আর ক্ষমতার লোভ একজন মানুষের রোখ অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। এই বর্বরের শেষ দেখা এখনো বাকি আছে।
পরদিন সকালে আবারো ধরে এলো বাতাস। হাপির প্রবেশদ্বারের নিকটে এসে আমাদের অগ্রবর্তী জাহাজগুলোকে ছাড়িয়ে গেলো শত্রু রথ। এখানে, নদীর দুই তীর সংকুচিত হয়ে গেছে কালো গ্রানাইটের দেয়াল প্রায় ছুঁয়ে দিচ্ছে পরস্পরকে। দুই তীরের মধ্যবর্তী দূরত্ব এখন চারশো গজের মতো। বিপরীতমুখী স্রোতে পরে হাপির প্রবেশদ্বারে প্রায় থেমে পড়লো আমাদের জাহাজবহর। তরতাজা যযাদ্ধারাও দাঁড় টেনে কুলিয়ে উঠতে পারছিলো না।
আমার ধারণা, এখানেই ওরা আমাদের কাছে পৌঁছুতে চেষ্টা করবে, উদ্বিগ্ন স্বরে বললো ট্যানাস। প্রায় সাথে সাথেই হাত তুলে দেখালো সে। ওই যে!
নৌ-বহরের সামনে হোরাসের প্রশ্বাস মাত্র প্রবেশ করেছে হাপির দরোজা দিয়ে; উপরের পাথুরে দেয়ালে দাঁড়িয়ে তীর ছুঁড়ে দিতে লাগলো অসংখ্য তীরন্দাজ।
ওই উচ্চতা থেকে নদী দুই তীরে ইচ্ছেমতো আক্রমণ চালাতে পারবে তারা। বিড়বিড় করলো ট্যানাস। সারাটাদিনই তীরের আওতায় থাকতে হবে আমাদের। দারুন কঠিন দিন সামনে।
সত্যিই, ভীষণ একটা দিন ছিলো সেটা। আগুনে তীর নিয়ে হাপির প্রবেশদ্বারের গ্রানাইটের দেয়াল থেকে আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়লো হিকসস্ বাহিনী। উচ্চতার কারণে কোনো রকম প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হলো না আমাদের তীরন্দাজদের পক্ষে। দারণভাবে পর্যুদস্ত হলো মিশরীয় বাহিনী।
হাপির প্রবেশদ্ধারে পঞ্চাশটি জাহাজ হারিয়েছিলাম আমরা। গজ-দ্বীপের উদ্দেশ্যে আমাদের অব্যাহত যাত্রায় প্রতিটি জাহাজে রইলো শোকের কালো পতাকা। অবশেষে, দক্ষিণ অভিমুখী একটানা যাত্রায় ক্ষান্ত দিলো হিকসস্ বাহিনী। এখন আর উত্তর দিগন্তে চোখে পড়ে না ধুলোর মেঘ। মৃতদের জন্যে শোক করবার আর ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ মেরামত করার জন্যে একটু দম ফেলার সুযোগ পেলাম আমরা। ( যাই ঘটুক, একটি বারের জন্যেও আমরা বিশ্বাস করিনি হাল ছেড়ে দিয়েছে শক্ররা। ফারাও-এর সম্পদের লোভ সামলানো বড়ো কঠিন।
*
গজদ্বীপে আমাদের উপর নতুন কোনো আক্রমণ হলো না হিকসস্দের পক্ষ থেকে। বেশ ক দিন ধরেই অনুসরণরত রথের দেখা না পেয়ে আশায় বুক বাঁধলো জনতা। অনেকেই বলাবলি করতে লাগলো, দক্ষিণ যাত্রা বাতিল করে এখানেই সংঘবদ্ধ হয়ে নতুন সেনাবাহিনী গড়ে তুলে দখলদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়া উচিত আমাদের।
আমি অবশ্য এ ধরনের কথাবার্তায় মিসট্রেসকে কান না দেয়ার জন্যে পরামর্শ দিলাম। তাকে আশ্বস্ত করে জানালাম, ঐন্দ্রজালিক শক্তি আমাকে ভবিষ্যতের যে ছবি দেখিয়েছে, সে অনুযায়ী সঠিক পথেই আছি আমরা। দক্ষিণেই আছে আমাদের নিয়তি। এরই মধ্যে, অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রস্তুতি চালু রাখলাম। আমার ধারণা, হিকসস্ থেকে পলায়ন নয়, বরঞ্চ যাত্রাপথের রোমাঞ্চ ততোদিনে আমাকে অধিকার করে নিয়েছিলো।
জলপ্রপাতের ওপারে কী আছে–দেখতে চাই আমি। এক রাতে প্রাসাদের গ্রন্থাগারে বসে সেই সব স্বল্পসংখ্যক লোকের লিখে যাওয়া বর্ণনা পড়লাম, যারা একদা ওই অজানা দেশে গিয়েছিলো।
তাদের বর্ণনা মতে, এই নদীর কোনো শেষ নেই, পৃথিবীর শেষ পর্যন্ত এর বিস্ত তি। আরো জানা গেলো, প্রথম জলপ্রপাতের পরে একটি জলপ্রপাত আছে, যা এতো খাড়া কোনো মানুষ কিংবা জাহাজের পক্ষে পাড়ি দেওয়া অসম্ভব। জানলাম, প্রথম জলপ্রপাত থেকে দ্বিতীয় জলপ্রপাত পুরো এক বছরের যাত্রা, তার পরেও নাকি শেষ হয়নি নীল নদ।
এর শেষ দেখতে চাই আমি। আমি দেখতে চাই, কোথায় শুরু হয়েছে আমাদের এই মহান নদী–আমাদের জীবন।
শেষমেষ, আলো জ্বলা অবস্থাতেই ক্রোলের উপর মাথা রেখে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম। স্বপ্নে দেখি, সেই পর্বতের উপরে বসে আমাদের স্বাগত জানাচ্ছেন মহান দেবী; তাঁর বিশালকার যোনী থেকে উৎসরিত হচ্ছে দুটি জলের ধারা। সকালে ঘুম ভেঙ্গে জেগে আরো তরতাজা মনে হলো নিজেকে, উৎসাহ নিয়ে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লাম।
আমি ভাগ্যবান, গজ-দ্বীপে পুরো মিশরের শ্রেষ্ঠ লিনেন সুতার দড়ি উৎপন্ন হয়। জলপ্রপাত সফলভাবে পেরুতে হলে দড়ির কোনো বিকল্প নেই।
এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, আমাদের সঙ্গী অনেকের দুর্বল চিত্ত প্রকাশ হয়ে পড়লো গজদ্বীপে। অনেকেই বলাবলি করতে লাগলো, দক্ষিণের ভয়ঙ্কর হিংস্র জীব জন্তুতে পরিপূর্ণ মরুর চেয়ে বরঞ্চ হিকসস্দের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত। ট্যানাস যখন শুনলো, বেশ ক হাজার লোক অভিযান ছেড়ে চলে যেতে চাইছে, হতাশায় গর্জে উঠলো সে, বিশ্বাসঘাতক, চোর ওগুলো! কী করতে হয় এদের সাথে বিলক্ষণ জানা আছে আমার। জোর করে এদের জাহাজে ফিরিয়ে নিয়ে আসাই ছিলো ওর সিদ্ধান্ত।
