পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি, জলাশয়ের ধার থেকে কিছুটা দূরে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছেন ইনটেফ। আমার দৃষ্টির সামনেই, টলোমলো পায়ে উঠে দাঁড়ালেন তিনি, হয়তো নড়াচড়া না করে পরে থাকলে ওভাবেই ফেলে রেখে যেতাম তাকে সেদিন।
আচমকা, তীব্র রাগে-ঘৃণায় সর্বশরীর কেঁপে উঠলো আমার। চোখের সামনে যেনো রক্তের লাল পর্দা দেখতে পেলাম কমে গেলো দৃষ্টিশক্তি। জংলী, বুনো চিৎকার বেরিয়ে এলো বুক চিরে; ঘোড়া ঘুরিয়ে সোজা এগিয়ে চললাম ইনটেফের দিকে।
সরাসরি আমার পথে রয়েছেন ইনটেফ। অস্ত্র, বর্ম সবকিছু হারিয়েছেন পতনের সময়, মনে হলো ঘোরের মধ্যে আছেন তখনো। চাবুক কষিয়ে গতি আরো বাড়ালাম ঘোড়াগুলোর, যেনো উড়ে চললো রথ। দাড়ি নোংরা, মুখ-মাথা ধুলো আর রক্তে মাখামাখি-চোখেও কেমন যেনো ঢুলুঢুলু দৃষ্টি ইনটেফের। হঠাই, আমাকে দেখে মাথা পরিষ্কার হলো তার।
না! চিৎকার করে পথ থেকে সরে দাঁড়াতে চাইলেন, হাত বাড়িয়ে যেনো থামতে চাইছেন আগুয়ান রথ। সোজা তার দিকেই রথ চালিয়েছিলাম আমি, কিন্তু শেষবারের জন্যে অন্ধকারের দেবতারা আবারো সহায় হলো ইনটেফের। যখন প্রায় চড়ে বসেছি তার উপর, একপাশে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তিনি। যদিও আহত, এখনো শেয়ালের মতোই ক্ষিপ্র ইনটেফ। ভারী রথ ঘুরিয়ে তার নাগাল পাওয়ার আগেই সরে গেলেন। ঊর্ধ্বশ্বাসে জলাশয়ের নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে ছুটলেন। একবার ওখানে পৌঁছুতে পারলে বেঁচে যাবেন বুঝলাম আমি। বিড়বিড় করে অভিশাপ বকে আবারো রথ ছোেটালাম।
ঠিক সেই মুহূর্তে শেষপর্যন্ত ইনটেফকে ছেড়ে গেলো অন্ধকারের দেবতারা। জলাশয়ে প্রায় পৌঁছে গেছিলেন তিনি, ঘাড় ফিরিয়ে দেখছিলেন আমাকে হঠাৎই উঁচু শক্ত-কাদামাটির একটা ঢেলায় লেগে পা মচকে গেলো তার। সম্পর্ণ ওজন নিয়ে ওই পায়ের উপর পড়লো দেহটা, একটা ডিগবাজি খেয়ে শরীর কসরকারীর ভঙিমায় আবারো দাঁড়িয়ে পড়লেন। কিন্তু ভাঙ্গা গোড়ালির ব্যথা তাকে বেশিদূর এগোতে দিলো না। এক, পা দুপা এগোনোর পর পরে গিয়ে হেঁচড়ে এগুতে লাগলেন।
শেষমেষ তোকে পেয়েছি! চিৎকার করে বলে উঠলাম আমি। এক পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আমার দিকে ফিরে তাকালেন ইনটেফ। মুখ বিবর্ণ, চিতার মতো জ্বলজ্বলে চোখে শুধুই ঘৃণা আর তিক্ততা।
উনি আমার বাবা! রাজকুমারকে আঁকড়ে ধরে কেঁদে ফেললো লসট্রস। ছেড়ে দাও, মেরো না, টাইটা।
কখনো আমার কর্ত্রীকে অমান্য করিনি এর আগে সেই ছিলো প্রথম ও শেষ। একবারের জন্যেও ঘোড়াগুলোর গতিবেগ কমানোর কোনো চেষ্টা করলাম না, সরাসরি ইনটেফের চোখে তাকিয়ে সোজা তার উদ্দেশ্যে চালিয়ে নিয়ে চললাম রথ ।
একেবারে শেষ মুহূর্তে, আবারো আমাকে ধোকা দিতে চেয়েছিলেন ইনটে। একপাশে ঝাঁপিয়ে পড়ে রথের চাকা এড়িয়ে গেলেন, কিন্তু ঘুরন্ত-ফলার নাগালের বাইরে যেতে পারলেন না। বর্ম ভেদ করে তার পেটের ভেতর সেঁধিয়ে গেলো চাকার কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসা ঝকঝকে ঘুরন্ত ছোরা; ইনটেফের পেটের নাড়ি-ভুড়ি আটকে গেলো ওটার সাথে। নিমিষেই লম্বা দড়ির মতো প্যাঁচ ছাড়ানো নাড়ি ঝুলতে লাগলো চাকার গা থেকে।
নিজের পিচ্ছিল নাড়ি রথের পেছন পেছন টেনে নিয়ে চললো ইনটেফকে। ধীরে গতি হারাতে থাকলো তার দেহ, কেননা প্রচুর প্যাঁচ-খোলা নাড়ি-ভুড়ি বেরিয়ে এসেছে ততক্ষণে তার পেট থেকে।
যতোদিন বেঁচে থাকবো, তার ওই আর্তনাদ আমার মনে থাকবে। সেই আর্তনাদের প্রতিধ্বনি এখনো আমার দুঃস্বপ্নে হানা দেয়। তাকে ভুলে যাওয়া কখনো সম্ভব নয় আমার পক্ষে, যতোই চাই।
অবশেষে, সমস্ত নাড়ি পেট থেকে বেরিয়ে যেতে খোলা মাঠে নিস্তেজ পড়ে রইলো ইনটেফের দেহ। আর কোনো শব্দ বেরুচ্ছে না গলা চিরে।
ঘোড়া থামালাম আমি। ট্যানাস নেমে এসে জড়িয়ে ধরলো লসট্রিস আর তার শিশুপুত্রকে। কাঁদছিলো মহারানি।
কী ভয়ঙ্কর মৃত্যু! যা-ই করে থাকুক-উনি আমার বাবা ছিলেন।
ঠিক আছে, শান্ত হও, ট্যানাস সান্ত্বনা দিয়ে চলছিলো ওকে। সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
দাদার নিথর পড়ে থাকা দেহের দিকে একমনে তাকিয়ে দেখলো ছোট্ট মেমনন। আচমকা, তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠলো সে, ও একটা বিশ্রী লোক।
হ্যাঁ, একমত হলাম আমি। সত্যিই, উনি একজন বাজে লোক ছিলেন।
বাজে মানুষটা কি মরে গেছে?
হ্যাঁ, মেম, মরে গেছে। এখন থেকে রাতে ভালো করে ঘুমোত পারবো আমরা।
ভীষণ দ্রুতগতিতে নদীর ধার ধরে ছোটাতে হলো রথ, অবশেষে, কাতাসের গ্যালির সমান্তরালে চলে আসতে শক্র রথের মধ্যে আমাদের সনাক্ত করতে সক্ষম হলো ক্ৰাতাস। এতোদূর থেকেও ওর বিস্ময় টের পাওয়া গেলো। পরে সে আমাকে বলেছিলো, তার ধারণা ছিলো সামনের কোনো একটা জাহাজে আগেই চড়েছিলাম আমরা।
রথ ত্যাগ করার আগে ঘোড়াগুলোকে ছেড়ে দিয়েছিলাম আমি। কাতাসের পাঠানো ছোট্ট নৌকায় চড়ে আমরা সবাই পৌঁছেছিলাম জাহাজে।
*
এতো সহজে আমাদের চলে যেতে দেবে না হিকসস্ বাহিনী। দিনের পর দিন নদীর দুই তীর ধরে আমাদের অনুসরণ করে চললো তাদের রথ বহর।
হোরাসের প্রশ্বাসের পিছনে তাকালেই শরথের বিশাল ধুলোর মেঘ চোখে পড়তো। চলতি পথে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছিলো হিকসসেরা। প্রতিটি ছোট্ট মিশরীয় নগর থেকে নৌকায় করে আমার নৌ কাফেলায় যোগ দিতে লাগলো অসহায় অধিবাসীরা।
