টেনে-হিঁচড়ে উঠে বসে, একটানে দাঁড় করালাম লসট্রিসকে। মেমননকে আঁকড়ে ধরে থাকো! গলা দিয়ে যেনো কোলাব্যাঙের আওয়াজ বেরুলো। ভীষণ রাগে উন্মত্ত রাজকুমার হুঙ্কার ছাড়ছে থেকে থেকে, রথে উঠে বসে ওকে জোরে ধরে রাখলো লসট্রিস। লাফিয়ে ওদের টপকে, ঘোড়াগুলোর লাগাম হাতে নিলাম আমি।
শক্ত করে ধরে থাকো! আমার লাগামের ঝাঁকিতে সাথে সাথে সাড়া দিলো ঘোড়া দুটো, মসৃণভাবে দেয়ালের কাছ ঘেঁষে থামালাম রথ।
ট্যানাস, এইখানে! আমার চিৎকার শুনছে মিশরের বীরশ্রেষ্ঠ। লড়াই থামিয়ে দেয়ালে চড়লো সে, এক লাফে নেমে এলো বাম ধারের ঘোড়ার পিঠে। হাত থেকে ছুটে গেলো তলোয়ার, মাটিতে আছড়ে পড়ে ঝনঝন আওয়াজ তুললো। দুই হাতে ঘোড়ার গলা জড়িয়ে ধরে টানাস।
চলো! আমার আহ্বানে ছুটলো ঘোড়া দুটো। প্রাসাদের বাধানো পথ পেরিয়ে খোলা মাঠে পড়লো আমাদের রথ, সোজা নদীতীরের উদ্দেশ্যে ছুটতে লাগলো। মাঝ নদীতে আমাদের জাহাজের পাল দেখতে পাচ্ছি আমি, এমনকি হোরাসের প্রশ্বাসের পতাকাও চিনতে পারছি। আর মাত্র আধা মাইল পথ পাড়ি দিলেই জাহাজে চড়তে পারবো আমরা। উদ্বিগ্ন চোখে কাঁধের উপর দিয়ে ফিরে তাকালাম।
ইনটেফ আর শত্রু সৈনিকেরা সিঁড়িকোঠা বেয়ে ছুটে নেমে আসছে। দ্রুত অপর রথে চড়লো তারা। কেননা যে ওটাকে আসার পথে নষ্ট করে দিয়ে আসিনি, ভেবে আফসোসে মরে যেতে ইচ্ছে করলো। এক মুহূর্ত সময় লাগতো ওটার লাগাম আর দড়ি-দড়া কেটে ঘোড়াগুলোকে ভাগিয়ে দিতে।
এখন, আমাদের উদ্দেশ্যে ছুটে আসছেন ইনটেফ। কিছু সময়ের মধ্যেই বুঝলাম, আমাদের রথের চেয়ে ওটার গতি ঢের বেশি। একটা ঘোড়ার উপর আঁকড়ে বসে আছে ট্যানাস–ওর ওজনের কারণে গতি হারাচ্ছে ওটা। সম্ভবত সেই প্রথম ট্যানাসের চোখে মুখে ভয় দেখেছিলাম।
পিছনের কথা ভুলে গিয়ে সমস্ত মনোযোগ ঢেলে দিলাম সামনের পথে। সেচ খালগুলোর জটিল নকশা আর ছোটো ছোটো খানা-খন্দ পেরিয়ে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে রথ। আমার নকশা করা রথের তুলনায় অনেক ভারী হিকসস্ রথ, নিরেট কাঠের চাকা মাটিতে বসে যাচ্ছে। এছাড়াও, আমরা চড়ার আগে নিশ্চই অনেক পথ দৌড়েছিলো ঘোড়া দুটো। নাক দিয়ে ফেনা উঠছে ওদের।
অর্ধেক দূরত্বও পেরোইনি, পিছনে শক্র যোদ্ধাদের কর্কশ হুঙ্কার শুনতে পেলাম। মাত্র তিন রথ পেছনে এখন তারা, বিচিত্র এবং কর্কশ ভাষায় ঘোড়ার পিঠে চাবুক কষিয়ে চলেছে হিকসস্ চালক, পেছনে কাঠামোতে বসা ইনটেফের চোখে-মুখে শিকারীর জিঘাংসা।
চেঁচিয়ে আমার উদ্দেশ্যে মুখ খুললেন তিনি, টাইটা, পুরোনো প্রেমিক আমার এখনো ভালোবাসো আমাকে? মরার আগে আরো একবার না হয় প্রমাণ করো, কতোটা ভালোবাসো। অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন ইনটেফ। আমার সামনে নত হয়ে মুখে ওটা নিয়ে মরবে তুমি!
ছোট্ট একটা সেচের জলাশয় এড়ানোর জন্যে রথ ঘুরিয়ে নিলাম আমি। সাথে সাথে নিখুঁতভাবে পিছু নিলো হিকসস্ রথ, প্রতি মুহূর্তে ধরে ফেলছে আমাদের।
আর তুমি আমার সুন্দরী কন্যা, হিকসস্ সৈন্যরা তোমাকে নিয়ে ফুর্তি করবে! হেরাব তোমাকে দিতে পারেনি, এমন কিছু ওরা শেখাবে তোমাকে। তোমার পুত্র তো এখন আমার জিম্মায় প্রয়োজন ফুরিয়েছে তোমার। বুকের কাছে মেমননকে আঁকড়ে ধরলো লসট্রিস মুখ পাড়ুর।
ইনটেফের উদ্দেশ্যে পরিষ্কার। রাজকীয় রক্তের কাউকে পুতুল হিসেবে ব্যবহার করে দুই রাজ্য শাসন করতে চায় স্যালিতিস এবং তিনি। সেই সুপরিচিত এবং প্রাচীন নকশা। ধীর হয়ে আসছে আমাদের ঘোড়াগুলোর গতিবেগ এখন আর চিৎকার করে কথা বলতে হচ্ছে না ইনটেফকে।
লর্ড হেরাব বহুদিন এর জন্যে অপেক্ষায় ছিলাম। কী করা যায় তোমাকে নিয়ে? প্রথমে, আমার মেয়ের সাথে সৈন্যদের আমোদ-ফুর্তি দেখবো দু জনে মিলে
চোখের কোণা দিয়ে দেখতে পেলাম, হিকসস্ ঘোড়া দুটো আমাদের সমান্তরালে চলে এসেছে। ইনটেফের পেছনে পাদানীতে দাঁড়ানো তীরন্দাজ তীর জুড়ছে তার প্রান্ত বাঁকানো ধনুকে। এতো কাছে থেকে লক্ষ্য ব্যর্থ হওয়ার প্রশ্নই উঠে না।
এই লড়াই-এ কোনো ভূমিকা নেই ট্যানাসের। নিজের অস্ত্র হারিয়েছে সে। কোনো রকমে টিকে আছে ঘোড়ার পিঠে। আমার কাছে কেবল একটা ছোরা আছে। মিসট্রেস নিরস্ত্র বাচ্চাকে নিজের শরীর দিয়ে ঢেকে রাখার প্রচেষ্টারত। এরপরই হিকসস্ চালকের ভুলটা আমার চোখে পড়লো। আমাদের এবং গভীর সেচ পুকুরের মাঝামাঝি স্থানে ঘোড়া দুটো দাবড়ে নিয়ে এসেছে সে। এখন আর রথ ঘোরানোর কোনো উপায় নেই।
আমাকে লক্ষ্য করে ধনুক উঁচালো তীরন্দাজ। আমাদের ডানপাশের চাকার সমান্ত রালে ছুটছে হিকসস্ রথ। একটুও অস্বস্তি না করে লাগাম টেনে ডানে নিয়ে গেলাম ছুটন্ত রথ। চাকার মাঝখান থেকে বেরিয়ে আসা ঘুরন্ত ফলা হিসহিস শব্দে হিকসস্ রথের ঘোড়া দুটোর পায়ের দিকে এগুলো। এতক্ষণে নিজের ভুল বুঝতে পেরে হতাশায় গুঙিয়ে উঠলো শুক্র চালক; এই ফলার হাত থেকে বাঁচতে ডানে সরতে পারবে না সে-ওপাশে সেচ পুকুর । আমার হঠাৎ অবস্থান পরিবর্তনের কারণে তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। কানে লেগে সামান্য একটু রক্ত ঝরালো কেবল। শত্রু রথের চালক এবারে দূরে সরে বাঁচতে চাইলো ধারালো ফলার আঘাত থেকে, কিন্তু সেচা জলাশয়ের পারে ঠেকে গেছে তার চাকা আর সরে যাওয়ার উপায় নেই। আচমকা পার ভেঙে ধীরে ডেবে যেতে লাগলো হিকসস্ রথের এক পাশের চাকা। সুযোগ বুঝে আবারো পাশে চাপিয়ে আনলাম আমাদের রথ; কাছের ঘোড়ার পিছনের পায়ে সেঁধিয়ে গেলো ঘুরন্ত ফলা। তীক্ষ্ণ চিহিহিহি স্বরে প্রতিবাদ করলো ওটা, বাতাসে ভাসছে চামড়া আর চুল। আবারো রথ পাশে সরিয়ে আনলাম আমি, এবারে আর চামড়া নয়, রক্ত আর হাড়ের কণা উড়ে গেলো বাতাসে। পা ভেঙ্গে গেছে হিকসস্ ঘোড়ার। সঙ্গী ঘোড়াসহ মাটিতে লুটিয়ে পড়লো ওটা। জলাশয়ের ধার থেকে নিচে খসে পড়লো রথ। চাকার নিচে চাপা পড়ে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটলো চালকের। আমাদের রথও বিপদজনক ভঙিতে পারের কাছে চলে এসেছে, দ্রুত লাগাম টেনে নিরাপদে সরিয়ে নিলাম আমি ওটাকে। পিছনে ধুলোর মেঘ। গতি কমিয়ে থেমে দাঁড়ালাম। নদীতীর থেকে আর মাত্র দুইশো গজ মতো দূরত্বে রয়েছি কিছুই আর থামাতে পারবে না আমাদের ।
