তোমার ভৃত্যরা কোথায়? আতন আর লর্ড মারসেকেট? ট্যানাস জানতে চায় ।
জাহাজে পাঠিয়ে দিয়েছি ওদের।
টাইটা বললো, তুমি নাকি জাহাজে চড়তে চাইছো না?
হাসলো লসট্রিস। ওর হাসি আমাকে এক লহমায় জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে, আবার নিমিষেই ভেঙ্গে ফেলতে পারে এই হৃদয়। ক্ষমা করো, টাইটা।
বরঞ্চ, রাজা স্যালিতিসের কাছে ক্ষমা চাও, যে কোনো মুহূর্তে এখানে চলে আসবে সে। এক হাত আঁকড়ে ধরলাম রানির। এখন যখন তোমার এই অবাধ্য সৈনিক চলেই এসেছে, চলো, জাহাজে চড়ি।
চাতাল ছেড়ে প্রাসাদের গলিপথ ধরে ছুটলাম আমরা। এখন আর এমনকি চোর বাটপারেরাও নেই পুরো প্রাসাদে। ট্যানাসের কাঁধে চড়ে মেমনন তখনো ঘোড়া দাবড়াচ্ছে, চলো! এগোও! ধৈর্য্যের পিঠে চড়ে এই অভ্যাস হয়েছে তার।
নদীর খোলামুখের কাছে চলে গেছে প্রথম জাহাজ। পেটে শূন্য একটা অনুভূতি হলো–একমাত্র আমরাই তীরে রয়ে গেছি! পুরো জাহাজঘাটা জনশূন্য! হোরাসের প্রশ্বাসে পৌঁছুতে হলে এখনো আধা-মাইল খোলা ময়দান পেরুতে হবে আমাদের। থেমে পড়লাম সবাই।
এদিকে এসো! গর্জে উঠলো ট্যানাস। টাইটা, তোমার কর্ত্রীর দিকে খেয়াল রাখো। আমার পিছুপিছু! জলদি!
লসট্রিসের হাত ধরে টেনে নিয়ে চললাম আমি। কিন্তু সে নিজেই চঞ্চল রাখাল বালকের মতো ছুটছে। হঠাৎ খুব কাছে, ঘোড়ার হেষারব আর রথের ঝনঝনানি শুনতে পেলাম; এতো কাছে ভয়ে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড়। সাথে সাথে থেমে দাঁড়ালো আমাদের ছোট্ট দলটা।
হিকসস্! নরমস্বরে বললাম। সম্ভবত তাদের অগ্রবর্তী ছোট্ট একটা দল।
শব্দ শুনে মনে হলো দুই কি তিনটি রথ হবে, ট্যানাস বলে, কিন্তু, এ-ই যথেষ্ট। আমরা আটকে গেছি।
তখন যদি আমার অনুরোধ মতো জাহাজে চড়তে লসট্রিস, এমনটা হতো না। এতক্ষণে, হোরাসের প্রশ্বাস গজদ্বীপে পৌঁছে যেতো।
এক হাত উঁচু করে নীরবতা কামনা করলো ট্যানাস। শত্রু রথ এগিয়ে এসে থামলো দেয়ালের ওপাশে। কাছে এসে পড়তে নিশ্চিত হলাম, বড়োজোর তিন রথের একটা অগ্রবর্তী দল এটা।
আচমকা থেমে দাঁড়ালো তারা। বিচিত্র কোনো ভাষায় কথা বলছে রথের আরোহীরা, তাদের ঘোড়াগুলো অস্থির নড়াচড়া কানে আসছে। ঠিক আমাদের নিচে দাঁড়িয়ে এখন তারা। জরুরি ভঙ্গিতে ইশারা করে চুপ থাকতে বললো ট্যানাস, সবাইকে। কিন্তু রাজকুমার মেমনন এতে মোটেও প্রভাবিত হলো না পরিচিত আওয়াজ পেয়ে গেছে সে।
ঘোড়া! স্বভাবগত জোরালো রিনিঝিনি কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো সে। ঘোড়া দেখবো আমি!
সাথে সাথেই চিৎকার শোনা গেলো নিচে। নির্দেশ উচ্চারিত হতে অস্ত্র খাপ থেকে খুলে পাথরের সিঁড়ি কোঠা ভেঙ্গে ধুপধাপ দৌড়ে আসতে লাগলো হিকসস্ যোদ্ধারা।
পাঁচজন তারা তলোয়ার বাগিয়ে ধরে ছুটে আসছে আমাদের দিকে। বিশাল আকৃতির, মাছের আঁশের মতো বর্ম, উজ্জ্বল রঙের ফিতে ঝুলছে দাড়ি থেকে। একজন সবার চেয়ে লম্বা। প্রথমটায় চিনতে পারিনি আমি, কেননা বড়ো দাড়ি আর রঙিন ফিতে দিয়ে হিকসস্ সাজে নিজেকে সাজিয়েছে সে; কিন্তু যখন চেঁচিয়ে কথা বলে উঠলো, চিরপরিচিত সেই কণ্ঠস্বর চিনতে বেগ পেতে হলো না। আরে, এ যে দেখছি তরুণ হেরাব। বুড়ো কুকুরটাকে তো আগেই মেরেছি, এবারে এই কুত্তার বাচ্চটাকে শেষ করবো!
আমার আগেই বোঝা উচিত ছিলো, ফারাও-এর সমাধি-সম্পদের পেছনে লোলুপ হায়েনার মতো ছুটে আসাদের মধ্যে ইনটেফ প্রথম হবেন। নিঃসন্দেহে হিকসস্ বাহিনীর সামনে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটেছেন তিনি; ট্যানাসের প্রতি ঘৃণার বাণী উচ্চারণ কোরলেও ইশারায় রথ চালকদের ধন-সম্পদ লুটের জন্যে পাঠিয়ে দিলেন।
কাঁধ থেকে নামিয়ে পুতুলের মতো মেমননকে আমার উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দিলো ট্যানাস।
দৌড়াও! চিৎকার করলো সে। কিছুটা সময় পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো আমি তোমাদের! সিঁড়িকোঠায় গাদাগাদি করে দাঁড়ানো হিকসস্ যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে তেড়ে গেলো ট্যানাস। তলোয়ারের এক কোপে নিহত হলো প্রথম শত্রুসৈন্য; নিখুঁত ভঙ্গিমায় গলা দিয়ে সেঁধিয়ে দিয়েছে ট্যানাস।
ওখানে দাঁড়িয়ে হা করে থেকো না! কাঁধের উপর দিয়ে চেঁচিয়ে বললো ট্যানাস। দৌড়াও!
কিন্তু, কাঁধে মেমননকে নিয়ে কিছুতেই দৌড়ে নদী-তীরে পৌঁছুতে পারবো না আমি। প্রাসাদের দেয়াল বেয়ে উঠে উঁকি মেরে দেখলাম সামনে। আমার ঠিক নিচেই থেমে দাঁড়ানো দুটি হিকসস্ রথ, অসহিষ্ণু ঘোড়াগুলো নড়াচড়া করছে। কেবল একজন লোক আছে রথ পাহাড়া দেওয়ার জন্যে। সমস্ত মনোযোগ সামনে আমাকে উঁকি দিতে দেখলো না সে।
মেমননকে আঁকড়ে ধরে সরাসরি লাফিয়ে পড়লাম আমি। একজন লম্বা মানুষেরও চারগুণ দুরুত্ব অতিক্রম করতে হলো শুন্যে; পা ভেঙ্গে ফেলা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু হিকসস্ পাহারাদারের ঘাড়ের উপর পড়ায় এ যাত্রা বেঁচে গেলাম। মট করে হাড় ভাঙ্গার শব্দ হলো ঘাড় ভেঙ্গে গেছে অপ্রস্তুত পাহাড়াদারের।
তারস্বরে প্রতিবাদ করতে থাকা মেমননকে মাটি থেকে তুলে নিয়ে উপরে তাকালাম। ভয়ে ভয়ে নিচে উঁকি মেরে দেখছে লসট্রিস। কাছের রথে চালকের আসনে বসিয়ে দিলাম মেমননকে।
লাফ দাও! চেঁচিয়ে অভয় দিলাম রানিকে। আমি ধরবো তোমাকে। একটু অস্বস্তি না করে সাথে সাথে লাফিয়ে পড়লো লসট্রিস। তখনো প্রস্তুত হওয়ার সময় পাইনি আমি। সামলাতে না পেরে জড়াজড়ি করে পড়ে গেলাম ওকে নিয়ে ফুসফুস থেকে সমস্ত বাতাস বেরিয়ে গেছে সংঘর্ষের প্রাবল্যে।
