ঘোড়ার পালের একটা গতি হতে এবারে মানুষজনের দিকে খেয়াল দিলাম । জাহাজের সংখ্যা কমে যাওয়ায় খুব বেশি লোক সাথে নেওয়া সম্ভব হবে না। কোনো সন্দেহ নেই, প্রতিটি মিশরীয় এই তীর্থযাত্রায় যোগ দিতে চাইবে। আফ্রিকার মাটির অজানা বিপদ এখানকার হিকসস্ বর্বরতার বিপরীতে তুচ্ছ।
হিসাব কষে বের করলাম, জাহাজে মাত্র বারোহাজার মিশরীয় নাগরিকের স্থান হবে। মিসট্রেসকে জানালাম এ কথা। কিন্তু কিছুতেই কাউকে ছেড়ে যেতে রাজী হলো না সে। প্রয়োজনে নিজের এবং রাজকুমারের স্থানে অপর কাউকে নিতে অনুরোধ জানালো লসট্রিস।
অবশেষে, যখন রওনা হলাম আমরা, প্রতিটি জাহাজের গলুই পানি ছুঁই-ছুঁই করছিলো। সমস্ত পেশার লোক নিয়েছি সাথে প্রস্তরশিল্পী আর তাঁতী, কামার এবং কুমোর, চামড়া প্রক্রিয়াজাতকারী এবং রাজমিস্ত্রি, লিপিকার এবং শিল্পী, জাহাজের কারিগর এবং কাঠমিস্ত্রি নিজের নিজের পেশায় তারা সবাই শ্রেষ্ঠ। পুরোহিত আর আইনজ্ঞদের সবচেয়ে বিশ্রী জাহাজ বরাদ্দ করে যার-পর-নাই আনন্দ পেলাম, কেননা এরা হলো রাজ্যের রক্তচোষা জোকের মতো।
লোকজন তুলে নেওয়া শেষ হতে মন্দিরের ঘাটে ভিড়ালাম জাহাজগুলোকে। কোন্ ধন-সম্পদ আগে তোলা হবে এই নিয়ে চিন্তার অবকাশ ছিলো বৈকি। অস্ত্র শস্ত্র, যন্ত্রপাতি এবং সমস্ত কাঁচামাল সঙ্গে নিলাম, অজানা দেশে সভ্যতা গড়ে তুলতে হলে ওগুলোর বিকল্প নেই। অন্যান্য মালের ক্ষেত্রে যতোটা সম্ভব ওজন কমানোর দিকে লক্ষ্য রাখলাম। ফলমূলের বদলে সমস্ত গাছের চারা এবং বীজ নিয়ে নিলাম মুখ সীলগালা কার কাদামাটির পাত্রে।
কোথায় চলেছি, জানি না–দশ বছর, এমনকি পুরো জীবনও লেগে যেতে পারে। অত্যন্ত কঠিন হবে এই অভিযান। সামনের জলপ্রপাতগুলো পেরুতে হবে আমাদের–যতোটা সম্ভব জাহাজ হালকা রাখাটাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু, ফারাও-এর প্রতি আমার কর্ত্রীর শপথের কী হবে তাহলে? তাঁর সমাধি-সম্পদেরই বা কী হবে?
মৃত্যুর সময় রাজাকে কথা দিয়েছি আমি এসব রেখে যেতে পারবো না, একবাক্যে জানিয়ে দিলো রানি।
মহারানি, রাজার শবদেহ এমন একটা গোপন স্থানে রেখে যাবো–কেউ খুঁজে বের করতে পারবে না। থিবেসে যেদিন ফিরে আসবো আমরা, আবার উত্তোলন করে রাজকীয় মর্যাদায় তখন না হয় সমাধিস্থ করা যাবে।
যদি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করি, দেবতারা এই অভিযানে আমাদের সহায় হবেন না। রাজার শবদেহ আমাদের সাথেই যাবে। এক কথায় সিদ্ধান্ত দিয়ে দিলো রানি।
লসট্রিসের অজান্তে কফিনের দুই স্তর ফেলে দিলাম আমি, এতে করে ওজন কমলো যথেষ্ট। ক্যানভাসে মুড়ে, হোরাসের প্রশ্বাসের মালবহনের স্থানে রাখা হলো রাজকীয় কফিন। সমস্ত রাজকীয় সমাধি-সম্পদ সিডার কাঠের বাক্সে ভরা হলো। প্রতিটি জাহাজে সমান পরিমাণ সম্পদ বরাদ্দ করলাম। এতে করে যেমন সবগুলো জাহাজ সমান ওজন বহন করলো, একই সঙ্গে একটি জাহাজের ধ্বংসে সম্পূর্ণ সমাধি সম্পদের হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমলো ।
দারুন দ্রুততার সাথে সম্পন্ন হলো মালামাল উঠানোর কাজ। শেষ জাহাজ তৈরি হওয়ার আগেই প্রাসাদের ছাদে অবস্থান নেওয়া পরিদর্শক চিৎকার করে হিকসস্ রথের ধুলোর মেঘের দৃষ্টিগোচর হওয়ার কথা ঘোষণা করলো। কিছু সময়ের মধ্যেই যুদ্ধ বিধ্বস্ত ট্যানাস আর কাতাসের বাহিনী নেক্রোপলিস থেকে পিছু হঠে গ্যালিতে অবস্থান নিতে শুরু করলো।
প্রাণপণ লড়ে অন্তত দুই তিন দিন সময় দেরি করিয়ে দিতে পেরেছে তারা শত্রু বাহিনীকে। ক্লান্ত, আহত ট্যানাসকে চিৎকার করে ডাকতে, গোলমালের শব্দ ছাপিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো সে, রানি লসট্রিস আর রাজকুমার কোথায়? হোরাসের প্রশ্বাসে চড়েছে তো তারা?
জনতার ভীড় ঢেলে তার কাছে চলে এলাম আমি। সমস্ত জনতা জাহাজে না উঠা পর্যন্ত কিছুতেই চড়বে না মিসট্রেস। তুমি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আমাকে নির্দেশ দিয়েছে ও। প্রাসাদে, তার কক্ষে তোমার অপেক্ষায় আছে লসট্রিস।
বিস্ময়ে মুখ হা হয়ে গেলো ট্যানাসের। শক্ররা যে কোনো মুহূর্তে চলে আসবে এখানে! সব কিছুর চেয়ে রানি আর রাজকুমার জরুরি। তুমি তাকে জোর করোনি?
তুমি তো জানোই, ওর সাথে জেদ করে লাভ নেই।
সেথ এই মেয়ের গর্ব ধ্বংস করুক! চলো, নিয়ে আসি ওদেরকে।
ওই মুহূর্তে চিৎকার করে কেউ জানান দিলো, হিকসস্ চলে এসেছে! পালাও। সাথে সাথে চরম হুড়োহুড়ি, হৈ-হট্টগোল শুরু হয়ে গেলো। ছোট্ট জাহাজঘাটে একসাথে সবাই ধাক্কাধাক্কি শুরু করলো, হাতের ছুঁচালো লাঠি দিয়ে ঠেলে পথ করে এগুতে লাগলাম আমি এবং ট্যানাস। শেষমেষ প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় প্রাসাদের প্রধান দরোজায় পৌঁছুলাম।
শূন্য পড়ে আছে বিরাট কক্ষ আর গলিপথগুলো। কেবল ছিঁচকে কিছু চোর তখনো এটা-ওটা হাতিয়ে নেওয়ার প্রয়াসে আছে। ট্যানাসকে দেখেই দৌড়ে পালালো তারা। রানির প্রকোষ্ঠের খোলা দরোজা গলে এক ঝটকায় ঢুকে পড়লাম আমরা দুজন।
রাজকুমারকে কোলে নিয়ে চাতালে বসেছিলো লসট্রিস। বিশাল চাতালের সামনে নোঙর করা মিশরীয় জাহাজগুলো হাত তুলে মেমননকে দেখাচ্ছিলো সে।
দ্যাখো, কী সুন্দর জাহাজ!
আমাদের দেখতে পেয়ে দাঁড়ালো লসট্রিস, ওর কোল থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে দৌড়ে এসে ট্যানাসের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়লো মেমনন।
