ওই সরীসৃপ সম্পর্কে আরো বলো, পান করা শেষ হতে আমার কর্ত্রী বলে উঠলো।
তার বক্র দেহের কোনো শেষ নেই, সূর্যালোকে যেনো সবুজ আভা বিকিরণ করে চলছিলো। অদ্ভুত এক ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেলো ওটা তারপর–যেখানে লম্বা
অবয়বের উলঙ্গ মানুষের বসবাস, অসাধারণ জীব-জন্তুতে বোঝাই সেই ভূখণ্ড।
সরীসৃপের মাথা বা মুখ দেখতে পাওনি? লসট্রিসের প্রশ্নের উত্তরে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লাম।
কোথায় ছিলে তুমি? কোথাও দাঁড়ানো ছিলে? ভুলেই গেছিলাম, আমার স্বপ্নের ব্যাখ্যা বা সমাধান করা লসট্রিসের অত্যন্ত প্রিয় বিষয়।
আমি সেই সরীসৃপের পিঠে চড়ে ছিলাম, উত্তরে জানালাম। কিন্তু আমি একা নই।
আর কে ছিলো তোমার সাথে?
তুমি আমার পাশে ছিলে, মিসট্রেস; আর তোমার কোলে মেমনন। আমার আরেক পাশে ছিলো ট্যানাস। আমাদের সবাইকে পিঠে করে নিয়ে চলছিলো সেই সরীসৃপ।
নীল নদ! সরীসৃপটা হলো নীল নদ! খুশিতে চিৎকার করে উঠলো লসট্রিস । নদীর বুকে আমাদের অনাগত কোনো অভিযানের দৃশ্য দেখেছো তুমি।
কোন দিকে? এবারে ট্যানাস জানতে চাইলো। কোন দিকে চলছিলে সেই নদী?
সবকিছু মনে করার জোর চেষ্টা চালালাম আমি। আমার বাম দিকে সূর্য উদয় হতে দেখেছি।
তার মানে দক্ষিণে! চাপা কণ্ঠে বলে উঠে ট্যানাস।
আফ্রিকায়! আমার কর্ত্রী চেঁচিয়ে উঠে।
শেষপর্যন্ত সরীসৃপের মাথা দেখতে পেলাম সামনে। দ্বিধাবিভক্ত ছিলো তার দেহ, দুই অংশের জন্যে দুটো মাথা তার।
নীল নদের কী দুটো শাখা আছে? চিন্তিত ভঙ্গিতে জানতে চাইলো রানি। নাকি অন্য কোনো অর্থ আছে এই ধাঁধার?
তার চেয়ে বরঞ্চ টাইটার কাছ থেকে সবটুকু শুনে নেই আগে, লসট্রিসকে থামিয়ে দেয় টানাস। বলো, বুড়ো বন্ধু।
এরপর, দেবীকে দেখতে পেলাম, আমি বলে চলি, উঁচু একটা পর্বতের উপরে আসীন তিনি। সরীসৃপের দুটো মাথাই তাকে পূজো করছে সেখানে।
নিজেকে প্রবোধ দিয়ে রাখতে পারছে না মিসট্রেস। কোন্ দেবী? ওহ, টাইটা! বলো, কোন্ দেবীকে দেখেছো?
পুরুষের মতো দাড়ি-মুখো, কিন্তু নারীর স্তন্য আর জননেন্দ্রীয় রয়েছে তার। তার যোনী থেকে উৎসরিত বিশাল দুই জলের ধারা সরীসৃপের খোলা দ্বৈত-মুখে ঢুকছে।
এ যে দেবী হাপি নদীর দেবী। রানি ফিসফিসিয়ে উঠেন। নিজের অভ্যন্তর থেকে তিনি সৃষ্টি করেছেন এই মহান নদী, ঢেলে দিচ্ছেন তার জলধারা।
আর কী কী দেখলে, টাইটা? ট্যানাস জানতে চাইলো ।
আমাদের পানে চেয়ে হাসলেন দেবী, ভালোবাসা আর দয়ায় উজ্জ্বল তার মুখাবয়ব। বাতাস আর সাগরের গর্জনের মতো করে কথা বলে উঠলেন তিনি। দূর দূরান্তের পর্বতে বজ্রপাতের মতো শোনালো সেই শব্দ।
কী বললেন তিনি আমাদের? উত্তেজনায় অধীর হয়ে জানতে চায় লসট্রিস।
তিনি বললেন, আমার সন্তানকে আসতে দাও। তাকে শক্তিশালী করে দেবো আমি, কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারবে না ওর । বর্বরদের হাতে ধ্বংস হবে না আমার সন্তান। মাথার ভেতরে ঢাকের মতো বাজছিলো শব্দগুলো তখনো।
আমিই তো নদী-দেবীর সন্তান! দ্বিধাহীন স্বরে বলে উঠলো আমার কর্ত্রী । জন্মের সময় থেকেই আমি তার প্রতি একনিষ্ঠ। এখন তিনি ডাকছেন আমাকে, নীল নদের শেষ মাথা পর্যন্ত অবশ্যই যেতে হবে আমাকে।
এ যে সেই যাত্রা, একবার আমি আর টাইটা যার পরিকল্পনা করেছিলাম, আনমনা স্বরে ট্যানাস বলে। এখন তো দেবী স্বয়ং এর নির্দেশ দিলেন। তাঁকে অমান্য করা উচিত হবে না।
ঠিক। অবশ্যই সেই অজানা দেশে যাবো আমরা। কিন্তু ফিরে আসবো একদিন। নিশ্চই ফিরে আসবো। গাঢ় স্বরে বললো আমার কর্ত্রী । এটা আমার দেশ আমাদের এই মিশর। এ আমার নগরীএকশো দরোজার রূপসী থিবেস। চিরজীবনের জন্যে একে ছাড়তে পারবো না আমি। ফিরে আসবো এখানে এ আমার শপথ–দেবী হাপি সাক্ষী। আমরা ফিরে আসবো!
*
এতো বড়ো একটি অভিযানের জন্যে প্রস্তুতির কোনো সময় নেই আমাদের হাতে। দুই দিক হতে এগিয়ে আসছে হানাদার বাহিনী, সংবাদবাহকদের খবর মোতাবেক মেমনন প্রাসাদের ছাদে দাঁড়ালে আর মাত্র তিন দিনের মধ্যে দেখা যাবে শত্রুবহর।
ক্রাতাসের নেতৃত্বে অর্ধেক যোদ্ধাদের উত্তরে পাঠিয়ে দিলো ট্যানাস। ওদিক থেকেই বীর-বিক্রমে এগিয়ে আসছে রাজা স্যালিতিস, সবার আগে নেক্রোপলিস আর মেমনন প্রাসাদের তারই পৌঁছুনোর সম্ভাবনা। যতোদূর সম্ভব, রাজা স্যালিতিসকে দেরি করিয়ে দেয়াই হবে ক্রাতাসের দায়িত্ব।
ওদিকে, বাহিনীর বাকি যোদ্ধাদের নিয়ে দক্ষিণে, এসনা থেকে ধেয়ে আসা হিকসস্ বর্বরদের রুখতে ছুটলো ট্যানাস।
ইত্যবসরে আমাদের সমস্ত জনগণ আর মাল-সামান অবশিষ্ট জাহাজ-বহরে তুলে ফেলার তদারকির ভার পড়লো মিসট্রেসের কাঁধে। লর্ড মারসেকেটের অধীনে এই কাজ সম্পাদনের জন্যে দায়িত্ব পেলাম আমি। বলার অপেক্ষা রাখে না, লর্ড মারসেকেট নন, সমস্ত কাজ একা আমাকেই দেখভাল করতে হলো।
ওদিকে ঘোড়াগুলোর যত্ন নিতে হচ্ছে আমাকে। কোনো সন্দেহ নেই, এই প্রাণীগুলো ছাড়া আমাদের একবিন্দু আশা নেই। এস্নায় শত্রুদের ফেলে আসা ঘোড়া সমেত এখন আমার আস্তাবলে ঘোড়ার সংখ্যা বেশ ক হাজারে উন্নিত হয়েছে। ছোটো চারটি দলে ভাগ করে রেখেছি আমি প্রাণীগুলোকে।
রথ-চালকদের সহ হুই আর ঘোড়ার পালকে গজ-দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা করিয়ে দিলাম। ওদের উপর কঠোর নির্দেশ রইলো যেনো কিছুতেই নদীর তীর ঘেঁষে না যায়। যথাসম্ভব মরুর কাছাকাছি থেকে চলতে হবে তাদের।
