*
মেমননের প্রাসাদে যখন হিকসসুদের নদী পারাপারের সংবাদ পৌঁছুলো, জরুরি সভা ডাকলো মিশরের রানি। প্রথমেই ট্যানাসের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো সে।
এখন যখন নদী পেরিয়ে গেছে তারা, এই বর্বরদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন আপনি? হয়তো দেরি করিয়ে দিতে পারি তাদের, খোলাখুলি স্বীকার গেলো ট্যানাস। লড়তে পারি, টাইটার ছুঁচালো-পিপে দিয়ে হয়তো ক্ষয়ক্ষতিও করতে পারি কিন্তু ওদের থামানো সম্ভব নয়।
এবারে আমার পানে তাকালো রানি। টাইটা, তোমার রথের কী খবর? তারা কী হিকসস্দের সাথে যুদ্ধে জয়ী হতে পারে না?
মহারানি, মাত্র চল্লিশটি রথ যুদ্ধে পাঠাতে পারবো আমি। আর রাজা স্যালিতিসের বাহিনীতে আছে তিনশো রথ। তাদের দক্ষতা আর প্রশিক্ষণের কাছে আমরা কিছুই নই। এছাড়াও, চাকার সমস্যা এখনো রয়েছে, ওগুলোকে ত্রুটিহীন করতে সক্ষম হই নি আমি। খুব সহজেই আমাদের শেষ করে ফেলবে স্যালিতিস। সময় এবং সরঞ্জাম পেলে ত্রুটিহীন, নতুন রথ তৈরি করতে পারবো, কিন্তু ঘোড়ার কী হবে? ঘোড়া হারালে আর কিছুতেই উঠে দাঁড়াতে পারবো না আমরা।
এই তর্ক-বিতর্ক যখন চলছে, দক্ষিণ থেকে নতুন বার্তা নিয়ে এলো সংবাদবাহক। মাত্র একদিনের পুরোনো খবর আছে তার কাছে, ট্যানাসের নির্দেশে রানির পায়ের কাছে পড়লো সে।
বলো, কী বলার আছে তোমার? ট্যানাস জানতে চাইলো।
প্রাণভয়ে ভীত বার্তাবাহক শিউড়ে উঠে, মহারানি, আমাদের জাহাজবহর যখন আসয়ুতে ব্যস্ত আছে, এসৃনা দিয়ে আবারো নদী পেরিয়েছে শত্রুরা । পুরো দুই বাহিনী–এবারে সংখ্যায় অনেক বেশি। বিরাট ধুলোর মেঘ তুলে দক্ষিণে ছুটে আসছে হিকসস্। তিনদিনের মধ্যে এখানে পৌঁছে যাবে তারা।
নীরবতা নামলো সভাকক্ষে। রানি লসট্রিসের পায়ে চুমো খেয়ে প্রস্থান করলো বার্তাবাহক।
আমরা একা হতেই নরমস্বরে ট্যানাস বললো, মোট চারটি বাহিনী, অর্থাৎ ছয়শো রথ এখন নদীর এ পারে। সব শেষ।
না! তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলো আমার কর্ত্রী । আমাদের এই মিশরের দিক থেকে এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন না দেবতারা। আমাদের সভ্যতা এভাবে ধ্বংস হবে না। এই পৃথিবীকে বহুকিছু দেওয়ার আছে আমাদের।
আমি যুদ্ধ লড়তে পারি, অবশ্যই, সায় দিয়ে ট্যানাস বলে। কিন্তু কিছু আসবে যাবে না তাতে। শত্রু রথের বিরুদ্ধে আমরা অসহায়।
আমার দিকে ফিরলো মিসট্রেস। টাইটা, আগে এ অনুরোধ কোরিনি তোমাকে, কারণ আমি জানি কী ভীষণ কষ্ট হয় তোমার। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তোমাকে বলতেই হচ্ছে আমি চাই, আমার জন্যে আমন রা র ইন্দ্রজাল অনুশীলন করো তুমি। আমি জানতে চাই, দেবতারা কী চান আমার কাছে।
বাধ্যগতের মতো মাথা নিচু করে ফিসফিসালাম, এখনই আমার বাক্স নিয়ে আসছি।
*
অর্ধ-সমাপ্ত মেমনন প্রাসাদে, হোরাসের শ্রাবনের ভেতরের প্রকোষ্ঠে ঐন্দ্রজালিক-শক্তির আরাধনায় বসার সিদ্ধান্ত নিলাম আমি। যদিও এখনো হোরাসের মূর্তি তৈরি করা হয়নি এখানে, কিন্তু আমি জানি, তাঁর কৃপা রয়েছে আমাদের উপর।
ট্যানাসকে পাশে নিয়ে আমার সামনে বসলো রানি, ওদিকে একটা পাত্র থেকে ডাইনীর মিশ্রণ পান করে নিলাম; আমার কথা বা আত্মার নির্গমন ঘটবে কিছু সময়ের মধ্যেই।
সামনে আইভরি ধাঁধাগুলো রেখে ওগুলো হাতে নিয়ে এই মিশরের জন্যে নিজেদের উদ্বেগ আর ভালোবাসার কথা স্মরণ করতে বললাম ট্যানাস আর রানিকে। ওরা যখন নাড়াচাড়া করছিলো আইভরি চাকতিগুলো, টের পেলাম রক্তস্রোতে প্রবেশ করছে ওষুধ, ধীর হয়ে আসছে হৃদপিণ্ডের গতিবেগ, ছোট্ট এক মৃত্যু ঘটবে এখন আমার।
শেষ স্তূপ থেকে দুটো চাকতি নিয়ে বুকের কাছে তুলে ধরলাম। আগুনে-গরম হয়ে উঠতে লাগলো ওগুলো; ইচ্ছে হলো যে অন্ধকার ঘিরে আসছে আমার উপর, তা থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসি নিজেকে। বদলে, আত্মসমর্পণ করলাম সেই অন্ধকারে, দূরে দূরে কোথায় যেন চলে যেতে থাকলাম।
বহুদূর থেকে ভেসে এলো আমার কীর কণ্ঠস্বর। দ্বৈত-মুকুটের ভাগ্যে কী ঘটবে? এই বর্বরদের আমরা কেমন করে প্রতিহত করবো?
চোখের সামনে নানা দৃশ্য তৈরি হতে শুরু করলো, ভবিষ্যতের পরতে লুকিয়ে থাকা ঘটনাবলি পার হয়ে যেতে লাগলো আমাকে।
ছাতের ফাঁকা স্থান দিয়ে সূর্যরশ্মি এসে আলোকিত করে তুললো হোরাসের বেদী, শেষমেষ ধীরে, ধাঁধার জগত থেকে ফিরে এলাম আমি। বিভ্ৰম-সৃষ্টিকারী ওষুধের প্রভাবে দারুন আলস্য শরীরে, বমি পাচ্ছে; অসাধারণ যে ঘটনাবলি এই মাত্র দেখলাম ভয়ে কাঁপছে বুক।
সারারাত ধরে ট্যানাস আর রানি আমায় সঙ্গ দিয়েছিলো। আমন রা র ইন্দ্রজাল থেকে ফিরে এসে প্রথম ওদের দু জনের উদ্বিগ্ন মুখ আমার চোখে পড়েছে।
টাইটা, তুমি ঠিক আছো? কথা বলো। কী দেখলে, বলো আমাদের? চিন্তিত হয়ে গেছে মিসট্রেস। আমন রা র ইন্দ্রজাল ব্যবহারে আমার কষ্টে আপুত।
একটা সরীসৃপ দেখেছি, অদ্ভুত রকম প্রতিধ্বনি তুললো আমার কণ্ঠস্বর। বিশাল, সবুজ এক সরীসৃপ মরুর বুক চিরে এগিয়ে চলেছে।
ওদের দুজনের মুখাবয়বে ফুটে উঠলো হতবুদ্ধির ছাপ, অবশ্য আমি নিজেও এই দৃশ্যের কোনো মানে করে উঠতে পারি নি। তৃষ্ণা পেয়েছে, ফিসফিস করে বললাম। গলা শুকিয়ে গেছে আমার, জীভ যেনো পাথরের টুকরো। একটা পাত্র থেকে সামান্য সুরা ঢেলে এগিয়ে দেয় ট্যানাস। কৃতজ্ঞচিত্তে ওটা পান করে নিলাম।
