সামনের শত্রু সারির বর্মের আড়াল থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর ছুটে আসছে, হিসহিস শব্দে পাশ কেটে চলে যাচ্ছে। তাদের রণ-হুঙ্কার, শিরস্ত্রাণে আঁকা বিচিত্র জীব-জন্তুর ছবি সব পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি আমি। এরপরই, নিমিষে শক্রবৃত্তে ঢুকে পড়লো আমাদের রথ।
ঘোড়ার উন্মত্ত খুড়ের তলায় পিষ্ট হলো বহু হিকসস্ যোদ্ধা। আমার পাশে, রথের পাদানীতে দাঁড়িয়ে একের পর এক অব্যর্থ তীর ছুঁড়ে দিচ্ছে তীরন্দাজ। বহু যোদ্ধার মধ্য থেকে একে নির্বাচিত করেছি আমি, আজ সে যেনো তারই প্রত্যুত্তর দিচ্ছে।
আমার রথের তৈরি করা ফোকড় গলে শক্রবুহ্যে একে একে ঢুকে পড়তে লাগলো মিশরীয় রথবহর। হিকসস্ বৃত্ত পেরিয়ে গিয়ে আবারো ফিরে ফিরে আসতে লাগলাম আমরা, মিশিয়ে দিতে লাগলাম ওদের মাটির সাথে।
মুহূর্তে সুযোগ নিলো ট্যানাস, ওর পদাতিক বাহিনী নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো আক্রমণে। নিমিষেই ছত্রভঙ্গ হয়ে নদীর উদ্দেশ্যে দৌড়তে লাগলো হিকসস্ যোদ্ধারা প্রাণ হাতে করে। তীরের সীমানায় চলে আসতেই নদীতে অবস্থিত গ্যালি থেকে মিশরীয় তীরন্দাজেরা ঝাঁকে ঝাঁকে তীর ছুঁড়ে মারতে লাগলো তাদের উদ্দেশ্যে।
আমার সামনে, বিচ্ছিন্ন একটা হিকসস্ যোদ্ধার দল প্রাণপণ লড়ে আমাদের বাহিনীকে ঠেকিয়ে রেখেছে। রথ ঘুরিয়ে সোজা তাদের উদ্দেশ্যে ছোটালাম আমি। কিন্তু পৌঁছুবার আগেই বিকট শব্দে ফেটে গেলো আমার রথের ডানদিকের চাকাটা; সাথে সাথে উল্টে গেলো রথ-শূন্যে ভেসে ভীষণ গতিতে মাটিতে আছড়ে পড়লাম আমি । মাথাটা পড়লো আগে, বিভিন্ন আলোর ফুটকি জ্বললো চোখের সামনে। তারপর সব অন্ধকার।
যখন জ্ঞান ফিরলো, ট্যানাসের জাহাজের খোলা পাটাতনে শুয়ে আছি। ভেড়ার পশমের একটা মাদুরে শায়িত আমার উপরে উদ্বিগ্ন-মুখে ঝুঁকে বসেছিলো ট্যানাস। আমাকে নড়ে-চড়ে উঠে বসতে দেখে মুখাবয়বে কপট কাঠিন্য ফিরিয়ে আনলো সে।
তুমি পাগল বুড়ো গাধা! জোর করে হাসলো ট্যানাস। কী কারণে হাসছিলে যুদ্ধের ময়দানে, হু?
ঠিকমতো বসতেই আবারো চক্কর দিয়ে উঠলো মাথাটা, দুই হাতে চেপে ধরে গুঙিয়ে উঠলাম আমি। সব মনে পড়ে গেছে।
ট্যানাস–রাতের আঁধারে যে কয়টি শত্রু ঘোড়া নদী পাড়ি দিয়েছে–তার সব ক টা চাই আমার!
আর ওই ভাঙ্গা মাথাটাকে কষ্ট দিও না। ইতিমধ্যেই হুইকে পাঠিয়ে দিয়েছি আমি। আশ্বস্ত করে জানায় ট্যানাস। কিন্তু হিকসস্ বাহিনীর চেয়ে বরঞ্চ তোমার আবিষ্কার করা ওই চাকা বেশি বিপদজনক! যতোক্ষণ পর্যন্ত না ওগুলো ঠিক করার ব্যবস্থা করছো, আমি আর তোমার সাথে রথে চড়ছি না।
কিছু সময় লাগলো বুঝতে, নিজের গর্ব ভুলে গিয়ে আমাকে স্বাগত জানিয়েছে ট্যানাস। আমার এতিম রথ-বাহিনী অবশেষে মিশরীয় সেনাবাহিনীর অংশ হতে যাচ্ছে। প্রয়োজনে স্বর্ণ আর লোকবল দিয়ে আরো পাঁচশো রথ প্রস্তুত করতে দেবে ও আমাকে।
তবে, এসব কিছু নয়, সেদিন সবচেয়ে ভালো লেগেছিলো ট্যানাস আমাকে ক্ষমা করেছে জেনে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অটুট ছিলো আমাদের বন্ধুত্ব।
*
এসনায় আমার রথ-বাহিনীর সাফল্য এবং তার ফলশ্রুতিতে আমাদের উত্তুঙ্গ আত্মবিশ্বাস ছিলো ক্ষণস্থায়ী। এরপর যা ঘটেছিলো, আগেই ধারণা করেছিলাম আমি। কেননা, সেই মুহূর্তে ওটাই ছিলো শত্রুপক্ষের যৌক্তিক কার্যধারা; রাজা স্যালিতিস এবং ইনটেফের আরো আগেই এটা করার কথা।
আমরা জেনে গেছিলাম নিম্ন-রাজ্যে ধ্বংসলীলা চালানোর সময় লাল-ফারাও-এর নৌবাহিনীর সমস্ত জাহাজ নিজের দখলে নিয়ে ফেলেছিলো স্যালিতিস। ডেল্টায়, মেমফিস্ আর তানিস-এর জাহাজ তৈরির স্থানে ফেলে রাখা হয়েছিলো সেগুলো। যদিও হিকসসেরা নাবিক নয়, তবে গাঁজা বা যোপ্পা এবং সমুদ্রের পূবতীরবর্তী বন্দরগুলো থেকে ভাড়াটে নাবিক জোগাড় করে আনা কোনো কঠিন বিষয় নয়।
এ সবই অনুমান করেছিলাম আমি, কিন্তু ট্যানাস বা আমার কর্ত্রীকে ব্যাপারগুলো জানিয়ে আরো নিরাশ করতে চাইনি। স্যালিতিস বা ইনটেফের এই কৌশলের বিরুদ্ধে কিছুই ভেবে বের করতে পারিনি। কাজেই, যা ঠেকিয়ে রাখার কোনো উপায় নেই, তা বলে বলে সবার ভেতরে ভয় ছড়িয়ে দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না।
যখন সত্যিই ঘটলো এটা, আসয়ুতের বিপরীতে নদীর পুব তীর থেকে আমাদের গুপ্তচরেরা সতর্ক করে দিলো, ডেল্টা থেকে জাহাজবহর আসছে। নিজের গ্যালিবাহিনী নিয়ে উত্তরে ছুটলো ট্যানাস, ওদের ঠেকানোর জন্যে। স্যালিতিস বা ইনটেফের জলযানের চেয়ে তার গ্যালিবহর অনেক বেশি দক্ষ, শক্তিশালী। এক সপ্তাহব্যাপী মরণপণ লড়াইয়ের পর পর্যদস্ত শত্রুবাহিনী পিছু হঠতে বাধ্য হলো, আবারো ডেল্টায় ফিরে গেলো তারা।
কিন্তু, এই যুদ্ধের মূল সুযোগ নিলো স্যালিতিস; ডামাডোলের ভেতর সম্পূর্ণ দুই বাহিনী রথ আর সৈনিক নদী পার করে পশ্চিম তীরে নিয়ে আসলো সে। নদী পথের যুদ্ধে ব্যস্ত ট্যানাসের পক্ষে এবার আর তাদের ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হলো না।
তিনশো দ্রুতগামী যুদ্ধ-রথ নিয়ে স্যালিতিস স্বয়ং নেতৃত্বে ছিলো সেই হিকসস্ বাহিনীর। শেষমেষ আমাদের ছক উল্টে দিতে সক্ষম হলো সে, এখন আর তাকে থামানোর কোনো উপায় নেই। নদীর পশ্চিম তীর ধরে দক্ষিণে ধুলোর মেঘ উড়িয়ে ছুটে চললো শত্রু রথ-বহর। ফারাও মামোসের সমাধি-মন্দির অভিমুখে শত্রু বাহিনীর এই অগ্রযাত্রা চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার নেই গ্যালিবহরের।
