মূলত, আমার রানির একগুঁয়েমির কারণে শেষপর্যন্ত একটা রথ-বাহিনী প্রস্তুত করতে পেরেছিলাম। হুই আর আমি তিনদিনের মধ্যে ভেঙ্গে পড়া রথটা মেরামত করে নতুন আরো একটা তৈরি করে ফেললাম।
যতোদিনে সমাধি-মন্দিরের যাজকেরা ফারাও-এর শবদেহ মমি করার সত্তর দিবস-রজনীর আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করলেন, ততোদিনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালকসহ পঞ্চাশটি রথের প্রথম বাহিনী তৈরি হয়ে গেছে আমাদের।
*
মমি তৈরির আনুষ্ঠানিকতা শেষে কফিনে ঢোকানো হলো ফারাও এর শবদেহ। কিন্তু শত্রু অধ্যুষিত মিশরে তার মমি নিরাপদ নয়; যে কোনো মুহূর্তে লজ্জিত হওয়ার আশঙ্কা আছে, তাই ফারাওকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মোতাবেক যতোদিন পর্যন্ত না কোনো নিরাপদ স্থান খুঁজে পাওয়া যায়, তার শবদেহ সমাধিস্থ না করে কফিনেই রাখার সিদ্ধান্ত নিলো রানি।
তিন রাত পর তার এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণিত হলো। নদী পারাপারের হিকসস্ প্রচেষ্টা কোনোমতে রুখে দিলো ট্যানাস। এনার দুই মাইল উত্তরে অরক্ষিত অবস্থান দিয়ে নদী পার হতে চাইলো শত্রুরা। ঘোড়াগুলোকে সঁতরে পার করে, দলবেঁধে নৌকায় চড়ে পানিতে নেমে এলো হিকসস্ বাহিনী।
পশ্চিম তীরে পৌঁছতে সক্ষম হলো তাদের ঘোড়ার পাল, ঠিক সেই সময়ে গ্যালি নিয়ে ছুটে এলো ট্যানাস। রথের সরঞ্জাম নামিয়ে ঘোড়ার সঙ্গে জুড়ে ফেলার আগেই কতল করা হলো শত্রু যোদ্ধাদের। তাদের নৌকাগুলো রথসহ ডুবিয়ে দেওয়া হলো । হৈ-হট্টগোলের মধ্যে ছুটে পালিয়ে গেলো ঘোড়াগুলো। তিন হাজার শত্রুসৈন্য ততক্ষণে পশ্চিমতীরে অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। সারারাত ধরে চললো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। অন্ধকারে কেবল মশালের আলোয় হিংস্রতা নিয়ে পরস্পরের উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লো দুই বাহিনী। রথ ছাড়া হিকসসেরা মিশরীয় বাহিনীর সমানে সমান, মাত্র এক দল যোদ্ধা নিয়ে তাদের সঙ্গে পেরে উঠছিলো না ট্যানাস।
ওদিকে, দেবতাদের কোনো ইশারায় হয়তো, হুই আর আমি মিলে আমাদের পঞ্চাশ রথের বাহিনী নিয়ে এস্নায় প্রশিক্ষণ করছিলাম সেই সময়।
হোরাসের মন্দিরের পাশে, সবুজ বৃক্ষের ছায়াঘেরা একটা স্থানে ক্যাম্প ফেলেছিলাম আমরা। সারদিনের প্রশিক্ষণ শেষে ক্লান্ত আমি, রাতে তাঁবুতে পড়ে মরার মতো ঘুমোচ্ছিলাম, এ সময় হুই এসে জাগিয়ে তুললো।
নদীর তীর ধরে পশ্চিমে আগুন জ্বলছে! হুই বললো। বাতাস এদিকে বইলে হর্ষোধ্বনি শুনতে পাবে, কিছুক্ষণ আগে মনে হলো যেনো নীল বাহিনীর রণ-সংগীত শুনতে পেয়েছি আমি। ভীষণ যুদ্ধ চলছে ওখানে!
চিৎকার করে সবাইকে জড়ো করে রথে ঘোড়া জুড়ার নির্দেশ দিলাম আমি। অপটু হাতে ঘোড়া জড়ো করে রথে জুড়তে সকাল হয়ে এলো প্রায়। নদীর কুয়াশার ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে রথ-বাহিনী নিয়ে উত্তর রাস্তা ধরে এগুতে লাগলাম আমরা। সামনের রথে নেতৃত্বে রইলাম আমি, পিছনে থাকলো হুই। গতদিনের প্রশিক্ষণের পর পঞ্চাশ থেকে তিরিশে পরিণত হয়েছে আমাদের রথের সংখ্যা; কেননা, চাকার স্পোকের সমস্যা থেকে এখনো মুক্তির উপায় খুঁজে পাইনি আমি। গতিবেগ বেড়ে গেলে হঠাৎ টুকরো টুকরো হয়ে যায় চাকা। অর্ধেক রথ এ কারণে অকেজো হয়ে গেছে।
চলতে চলতে ভাবছিলাম, হুই হয়তো ভুল করেছে; কিন্তু হঠাৎই সামনে থেকে ভেসে এলো তামার সাথে তামার সংঘর্ষ, রণ-হুঙ্কার, আর্তনাদ আর হর্ষোধ্বনির চিরপরিচিত সেই আওয়াজ। কৃষকের তৈরি পথের বাঁক ঘুরতেই খোলা মাঠে পুরো রণ ক্ষেত্র দৃষ্টিগোচর হলো আমাদের।
হাঁটু-সমান উঁচু সবুজ শস্যক্ষেতে দাঁড়িয়ে লড়ে চলেছে হিকসস্ বাহিনী। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে হাতের বর্ম একে অপরের সাথে জোড়া লাগিয়ে দারুন লড়ছে তারা। আমাদের সামনেই তাদের বৃত্ত ধ্বংস করার ট্যানাসের আরো একটি প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দিলো হিকসস্ বীরেরা। শত্রুবুহ্যের কাছে আহত আর নিহতদের ফেলে রেখে পিছিয়ে যেতে বাধ্য হলো মিশরীয় বাহিনী।
যুদ্ধকৌশলের উপর স্ক্রোল লিখলেও আমি কোনো যোদ্ধা নই। নিরুপায় হয়ে রাজকীয় আস্তাবলের পরিচালকের পদ গ্রহণ করেছিলাম। রথ-বাহিনী তৈরি করে, রথ চালনায় অন্যদের দীক্ষা দিয়ে হুই বা আর কারো হাতে দায়িত্বভার তুলে দেওয়াই আমার উদ্দেশ্যে ছিলো।
শুনতে পেলাম, কর্কশ গলায় রথ-বাহিনীকে তীরের আকৃতিতে বিন্যস্ত হওয়ার জন্যে নির্দেশ দিচ্ছি আমি নিজে! গতকালই এই বিন্যাস নিয়ে প্রশিক্ষণ করছিলাম আমরা। দ্রুত অবস্থানে চলে এলো যোদ্ধারা। তীরের সামনে রইলো আমার রথ । হিকসদের থেকেই এই কৌশল রপ্ত করেছিলাম। বড়ো করে শ্বাস টেনে হাঁক দিলাম।
রথ-বাহিনী সামনে এগোও! ছুটে চলো! সামনে!
হাতের লাগামের সামান্য ঝুঁকিতে ধৈৰ্য্য আর ফলা দুর্বার গতিতে ছুটতে আরম্ভ করলো, রথের দেয়াল আঁকড়ে ধরে পতন সামলালাম আমি। সোজা হিকসস্ বৃত্তের মাঝে ঢুকে পড়লো আমাদের রথ-বাহিনী।
চারপাশে আর্তনাদরত সৈনিকের আস্ফালন, হেষারব, রণ-হুঙ্কারে কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়। আমি নিজেও উন্মত্ত কুকুরের মতো হুঙ্কার ছাড়ছি টের পেলাম।
পিছিয়ে আসা মিশরীয় যোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে গেলো রথ-বাহিনী। অবাক বিস্ময়ে আমাদের দিকে চেয়ে রইলো ওরা।
এসো! দ্যাখো, কেমন করে লড়তে হয়! অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বললাম আমাদের যোদ্ধাদের। ঘুরে, রথের পিছু পিছু ছুটলো মিশরীয় যোদ্ধারা। শক্রর উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমরা। পাশে তাকিয়ে ট্যানাসের শিরস্ত্রাণ নজরে পড়লো । ঢেউয়ের মতো রথের পাশে পাশে চলেছে সৈনিকের দল।
