রাজকীয় আস্তাবলের পরিচালক নিযুক্ত করলেন রানি আমাকে। অবশ্য, এই পদের জন্যে যে খুব প্রতিযোগিতা হয়েছিলো তা নয়, আর বিশাল কোনো বেতন-ভাতাও নেই এই চাকরিতে। হুইকে আমার সহকারী নিযুক্ত করলাম, ঘুষ না হয় ভয়-ভীতি অথবা হুমকি দিয়ে একশ জন সাহায্যকারী যোগাড় করে ফেললো সে। পরবর্তীতে এরাই হয়েছিলো আমাদের প্রথম রথ-চালক।
নেক্রেপলিসে, আমাদের অস্থায়ী আস্তাবল প্রতিদিন পরিদর্শন করতাম। সেই মাদী-ঘোড়া ধৈৰ্য্য আমাকে দেখলেই ছুটে এসে স্বাগত জানাতো। ওর আর ওর শাবকের জন্যে পিঠা নিয়ে যেতাম আমি। মাঝে-মধ্যেই, মা আর পরিচারিকার কাছ থেকে রাজকুমার মেমননকে কাঁধে করে আস্তাবলে নিয়ে যেতাম। ঘোড়া দেখার সাথে সাথেই চিৎকার করে নিজের আনন্দের কথা জানান দিতো রাজকুমার।
নদী তীর ধরে ধৈর্য্যের পিঠে চড়ে যখন ঘুরে বেড়াতাম, মেমনন আমার কোলে থাকতো। অবশ্য, একটা ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতাম যেনো আমাদের পথে ট্যানাস না পড়ে। আমাকে এখনো ক্ষমা করতে পারেনি সে, আর যদি দেখে তার ছেলেকে নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে ঘুরে ফিরছি, শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা আছে বৈকি আমার।
ফারাও-এর যুদ্ধাস্ত্র তৈরির কারিগরদের সহায়তায় প্রথম রথ তৈরির কাজে ব্যাপৃত হলাম। এখানেই, রথের নকশা তৈরির সময় হিকসস্ রথের বিরুদ্ধে আমাদের প্রথম প্রতিরক্ষা অস্ত্রের পরিকল্পনা করেছিলাম আমি। কাঁটাওয়ালা, শক্ত প্রান্তের ছোটো ছোটো ছুঁচালো ডগাসমৃদ্ধপিপে ছিলো সেগুলো। আমাদের বাহিনীর যোদ্ধারা নদী তীরে নিয়ে যাবে এই পিপেগুলো। শত্রু ঘোড়ার বুক সমান উঁচু পিপের আড়ালে আশ্রয় নিয়ে তীর ছুঁড়বে তারা। কাটার কারণে পিপের উপর চড়াও হতে শতবার ভাববে হিকসস্ বাহিনী ।
যখন ট্যানাসকে দেখালাম এই অস্ত্র, ঘোড়া নিয়ে আমাদের ঝগড়ার পর সেই প্রথম। সব ভুলে আমাকে আলিঙ্গন করলো সে। বুঝলাম, আমাকে ক্ষমা করে দিয়েছে সে।
অবশেষে, আমার প্রথম রথ তৈরি হলো। কাঠামো আর দেয়াল তৈরি হলো বাঁক চিরে। এক্সেল তৈরি হলো একাশিয়া গাছের ডাল থেকে। হাব হলো তামার তৈরি, গরুর চর্বিতে পিচ্ছিল-করা, চাকার শোক তৈরি হলো আমার সরু দণ্ড দিয়ে। এতো হালকা ছিলো সেই রথ, দুইজন যোদ্ধা মিলে অনায়াসে বহন করে উপযুক্ত স্থানে নিয়ে গিয়ে ঘোড়ার সাথে জুড়ে নিতে পারে। সাথে সাথে বুঝলাম, অসাধারণ একটা জিনিস হয়েছে ওটা। মিস্ত্রিরা নাম দিলো টাইটা-রথ ।
আমি আর হুই, আমাদের দুটো সেরা ঘোড়া ধৈৰ্য্য আর ফলাকে জুড়ে দিলাম রথের সাথে। প্রথমবারের মতো পথ-চলার জন্যে তৈরি হলো টাইটা-রথ । বেশ কিছুক্ষণ লেগেছিলো ওটা নিয়ন্ত্রণ করা শিখতে, কিন্তু ঘোড়াগুলো এতে অভ্যস্ত হওয়ায় তেমন কোনো সমস্যা হলো না চালাতে।
উত্তেজনায় লাল হয়ে আস্তাবলে ফিরলাম। আমরা দু জনেই নিশ্চিত, হিকসস্ রথের তুলনায় আমাদের বাহন দ্রুততর এবং হালকা। পুরো দশদিন-দশরাত জেগে মশালের আলোয় শেষ মুহূর্তের টুকিটাকি কাজ শেষ করতে ট্যানাসের দর্শনের জন্যে প্রস্তুত হলা টাইটা-রথ ।
নিরাসক্ত চেহারায় আস্তাবলে এলো ট্যানাস, আমার পিছন পিছন বিড়বিড় করে কিছু একটা বলতে বলবে চড়ে বসলো রথ-কাঠামোতে।
প্রথমটায় ধীরগতিতে ছোটালাম ঘোড়াগুলোকে, দেখলাম শিথিল হয়ে এলো ট্যানাসের শরীর, একটু একটু করে সেও উপভোগ করতে শুরু করেছে রথ-দৌড়নো। এরপর, দ্রুতগতিতে ছোটাতে লাগলাম ঘোড়াগুলোকে। দ্যাখো, কী গতিবেগ! একেবারে উড়ে গিয়ে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে এটা নিয়ে! বললাম ওকে।
প্রথমবারের মতো হাসলো ট্যানাস। উৎসাহ বাড়লো আমার । জাহাজ দিয়ে নদী শাসন করবে তুমি। আর এই রথ দিয়ে শাসন করবে জমিন। পুরো পৃথিবী শাসন করবে তুমি। কিছুই তোমার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে না।
এ-ই তোমার সর্বোচ্চ গতিবেগ? বাতাসের গর্জন ছাপিয়ে চেঁচিয়ে বললো ট্যানাস। বাতাসের সাহায্য পেলে হোরাসের প্রশ্বাস তো এর চেয়ে দ্রুত চলে। ডাহা মিথ্যে কথা; আসলে ট্যানাস দেখতে চাইছে আর কতো দ্রুত চলতে পারে রথ ।
দেয়াল আঁকড়ে ধরে থাকো! ওকে সতর্ক করে দিয়ে বললাম। ঈগলের মতো উড়িয়ে নিয়ে যাবো এবারে! ধৈৰ্য্য আর ফলাকে ছুটিয়ে দিলাম আমি।
এর চেয়ে দ্রুত কোনো মানুষ চলেনি এর আগে । বাতাসের ঝাঁপটায় চোখ বন্ধ, চুলে প্রচণ্ড টানে পানি ঝরছে ব্যথায়, হুলের মতো মুখে আঘাত করছে বাতাস।
আইসিসের মিষ্টি শ্বাসের কসম! উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠলো ট্যানাস। এটা তো আর কখনো জানা হয়নি, কী বলতে চাইছিলো সে, কেননা ও বাক্যটা সম্পূর্ণ করার আগেই পাথুরে টিলার সাথে সংঘর্ষে ফেটে গেলো একটা চাকা।
উল্টে পড়ে ডিগবাজি খেলা রথ, আমি এবং ট্যানাস শূন্যে নিক্ষিপ্ত হলাম। আছড়ে মাটিতে পড়ার মুহূর্তে ব্যথার চেয়ে বেশি পীড়া দিচ্ছিলো একটা ব্যাপার, এই দুর্ঘটনায় ট্যানাসের প্রতিক্রিয়া কী হবে, কে জানে।
পায়ের উপর দাঁড়িয়ে দেখি বিশ গজ মতো দূরে রক্তাক্ত হাঁটু ঝাঁপটে ধরে বসে আছে ট্যানাস। মনে হলো, মুখের একপাশের চামড়া হারিয়েছে সে, সারা মুখ-মাথা ধুলোয় মাখামাখি। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে অদূরেই পড়ে থাকা ধ্বংসপ্রাপ্ত রথের উদ্দেশ্যে চললো মিশরীয় সেনাপ্রধান। বেশ কিছুক্ষণ ওটার দিকে চেয়ে থেকে শেষে প্রচণ্ড একটা হুঙ্কার দিয়ে এতো জোরে লাথি কষালো ভাঙ্গা রথ-কাঠামোতে, বাচ্চাদের খেলনার মতো উল্টে গড়াতে লাগলো ওটা। একবারো আমার দিকে না তাকিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে চললো সে। এর এক সপ্তাহ পর পর্যন্ত ওর সাথে আর দেখা হয়নি আমার। এ বিষয়ে আমরা আর কখনো আলাপও করিনি।
