সম্ভবত, সেই আবনুবের সমভূমির আতঙ্কই শুধু নয়, ট্যানাসের নিজস্ব ধ্যান ধারণারও প্রভাব আছে এতে। যে কারণেই হোক, এমন একজন মিশরীয় যোদ্ধাকেও পেলাম না যে ঘোড়ার পিঠে চড়ে লড়তে চায়। কেবল হুই, আর বহু সময় পর, রাজকুমার মেমনন ছাড়া। অবশ্য, ঘোড়ার যত্ন নেওয়া, দলাই-মলাই করা শিখে নিয়েছিলো তারা। আমার প্রত্যক্ষ সাহায্যে দুর্ধর্ষ রথ-চালক হয়ে উঠেছিলো মিশরীয়রা, কিন্তু আমি, হুই আর রাজকুমার ছাড়া এমন একজন লোককেও পাইনি যে জীবনে কখনো ঘোড়ার পিঠে চড়েছে। হালকা স্পোক সমৃদ্ধ যে চাকা আমি নকশা করেছিলাম, তার উপর চড়া রথ যখন সমগ্র মিশরে আধিপত্য বিস্তার করেছিলো, আর মিশরীয়রা বনে গিয়েছিলো রথ-তৈরির শ্রেষ্ঠ কারিগর, ট্যানাস কখনোই এই সৃষ্টি গ্রহণ করে নি। তার জীবনকালে কখনো রথ-টানা বোবা প্রাণীগুলোর প্রশংসা করেনি সে।
*
পরবর্তী সময়ে যখন ঘোড়া হয়ে উঠেছিলো মিশরের স্বাভাবিক বাহন, এমনকি তখনো তেমন সম্মানের চোখে দেখা হতো না সওয়ারীকে। আমরা তিনজনে যখনই কোনো সাধারণ মানুষজনের পাশ দিয়ে ঘোড়ায় চড়ে যেতাম, মাটিতে তিনবার থুতু ফেলে নিজেদের বুকে শয়তানের বিপরীতে চিহ্ন আঁকতো তারা।
এসবই ভবিষ্যতের কথা; আর এখন, নীল নদের পশ্চিম তীর ধরে থিবেস অভিমুখে আমার ঘোড়ার পাল নিয়ে ছুটে চললাম। আমার কর্ত্রী দারুন আপুত হলো সুন্দর প্রাণীগুলোকে দেখে; অপরদিকে মিশরীয় সেনাবাহিনীর প্রধানের নিরুৎসাহী স্বাগতম জুটলো কপালে ।
এই শয়তান প্রাণীগুলোকে আমার থেকে দূরে রাখবে, এই বেলা বলে দিলাম, কঠোর স্বরে ট্যানাস বললো আমাকে। ওকে টেক্কা দিয়ে মিসট্রেসের সাথে যোগসাজশের জন্যে এখনো আমাকে ক্ষমা করতে পারেনি সে।
অবশ্য, তার এই কর্কশ মেজাজের পেছনে কারণও রয়েছে। রাজ্যের নিরাপত্তা এই মুহূর্তে ভয়াবহ হুমকির সম্মুখীন, আমাদের এই মিশরের ইতিহাসে কখনো এমন সময় আসেনি এর আগে।
ইতিমধ্যেই আসয়ুত হারিয়েছি আমরা; সেই ডানডেরা নদী পর্যন্ত সমগ্র পুব তীর এখন হিকসস্ বাহিনীর দখলে। নৌপথে পর্যুদস্ত হলেও একটু দমে যায়নি রাজা স্যালিতিস, বিপুল বিক্রমে নিজের রথ-বাহিনী নিয়ে ঘিরে ফেলেছে দেয়ালঘেরা থিবেস নগর।
অন্য কোনো ক্ষেত্রে হলে, থিবেসের এই দেয়াল প্রতিরক্ষার জন্যে যথেষ্ট, কিন্তু শত্রুশিবিরে ইনটেফের উপস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যতোদূর জানা গেছে, রাজ উজির থাকাকালে থিবেসের দেয়ালের নীচ দিয়ে একটা সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিলেন তিনি। এমনকি, আমি, যে ছিলাম তার বিশ্বস্ত দাস, পর্যন্ত জানতাম না এ কথা। যে মিস্ত্রি এই সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিলো, ইনটেফ পরে তাকে হত্যা করেছিলেন, যাতে করে তিনি ছাড়া আর কারো এই পথের কথা জানা না থাকে।
ইনটেফের কাছ থেকে প্রাপ্ত সংবাদে রাজা স্যালিতিস রাতের অন্ধকারে একটা ছোট্ট বাহিনী পাঠালেন সেই গোপন পথে । একবার দেয়ালের ভেতরে চলে আসতে, খুব সহজেই প্রধান ফটকের অপ্রস্তুত রক্ষীদের অতর্কিতে আক্রমণ করে তারা; মুহূর্তেই তাদের খুন করে হা করে মেলে ধরা হলো প্রধান ফটক। সাথে সাথেই প্রধান হিকসস্ বাহিনী বানের পানির মতো ঢুকে পড়লো শহরের অভ্যন্তরে, অল্প সময়ের মধ্যেই অর্ধেক থিবেসবাসী প্রাণ হারালো।
অর্ধ-সমাপ্ত মেমনন প্রাসাদে, পশ্চিম তীরে আস্তানা গেড়েছে মিশরীয় বাহিনী, নদীর ও পারের আগুনে পোড়া, ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ি-ঘর নজরে এলো আমাদের। প্রতিদিনই হিকসস্ রথ-বাহিনীর সৃষ্ট বিশাল ধুলোর মেঘ পুব তীরের এ মাথা থেকে ও মাথায় ছুটোছুটি করে কসরৎ চালিয়ে যেতো, ত দের বর্শার চকচকে ডগা আর বর্মের আলোর ঝিলিক আমাদের মনে করিয়ে দিতে সামনের ভয়াবহ যুদ্ধের কথা।
ক্ষয়িষ্ণু বাহিনী নিয়েও নদীর শাসন ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে ট্যানাস, আমার অনুপস্থিতির সময়টাতে আরো একবার হিকসস্দের নদী পেরোনোর প্রচেষ্ট রুখে দিয়েছে সে। কিন্তু বিশাল নদীর বড় অংশ পাহাড়া দিতে হচ্ছে তাকে, যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো স্থান দিয়ে পারাপার হওয়ার চেষ্টা চালাতে পারে হিকসস্ যোদ্ধারা। পুব তীরে আমাদের গুপ্তচর মারফত জানা গেলো, হাতের কাছের সমস্ত নৌযান প্রস্তুত রেখেছে তারা। থিবেসের বহু নৌ-কারিগর ধরে ধরে নৌকা তৈরিতে লাগিয়ে দিয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই, এই সমস্ত পরিকল্পনায় ইনটেফের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে; বর্বর স্যালিতিসের মতোই ফারাও-এর সমাধি-সম্পদের উপর তার লোভ কম নয়।
সারারাত ধরে পাহাড়া দিতে লাগলো গ্যালির প্রতিটি যোদ্ধা। নির্মুম সময় কাটাতে লাগলো ট্যানাস, আমি কিংবা মিসট্রেস তার চেহারাও দেখতে পেলাম না কদিন।
প্রতিরাতে প্রচুর শরণার্থীর আগমন ঘটতে পশ্চিম তীরে। বিভিন্ন বয়সের নারী ও পুরুষ ছোটো ছোটো জলযানে চড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নদী পাড়ি দিতে লাগলো। কেউ কেউ আবার সরাসরি সঁতরে নদী পেরুলো। হিকসস্দের ভয়াবহ অত্যাচার থেকে মুক্তি চায় এরা। হিকসস্ কর্মতৎপরতার নতুন বিবরণ পাওয়া গেলো এদের কাছ থেকে।
যদিও এদের স্বাগতই জানালাম আমরা, কেননা এরা তো আমাদেরই দেশের লোক, ভাই-বন্ধু-আত্মীয়; কিন্তু আমাদের ফুরিয়ে আসা রসদের উপর চাপ পড়লো এই কারণে। শস্যের মজুদ, গবাদি পশু-পাখি সব এই মুহূর্তে থিবেসে, হিকসস্ বাহিনীর দখলে। পশ্চিম তীরের সমস্ত খাদ্যভাণ্ডার সংগ্রহের দায়িত্ব দিলেন আমাকে রানি। ভাগ্য প্রসন্ন আমাদের, নীল নদে মাছের কোনো অভাব নেই, কখনোই না খাইয়ে মারতে পারবে না আমাদের হিকসস্ বাহিনী।
