একটা মাদী-ঘোড়া কাছে ঘেষে এসে মুখ দিয়ে নরম আওয়াজ করে উঠলো। গেয়ে চললাম আমি। পায়ের কাছে একটা শাবক নিয়ে ধীরে আরো কাছে এলো ঘোড়াটা।
জীব-জন্তুর প্রতি আমার বিশেষ অনুভূতি থেকে এতক্ষণে ঘোড়াগুলোর সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি করে ফেলেছি আমি, হুই-এর উপর আর নির্ভর করতে হচ্ছে না।
গাইতে গাইতে এক মুঠো শস্যদানা তুলে দিলাম ঘোড়ার মুখের কাছে। সাথে সাথেই বোঝা গেলো, হাত থেকে খাওয়ার অভ্যাস আছে এর; কাজেই আমার বাড়ানো হাতের মর্ম বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না তার। এখনো সেই অনুভূতি মনে পড়লে শিহরিত হই, যখন মুখ ডুবিয়ে আমার হাত থেকে শস্যদানা খেলো মাদী-ঘোড়াটা, সেই মুহূর্তটি কোনোদিনও ভুলে যাবো না। কাঁধে হাত বুলিয়ে দিতে একটু সরে গেলো না ওটা, নাক দিয়ে ওর চামড়ার অদ্ভুত-গরম গন্ধ নিতে লাগলাম।
ফাঁসটা, হুই নরম স্বরে মনে করিয়ে দিলো আমায়; ওর দেখানো পদ্ধতি অনুযায়ী ধীরে ঘোড়াটার গলায় পরিয়ে দিলাম দড়ির ফাঁস।
এখন থেকে ও তোমার, বললো হুই।
আর আমি ওর, চিন্তা-ভাবনা না করেই বলে উঠলাম আমি । সেই মুহূর্ত থেকেই পরস্পরের মায়াজালে বন্দী হলাম আমরা।
পালের বাকি ঘোড়াগুলো দেখেছে এই সবই। মাদী-ঘোড়ার গলার চারপাশে লাগামের ফাঁস পরিয়ে দিতে অন্যান্যগুলোও কাছাকাছি এসে হাত থেকে দানা খুঁটে খেতে লাগলো। ধীরে, একে একে সবগুলোর গলায় লাগাম পরিয়ে দিলাম আমি আর হই।
সেই সময় এই ব্যাপারটা খুবই আশ্চর্যজনক মনে হলেও পরে বুঝেছিলাম –সেটাই ছিলো স্বাভাবিক। জন্মকাল থেকেই মানুষের সান্নিধ্যে বড়ো হয়েছে প্রাণীগুলো; হাত থেকে দানা খেয়ে, আস্তাবলে একসঙ্গে বেড়ে উঠেছে। তবে সবচেয়ে অবাক ব্যাপার, ভালোবাসা বোঝে ওরা, ফিরিয়েও দিতে পারে!
আরো একটা মাদী-ঘোড়ার গলায় লাগাম পরিয়েছে দুই; সর্বক্ষণ বকবক করেই যাচ্ছে। এতে উৎফুল্লচিত্ত ছিলাম সেদিন, ওর বাগাড়ম্বরে কর্ণপাত করিনি।
ঠিক আছে, শেষমেষ বললো হুই, এবারে, চড়ে বসতে পারি আমরা। আমাকে চরম অবাক করে দিয়ে ওর মাদী-ঘোড়াটার পাছায় দুই হাত রেখে এক দোল খেয়ে পিঠে চড়ে বসলো সে। ঘোড়াটার হিংস্র প্রতিবাদের জন্যে অপেক্ষা করছি, হুই-কে এক্ষুণি মাটিতে ফেলে পিষে ফেলবে ওটা; চৌকোণা দাঁতে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে ওকে এই ছিলো আমার নিঃসন্দেহ ধারণা। কিন্তু এ সবের কিছুই করলো না ওটা, চুপচাপ দাঁড়িয়ে যেনো হুকুমের অপেক্ষায় রইলো।
চলো, প্রিয়তমা! হেঁকে উঠে, ঘোড়ার পেটে গোড়ালি দিয়ে গুতো দিতে লাগলো হুই। সামনে এগুলো ওটা, এরপর আবারো হুইয়ের পায়ের তোয় দুলকি চালে ছুটতে আরম্ভ করলো। দ্রুত পুরো মাঠে একটা চক্কর খেয়ে আমার কাছে ফিরে এলো ঘোড়া আর সওয়ারী।
এসো, টাইটা, ঘোড়া ছুটিয়ে দ্যাখো! পরিষ্কার বুঝলাম, আমি মানা করবো–এমনই আশা করছে হুই। সম্ভবত এই কারণেই রাজী হয়ে গেলাম–ওই ছোট্ট শয়তানটা আমার উপরে ছড়ি ঘোরাক, চাই না।
ঘোড়ার পেছনে উঠার আমার প্রথম প্রচেষ্টাটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো । কিন্তু মাজা শক্ত করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো মাদী-ঘোড়াটা। এর থেকে অনেক কিছু শেখার আছে তোমার, টাইটা। জানোয়ারটাকে বরঞ্চ ধৈৰ্য্য বলেই ডেকো। এতে অবশ্য মজার কিছু দেখলাম না আমি, কিন্তু টিকে গেলো নামটা। এর পর থেকে ধৈৰ্য্য নামেই পরিচিতি পেয়েছিলো মাদী-ঘোড়াটা।
পা ঘোরানোর আগে একটু বেশি উঁচুতে লাফাতে হবে, আর সাবধান, ভুলেও নিজের বিচির উপর বসে পোড়ো না যেনো! কর্কশ হাসিতে ফেটে পড়ে পরামর্শ দিয়ে চললো হুই। ওহ্ হো, এই পরামর্শ তোমার প্রয়োজন নেই। কারণ ওই জিনিস তো তোমার নেই। তবে কি, ও রকম দুটো বিচি থাকলে বুঝতে, জিনিসটা মন্দ নয়।
ওর প্রতি সমস্ত ভালো অনুভূতিগুলো দূর হয়ে গেলো আমার, ঘোড়ার পিঠে চড়ে দুই হাতে কেশর আঁকড়ে উবু হয়ে বসে থাকলাম।
সোজা হয়ে বসো! হুই শুধরে দেয়; ওদিকে ধৈৰ্য্য তার শান্ত ব্যবহার দিয়ে সাহায্য করতে থাকে।
মানবিক গুণাবলির হিসেবে এই প্রাণীগুলোর বৈচিত্রে সত্যি অবাক হতে হয়; পরবর্তী কয়েক দিনে থিবেস অভিমুখে আমাদের দক্ষিণ যাত্রায় টের পেলাম, এরা সন্দেহপূর্ণ অথবা বিশ্বাসী, কর্কশ অথবা শয়তান, বন্ধু-বৎসল নচেৎ একাকী, সাহসী নয়তো ভীতু, সধৈৰ্য্য নয়তো অধৈৰ্য্য, বিস্ময়কর অথবা অনুমিত স্বভাবের হতে পারে । মানুষের আচরণের সাথে অনেক মিল আছে ঘোড়ার অন্তত চারপায়ের অন্য যে কোনো প্রাণীর চেয়ে তো বটেই। যতোই শিখছি ওদের সম্পর্কে, ততোই আগ্রহ বাড়ছে; যতো বেশি সময় কাটালাম ঘোড়ার সাথে, ততো বেশি করে ভালোবেসে ফেললাম ।
ধৈর্য্যের পিঠে চড়ে এগোলাম আমি, পেছনে পেছনে ছুটলো ওর শাবক। তিনশো ষোলোটি ঘোড়ার পুরো পাল বাধ্যগতের মতো ছুটলো পিছু পিছু। পিছনে থেকে কোনো দলছুট, ঘোড়াকে পালের মধ্যে ফিরিয়ে আনার কাজ সম্পাদন করলো হুই। যতোই। সময় গড়িয়ে গেলো, ধৈর্য্যের পিঠে আরো সুস্থির আর চৌকষ হয়ে উঠলাম আমি; আমাদের মধ্যকার বন্ধুত্ব গাঢ় হতে লাগলো প্রতি মুহূর্তে। আমার নিজের দেহেরই একটা অংশ যেনো হয়ে উঠতে লাগলো মাদী-ঘোড়াটা; কেবল আমার দুর্বল হাত পায়ের বদলে ওর উপাঙ্গ অত্যন্ত শক্তিশালী আর দ্রুতগতিসম্পন্ন। ঘোড়ার পিঠে চড়ার ব্যাপারে অন্যদের অনীহা দারুন পীড়া দিয়েছিলো আমাকে।
