যদি আমার আগে ট্যানাসের সাথে এ ব্যাপারে কথা হতো ওর, আমি জানি, এ সিদ্ধান্তে আসতো না মিসট্রেস। আর আমাদের দেশের ইতিহাসও ভিন্ন রকম হতো সেক্ষেত্রে। স্বাভাবিকভাবেই, আমার এই ছলনাপূর্ণ আচরণের খবর জেনে দারুন রাগ করলো ট্যানাস, ওর সাথে এতো দিনের বন্ধুত্বে ফাটল ধরার উপক্রম হলো এতে।
যা হোক, অবশেষে রানির ইচ্ছেয় সামান্য কয়জন লোক জোগাড় করতে সমর্থ হলাম।
গালালা মরুতে আমাদের হাতে ধরা-পড়া শ্ৰইক, পরে যে ট্যানাসের গ্যালি বাহিনীর একটা অংশের নেতৃত্ব পেয়েছিলো, সেই হই থাকলো আমার সাথে। ওর জাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, কাজেই এই মুহূর্তে তেমন কোনো কাজ নেই হাতে।
ঘোড়া সম্পর্কে কী জানো তুমি? তাচ্ছিল্যের স্বরে আমাকে বললো হুই। সেই মুহূর্তে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যে ঠিক তৈরি ছিলাম না।
নিশ্চই তুমি বেশি জানো আমার থেকে? সতর্ক স্বরে বললাম।
আমি সহিস ছিলাম আগে, উদাস স্বরে জানালো হুই।
সেটা আবার কোন প্রাণী?
ঘোড়ার দেখভাল করে, এমন লোক, তার উত্তরে অবাক হয়ে গেলাম আমি।
আবনুবের সর্বনাশা লড়াইয়ের আগে তুমি তাহলে ঘোড়া দেখেছো!
ছোট্ট বয়সে আমার বাবা-মা মারা যাওয়ার পর, পুবের বর্বর একটা গোত্রে বড়ো হয়েছি আমি। ইউফ্রেতিস নদী থেকে এক বছর মতো যাত্রার দূরত্বে, সেই পূবের এক সমভূমিতে। যাদের কাছে ছিলাম তখন, ওরা ঘোড়া পালতো; বাচ্চা বয়সে ঘোড়ার সঙ্গে বহু সময় কেটেছে আমার। রাতে ওগুলোর পেটের তলায় ঘুমোতাম, ঘোটকির দুধ ছিলো আমার প্রিয় খাদ্য। দাস হওয়ার কারণে তাঁবুতে আশ্রয় মিলতো না তো। ওই বর্বরগুলোর হাত থেকে পালিয়েওছি একটা কালো ঘোড়ায় চড়ে। দ্রুত গতিতে চলে, ইউফ্রেতিস নদীর কাছে এসে মরে গেলো ওটা।
তো, এই হুই আর অল্প কয়েকজন নিরাসক্ত ঘোড়া-ধরা সৈন্য নিয়ে পশ্চিম তীরে নামলাম আমি। মোট ষোলোজন ছিলো আমার দলে, সেরা কোনো লোক যেনো আমার সাথে না আসতে পারে, সেটা অবশ্য নিশ্চিত করেছিলো ট্যানাস।
হুই-এর পরামর্শে লিনেনের দড়ি আর ধুররা শস্যের থলে নিয়ে রওনা হলাম আমরা। সে ছাড়া আর সবাই, এমনকি আমিও, ভয়ঙ্কর হিকসস্ প্রাণীর ভয়ে কাপড় ভিজিয়ে ফেলার উপক্রম। প্রথম সকালে উঠে দেখি, ক্যাম্প খালি করে সব ক জন পালিয়ে গেছে।
ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, দুঃখে ভার মন নিয়ে বললাম আমি, একা একা আর কী করবো। ট্যানাস জানতো, এমন কিছু ঘটতে পারে।
আরে, তুমি একা কোথায়? উৎফুল্ল স্বরে হুই বলে। আমি তো আছি। সেই প্রথম, ওর প্রতি আমার অনুভূতি পাল্টে গেলো। ধুরুরা শস্যের গুড়ো আর দড়ি আলাদা করে আবারো রওনা হলাম আমরা দুজন।
মাটির বুকে পরিষ্কার চিহ্ন রয়েছে ঘোড়ার পালের, হুই আমাকে আশ্বস্ত করে জানালো, দলবদ্ধ ভাবে ঘুরতে পছন্দ করে এরা। নদীর ধার ছাড়া অন্য কোথাও যাবে না। মরুতে হারিয়ে যাওয়ার কথা নয় এদের।
সত্যি, হুই-এর কথা পরবর্তীতে সত্যি প্রমাণিত হয়েছিলো।
হিকসস্ আক্রমণের পর কৃষাণেরা ঘর-দোর ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে দেয়ালঘেরা আসয়ূত নগরে। একের পর এক বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ তাই শূন্য পড়ে আছে। শস্য কাটা হয়নি অনেক ক্ষেতে। দ্বিতীয় দিন দুপুরের আগেই ঘোড়ার পালের দেখা পেলাম। ছড়িয়ে পড়ে মাঠে চড়ছে প্রাণীগুলো। আশঙ্কায় লাফিয়ে উঠলো আমার বুকের ভেতরটা।
এগুলো ধরা নিশ্চই অত্যন্ত বিপদজনক কাজ, ভয়ে ভয়ে স্বীকার করলাম হুই-এর কাছে। তখন পুরো তিনশো তো দূরের কথা, একটি-দুটি ঘোড়া ধরতে পারলেও খুশি আমি।
আমি শুনেছি, চালু-দাস হিসেবে বেশ নাম-ডাক আছে তোমার, দাঁত বের করে হাসলো হুই; দৃশ্যত এই বিষয়ে আমার জ্ঞানের স্বল্পতা বেশ আনন্দ দিচ্ছিলো তাকে। বোঝাই যায়, তোমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি বলে সবাই।
এরপর সে আমাকে দেখালো, কেমন করে দড়ি দিয়ে ফাঁস প্রস্তুত করতে হয়। বারোটা এ রকম ফাঁস তৈরি হতে সন্তুষ্ট হলো হুই। একটা করে ফাঁস আর ধুররা শস্যের গুড়ো সমেত থলে নিয়ে ঘোড়ার পালের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম আমরা। হুই-এর পরামর্শে সরাসরি না গিয়ে, একটু বাঁকা পথে ধীরে ঘোড়াগুলো পেরিয়ে তারপর থামলাম।
এবার, ধীরে, নরম স্বরে আমাকে সমর্ক করে দিলো হুই। মাথা উঁচিয়ে, ঠিক শিশুদের মতো নিষ্পাপ দৃষ্টিতে আমাদের পরখ করে দেখতে লাগলো ঘোড়াগুলো।
বসে পড়ো। ধীরে বসে পড়লাম আমরা দু জন। মুখ নামিয়ে শস্য খাওয়ায় মন দিলো ঘোড়াগুলো; আবারো ধীরে এগুতে লাগলাম আমি আর হুই, যতক্ষণ পর্যন্ত না অস্বস্তিতে নড়া-চড়া আরম্ভ করলো ওগুলো।
নিচু হও! আদেশ করে হুই। নম্র কণ্ঠস্বর বেশ পছন্দ করে এরা। ছোট্ট বয়সে গান গেয়ে ঘোড়ার পাল শান্ত করতাম আমি। দেখো! বিচিত্র কোনো ভাষায় সুর করে গাইতে লাগলো সে।
এমন কর্কশ সেই স্বর, ঠিক যেনো মরা কুকুরের লাশের উপর কাক ডাকছে। সবেচেয়ে কাছের ঘোড়াগুলো উৎসুক চোখে চাইলে আমাদের দিকে। আমার মতোই ওদের কাছেও হুই-এর গান অত্যন্ত বিশ্রী লেগেছে আমি নিশ্চিত।
আমি একটু চেষ্টা করে দেখি, ফিসফিস করে ওকে বলে, রাজকুমারের জন্যে আমার তৈরি একটা ঘুমপাড়ানি-গান ধরলাম।
ঘুমাও, ছোট্ট মেম, প্রভাতের শাসন করে যে;
ঘুমাও, ছোট্ট রাজকুমার, এই পৃথিবী একদিন তোমার হবে।
কোঁকড়া-চুলো ওই ছোট্ট মাথাটা একটু রাখো না কোলে,
বিশ্রাম দাও ওই হাত দুটোকে, একদিন যা দিয়ে তরবারি আর ধনুক ধরবে।
