বিশাল, গভীর কালো চোখদুটো যন্ত্রণায় টলোমলো; এতো, এতো সুন্দর ওই চোখ জোড়া, মায়ায় ভরে গেলো বুকের ভেতরটা। হাত বাড়িয়ে ঘোড়াটার নাকের উপর রাখলাম, ঠিক আরবীয় সিল্কের মতো লাগলো। সরাসরি আমার দিকে এগিয়ে বুকে কপাল ঘষলো ও, যেনো বন্ধুর কাছে আবেদন জানাচ্ছে একদম মানুষের মতো! আমি জানি, সাহায্য কামনা করেছে ওটা।
নিজের অজান্তেই দুই হাত দিয়ে ঘোড়াটার গলা জড়িয়ে ধরলাম আমি। ওকে বাঁচানোর জন্যে জীবনের যে কোনো সঞ্চয় দিয়ে দিতে পারি আমি এই মুহূর্তে। কিন্তু নাকের ফুটো দিয়ে গরম রক্তের ফেনা দেখা যাচ্ছে। ফুসফুঁসে লেগেছে আঘাত, কোনো সন্দেহ নেই, মারা যাচ্ছে ওটা। কোনো রকম সাহায্যের উর্ধ্বে এখন।
ওহ্, ওই হতভাগা বর্বরগুলো তোমার কী অবস্থা করেছে! ফিসফিস করে বললাম। হতাশা, ক্ষোভ আর দুঃখের ভেতরও বুঝলাম, আমার জীবনটা পাল্টে গেলো আজ থেকে। এই মরণাপন্ন ঘোড়াটা সেই পরিবর্তন এনে দিয়েছে আমার ভেতর। সাথে সাথেই বুঝলাম, আসছে দিনগুলোতে এই আফ্রিকার মাটিতে যেখানেই আমার পা পড়বে, সাথে থাকবে দুই জোড়া খুড়ের ছাপও। আরো একবার প্রেমে পড়েছি আমি।
হুড়মুড় করে পড়ে গেলো স্ট্যালিয়ন, মুখ হা করে বাতাস টানতে চাইছে। বুকের আঘাত থেকে গোলাপী বুদবুদ বেরিয়ে আসছে বেচারার। নিচু হয়ে ওর মাথাটা কোলে তুলে নিলাম আমি। এভাবেই, আমার কোলে মাথা রেখে মারা গেলো ঘোড়াটা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে হোরাসের প্রশ্বাসে উদ্দেশ্যে ফিরে চললাম।
চোখ উপচে-পড়া পানির কারণে পথ ঠাওর হচ্ছে না; কিছুতেই বুকের গভী। থেকে উঠে আসা কান্না থামলো না। মানুষ হোক বা আর কিছু বিশেষত, যদি মহৎ আর সুন্দর হয়, তাদের যন্ত্রণা আমি সইতে পারি না ।
আরে, টাইটা! কোথায় পালিয়েছিলে? জাহাজে চড়তেই ট্যানাস চেঁচালো। একটা যুদ্ধ চলছে এখানে। তোমার দিবাস্বপ্ন শেষ হওয়ার অপেক্ষায় তো আর পুরো সেনাবাহিনী বসে থাকতে পারে না!
*
জাহাজ ছেড়ে ঘোড়র পালের পিছুপিছু আমার পশ্চিমে যাওয়ার প্রস্তাবে কর্ণপাত করলো না ট্যানাস। সাথে সৈন্য দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না।
ওই রক্ত-পিপাসু, অপবিত্র জানোয়াগুলোর ছায়াও দেখতে চাই না আমি! চেঁচিয়ে আমার উদ্দেশ্যে বললো সে। পালিয়ে যে যেতে পেরেছে, এটা জেনেই খারাপ লাগছে। দেবতারা করুন, সিংহ আর শিয়ালের পাল আমাদের হয়ে নিকেশ করে শয়তানগুলোকে।
আবনুবের সমভূমিতে ছিলে তুমি? গলা উঁচিয়ে বললাম। রাগে আমার সর্বশরীর কাঁপছে। নাকী, কোনো চোখ-থাকতে-অন্ধ গর্দভ ছিলো আমার পাশে? চাকায়-চলা রথে চলে ওই প্রাণীগুলো কেমন করে তোমার লোকদের শেয়ালের খাদ্যে পরিণত করেছে দেখেও শেখোনি? ওই রথ আর ঘোড়া ছাড়া তোমার-আমার মিশরের কোনো আশা নেই, এইবেলা শুনে নাও!
হোরাসের প্রশ্বাসের চালকের প্রকোষ্ঠে এই উত্তপ্ত বাক্য-বিনিময় চলছিলো। মিশরের সাহসী সিংহ, বীরশ্রেষ্ঠ ট্যানাসকে একজন ক্রীতদাস কর্তৃক গর্দভ ডাক শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেছে তার অধস্তন যোদ্ধারা। কিন্তু কাণ্ডজ্ঞান লোপ পেয়েছে আমার।
দেবতারা ওই সুন্দর উপহার পাঠিয়েছেন আমাদের। তিনশো ঘোড়া তোমার হাতে এখন! ওগুলোর সাথে জুড়বার জন্যে আমি তোমাকে রথ প্রস্তুত করে দেবো।
তুমি কি অন্ধ, কিছুই কি চোখে পড়ছে না?
আমার জাহাজ আছে! পাল্টা চেঁচালো ট্যানাস। ওই জঘন্য, মানুষ-খেকো জানোয়ার চাই না আমার! সেথ আর সুতেখ-এর সৃষ্টি ওগুলো আমার ধারে কাছেও যেনো না আসে!
গলার স্বর নামিয়ে, দ্রভাবে এবারে বললাম, ট্যানাস, দয়া করে আমার কথা শোনো। এই জানোয়ারগুলোর একটা আমার কোলে মাথা রেখে মারা গেছে। খুবই শক্তিশালী হতে পারে, কিন্তু অত্যন্ত ভদ্র প্রাণী এরা। ঠিক প্রভুভক্ত কুকুরের মতো আলো জ্বলে চোখে। মাংস খায় না এরা।
সামান্য একটু ছুঁয়ে এ ব্যাপারে কেমন করে নিশ্চয়তা দাও? এখনো রাগ কমেনি। ট্যানাসের।
দাঁত দেখে, উত্তরে বললাম। মাংসাশী প্রাণীর মতো বিষদাঁত নেই এদের। এ মাংসাশী নয়।
এবারে, একটু দ্বিধায় ভুগলো ট্যানাস; সুযোগটা নিলাম আমি। এতেও যদি বিশ্বাস করো; তাহলে দেখো, নদীর এপারে কী নিয়ে এসেছে হিকসস্ যোদ্ধারা। মাংসাশী সিংহ কখনো খড় খায়?
মাংসই হোক বা খড়; আমি এ নিয়ে আর তর্ক করতে চাই না। তুমি আমার সিদ্ধান্ত শুনেছো। ওই মরুতে মরুক ঘোড়ার পাল-এ-ই আমার কথা। ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে সরে গেলো সে।
এমন উদাহরণ খুব কম, যখন আমার কী কোনো ব্যাপারে আমার সাথে একমত হতে বাধ্য হয়নি, আর এখন তো ও এই মিশরের কর্ত্রী। সেই সন্ধ্যায়, যুদ্ধ গ্যালির নিরাপত্তার ভেতর রাজকীয় জাহাজ নোঙর ফেলতেই ওর কাছে গেলাম আমি।
আমার নিজের তৈরি কাঠ-খোদাই করা চাকায়-চলা রথ আর ঘোড়ার নকলটা লসট্রিসের হাতে তুলে দিলাম ওর প্রেমিকের অজান্তেই। দারুন প্রভাবিত হলো রানি। যুদ্ধক্ষেত্রে ঘোড়ায় টানা রথের সর্বনাশা আক্রমণ সে দেখেনি, কাজেই সেনাবাহিনীর আর সবার মতো তার ঘৃণা নেই ওগুলোর প্রতি। এরপর, সেই কালো ঘোড়ার মর্মান্তিক মৃত্যুর বর্ণনা দিলাম ওকে। শেষ হতে দেখা গেলো, আমার দু জনেই কাঁদছি।
এক্ষুণি, মরুতে গিয়ে চমৎকার প্রাণীগুলোকে বাঁচাও তুমি, টাইটা। ওগুলো যদি উদ্ধার করতে পারো, আমি নির্দেশে দিচ্ছি, আমার সেনাবাহিনীর জন্যে রথ তৈরি করবে। দৃঢ়স্বরে বলে উঠলো রানি।
