কিন্তু, ইনটেফের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি আমরা। কাঁধের উপর দিয়ে পিছন ফিরে চাইতে তার চোখে মৃত্যুভয় দৃষ্টি গোচর হলো আমার। এখন ইনটেফ বুঝে গেছেন, আর রক্ষা নেই তার। তীরের ঝক অগ্রাহ্য করে, ছুটে গলুইয়ে এসে চেঁচিয়ে বললাম, প্রথম সাক্ষাত থেকে তোকে ঘৃণা করি আমি। তোকে মরতে দেখলে কী যে ভালো লাগবে! এখন তাই ঘটবে!
আমার কথা কানে গেছে ইনটেফের। ওর চোখেই ফুটে উঠলো সেটা। কিন্তু হায়, আবারো অন্ধকারের দেবতারা তার সহায় হলেন। ডুবন্ত একটা হিকসস্ জাহাজ, তার জ্বলন্ত কাঠামো নিয়ে ধেয়ে এলো আমাদের দিকে। কোনো রকমে একবার যদি আমাদের গ্যালি ছুঁতে পারে ওটা, নির্ঘাত আগুনে পুড়ে পানির তলায় ঠাই হবে হোরাসের প্রশ্বাসের। নিরুপায় ট্যানাস, তার দাঁড়ীদের জাহাজ পেছানোর হুকুম দিলো। জ্বলন্ত হিকসস্ গ্যালি এখন আমাদের আর পুব তীরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। চোখের আড়াল হয়ে গেছেন ইনটেফ। আবার যখন দেখতে পেলাম তাকে, তিনজন হিকসস্ সৈনিক টেনে পানি থেকে তুলছিলো।
তীরে দাঁড়িয়ে একবার পিছন ফিরে তাকালো ইনটেফ, হতাশা আর অক্ষম-ক্রোধে আমাদের ভাসিয়ে দিয়ে চোখের আড়ালে চলে গেলো সে। তীর বর্ষণে তখনো পর্যদস্ত আমাদের যোদ্ধারা, ট্যানাসের নির্দেশে দ্রুত পিছিয়ে অবশিষ্ট গ্যালিগুলোর সাথে যোগ দিলো হোরাসের প্রশ্বাস।
শক্ত বহনকারী জাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে পশ্চিম তীরে নজর বোলালো ট্যানাস। বিশাল ঘোড়ার পাল আর অল্প কয়েকজন প্রহরী রয়েছে সেখানে। আমাদের গ্যালিগুলোকে ছুটে আসতে দেখে ছুটে পালাতে চাইলো প্রহরীরা; কিন্তু রণ-সংগীত গাইতে গাইতে তীরে নেমে তলোয়ার হাতে তাদের পিছু ধাওয়া করলো মিশরীয় যোদ্ধারা। হিকসস্রা রথে চড়ে অভ্যস্ত, সবসময় রথে চড়েই যুদ্ধ করে; অপরদিকে আমাদের সৈন্যরা প্রত্যেকে পদাতিক বাহিনীর বীর সেনা দৌড়ানোর জন্যেই প্রশিক্ষণ পেয়েছে তারা। সবুজ ধুররা ক্ষেতের উপর কিছুসময়ের মধ্যেই শ খানেক হিকসস্ যোদ্ধার রক্তাক্ত লাশ পরে রইলো।
প্রথম সৈন্যদলের পিছুপিছু আমিও তীরে নেমে এলাম। মাথায় অন্য চিন্তা চলছে। রথ-টানার উপায় খুঁজে না পেলে শুধু খেলনা কাঠামো আর চাকা তৈরির নকশা করার কোনো মানে হয়না।
প্রচণ্ড সাহসের প্রয়োজন হলো হিকসদের ভয়ঙ্কর প্রাণীগুলোর কাছাকাছি যেতে। পানির কোল ঘেষে দাঁড়িয়ে ঘোড়ার পাল। অস্ত্রের ঝনঝনানি, সৈন্যদের চিৎকার আর দৌড়ানোর শব্দে চমকে গেছে জীবগুলো। আমি ভাবছিলাম, এই বুঝি এক পাল হিংস্র সিংহের মতো আমার দিকে তেড়ে আসবে। মনের চোখে দেখতে পেলাম, আমার তাজা মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে ওগুলো। মনোবল কমে এলো। দূরে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলাম দারুন সুন্দর প্রাণীগুলোকে।
সবেচেয়ে কাছের ঘোড়াটা আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে উপরের ঠোঁট উল্টাতে বিশাল চৌকোণা দাঁতগুলো থেকে আঁতকে উঠলাম। পেছনের পা শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে চি-হি-হি-হি স্বরে এমন ভীষণভাবে ডেকে উঠলো, প্রাণ হাতে করে জাহাজে ফিরে চললাম আমি।
কাপুরুষের মতো আমার পলায়ন দেখে চেঁচিয়ে উঠলো একজন যোদ্ধা, হিকসস্ দৈত্যদের মেরে ফ্যালো!
বাকি সৈন্যরা ঠোঁটে তুলে নিলো সেই চিৎকার। মারো! মেরে ফ্যালো শয়তান দৈত্যগুলোকে!
না! নিজের নিরাপত্তার কথা ভুলে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। না! ঘোড়াগুলোকে মেরো না! ওগুলো আমাদের কাজে আসবে!
রণ-হুঙ্কারে উন্মত্ত যোদ্ধারা আমার আবেদনে কর্ণপাত না করে ঘোড়ার পালের উদ্দেশ্যে ছুটলো; হাতের বর্ম উঁচিয়ে রেখেছে তারা, বর্শার ডগা থেকে তখনো ঝরে পড়ছে শুক্র-প্রহরীদের রক্ত। কেউ কেউ নিজেদের ধনুকে তীর জুড়ে ছুঁড়ছে ঘোড়ার পালের উপর।
না! কঁকিয়ে উঠলাম আমি; ওদিকে কাঁধের কেশরে গেঁথে থাকা তীরের আঘাতে লাফিয়ে উঠলো কালো চকচকে একটা স্ট্যালিয়ন।
না, দয়া করে ঘোড়াগুলোকে মেরো না! কে শোনে কার কথা। একের পর এক বর্শার কোপে, তীরের আঘাতে ধুলোয় লুটাতে লাগলো চমৎকার প্রাণীগুলো।
মুহূর্তেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো ঘোড়ার পাল। প্রায় তিনশো ঘোড়ার দলটা উধশ্বাসে ছুটতে লাগলো, ধূলিময় পশ্চিম সমভূমির উপর দিয়ে সোজা মরুর উদ্দেশ্যে চলেছে ওগুলো।
হাত দিয়ে কপালের উপরটা আড়াল করে সেদিকে চেয়ে রইলাম আমি, মনে হলো, যেনো আমার হৃদয়ও হারিয়ে গেছে ঘোড়াগুলোর সাথে। দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যেতে, আহত অবস্থায় পড়ে থাকা জানোয়ারগুলোর উদ্দেশ্যে ছুটলাম। তীর বা বর্শাবিদ্ধ ঘোড়াগুলো মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছে। কিন্তু আমার আগে ওখানে পৌঁছে গেছে সৈনিকের দল। ঘৃণায়, রাগে উন্মত্ত হয়ে নিথর দেহগুলোর উপরে চড়ে সমানে আঘাত করে যাচ্ছে তারা।
এক ধারে, ছোট্ট একটা নলখাগড়ার ঝোঁপের আড়ালে পড়ে আছে সেই কালো স্ট্যালিয়নটা, যেটাকে তীরবিদ্ধ হতে দেখেছি আমি। যোদ্ধাদের দৃষ্টির আড়ালে রয়েছে জানোয়ারটা। বুকের গভীরে তীর গাঁথা; টলোমলো পায়ে, খুঁড়িয়ে সামনে এগুতে চাইছে। নিজের নিরাপত্তার কথা ভুলে গিয়ে ওর কাছে ছুটে গেলাম আমি। ঘাড় ফিরিয়ে একবার আমাকে দেখলো জানোয়ারটা।
টের পেলাম, ভয়ঙ্কর বিপদে পড়েছি। আহত সিংহের মতোই এখন আমার দিকে তেড়ে আসবে ঘোড়াটা কোনো সন্দেহ নেই। পরস্পরের চোখে চেয়ে রইলাম। আমরা যেনো ধীরে আমার কাঁধ থেকে খুলে পড়ে গেলো ভয়ের আচকান।
