পেট মোচড় খেলো আমার, কে জানে, ওই সৈনিক হয়তো সত্যি কথাই বোলছে। জোর করে ঘোড়াগুলোর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনের যুদ্ধরত গ্যালির দিকে তাকালাম।
রথ আর সৈন্য পারাপারের মাঝপথে ধরেছি ওদের, ট্যানাসকে বললাম আমি । লর্ড নেমবেটের চুরি-হওয়া জাহাজগুলোর পাটাতনে উঁচু হয়ে রয়েছে রথের সরঞ্জাম আর রথ-চালকের দল। বিপদ টের পেয়ে কিছু হিকসস্ জাহাজ পিছিয়ে পুব তীরে ফিরতে চাইলো । পেছনের রথ-বহনকারী গ্যালিগুলোর সাথে সংঘর্ষ ঘটলো ওগুলোর; স্রোতে পরে ঘুরপাক খেতে লাগলো নিয়ন্ত্রণহীন জাহাজ।
শত্রুর দ্বিধা টের পেয়ে বর্বরের হাসি হাসলো ট্যানাস। চিৎকার করে উঠলো সে, সাধারণ সংকেত আক্রমণের তাল বাজাও! তীরে অগ্নিসংযোগ করো!
জীবনেও আগুনে-তীরের আক্রমণ দেখেনি হিকসসেরা, ওদের ভীতি দেখে ট্যানাসের সাথে সাথে আমিও চিন্তিত ভঙ্গিতে হেসে উঠলাম। এরপর, হঠাৎই গলায় জমে গেলো হাসিটা।
ট্যানাস! ওর হাত আঁকড়ে ধরলাম আমি। ওদিকে! সামনের গ্যালির চালকের আসনে তাকাও! ওই যে আমাদের বিশ্বাসঘাতক!
জাহাজের রেইল ধরে দাঁড়ানো লম্বা, রাজকীয় অবয়ব প্রথমটায় চিনতে পারলো ট্যানাস, কেননা মাছের আঁশের মতো বর্ম আর হিকসস্ শিরস্ত্রাণ পরে আছে সে। অবশেষে, ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে চেঁচালো, ইনটেফ! আগে যে কেনো বুঝি নি!
এখন তো সব পরিষ্কার হলো। রাজা স্যালিতিসকে এই মিশরের মাটিতে পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে সে। ইচ্ছে করেই পুবে গিয়ে সমাধি-সম্পদের কথা বলে লোভ দেখিয়েছে হিকসস্দের। আমার ঘৃণা ট্যানাসের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
লানাটা তুলে ধরে একটা তীর ছুঁড়লো ট্যানাস, কিন্তু দূরত্ব বেশি হওয়ায় ইনটেফের বর্মে লেগে পিছলে গেলো ওটা। এক ঝাঁকিতে নড়ে উঠে, পানির উপর দিয়ে সরাসরি আমাদের দিকে তাকালেন ইনটেফ। মনে হলো, তার চোখে যেনো ভয় ঘনাতে দেখলাম। এরপর জাহাজ-কাঠামোর আড়ালে লুকালেন তিনি।
দ্বিধাগ্রস্ত, টলোমলো, জট-পাকানো হিকসস্ জাহাজের উপর চড়াও হলো সামনের গ্যালিগুলো। হোরাসের প্রশ্বাসের তামার পাত মোড়ানো চোখা গলুই নিমিষে মড়মড় আওয়াজ করে সেঁধিয়ে গেলো ইনটেফকে বহনকারী গ্যালির অভ্যন্তরে। সংঘর্ষের ধাক্কায় ছিটকে পড়লাম আমি। যতক্ষণে উঠে দাঁড়ালাম, আমাদের দাড়ীরা ততক্ষণে পিছিয়ে নিয়ে এসেছে জাহাজ।
তীরন্দাজেরা বৃষ্টির মতো আগুন-জ্বলা তীর ছুঁড়তে শুরু করেছে। দখলকারী জাহাজের পাল আর মাস্তুলে ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজ্বলিত তীর আঘাত হানলো । নিমিষেই, উত্তরে বাতাস পেয়ে দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো শক্ত বহনকারী জাহাজ।
জাহাজকাঠামোর ফাঁক হয়ে যাওয়া অংশ দিয়ে গলগল করে পানি ঢুকছে, একপাশে দ্রুত কাত হয়ে যেতে লাগলো ইনটেফকে বহনকারী শত্রু জাহাজ। দাউ দাউ আগুনে জ্বলছে পাল। আগুনের তাপে → যেনো পুড়ে যাবে। বিশাল প্রধান পাল, মাস্তুলসহ ধসে পড়লো পাটাতনের উপরে আতঙ্কিত হিকসস্ যোদ্ধাদের উপর। সাথে সাথে জ্বলে উঠলো সারি সারি হিকসস্ রথে। পুড়ে খাক হতে লাগলো রথ-চালক আর যোদ্ধারা। আগুনের তাপ সহ্য করতে না পেরে পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লো অনেকেই, দেহের বর্মের ভারে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তলিয়ে গেলো। আবনুবের সমতলের কথা মনে করলাম আমি কোনো মায়া অনুভব করছি না এই নিষ্ঠুর মৃত্যুর জন্যে।
সমস্ত হিকসস্ জাহাজ জ্বলছে এখন। অভিজ্ঞতা বা দক্ষতা কোনোটিই নেই তাদের, নদীপথের যুদ্ধে আমাদের সাথে টক্কর লাগে। ঠিক রথ আক্রমণের সময় আমাদের যেমন হয়েছিলো, অসহায় অবস্থায় ধ্বংসের মুখোমুখি হলো তারা। বারবার পিছিয়ে এসে আবারো আক্রমণ শানালো মিশরীয় নৌবাহিনী ।
ইনটেফের খোঁজে প্রথম গ্যালিতে চোখ বোলালাম। ওটা ডুবে যাওয়ার একটু আগে দেখা দিলেন তিনি, শিরস্ত্রাণ, বর্ম সব ফেলে দিয়েছেন ইতিমধ্যে। কেবলমাত্র ছোট্ট এক টুকরো নেংটি পরনে। জাহাজ তলিয়ে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়লেন পানিতে।
ইনটেফ তো নীলে র সন্তান, বেড়ে উঠেছেন এই নদীর জল-বাতাসে। ডুব-সাঁতার দিয়ে নিমিষে পঞ্চাশ গজ পেরিয়ে এলেন; চকচকে কালো চুলগুলো ছড়িয়ে আছে পানির উপর।
ওই তো সে! ট্যানাসকে চিৎকার করে দেখালাম। ডুবিয়ে দাও হারামজাদাকে?
সাথে সাথেই জাহাজ ঘোরানোর নির্দেশ দেয় ট্যানাস। কিন্তু সম্পূর্ণ বাঁক ঘোরার আগেই ঠিক মাছের মতোই পিছলে ভেসে পুব তীরের কাছাকাছি পৌঁছে গেলেন ইনটেফ।
জোরে ঘোরো! চেঁচিয়ে উঠলো ট্যানাস। ডান ধারের দাড়ীরা প্রাণপণে বাইতে লাগলো। সাঁতাররত ইনটেফের বরাবরে আসতেই সোজা সামনে টানার নির্দেশ পেলো তারা। কিন্তু, ইতিমধ্যে পাড়ের অত্যন্ত নিকটে পৌঁছে গেছেন ইনটেফ; ওখানে, পুব তীরে, পাঁচ হাজার হিকসস্ তীরন্দাজ তাদের ভীষণ প্রান্ত-বাঁকানো ধনুক নিয়ে অপেক্ষায় আছে।
সেথ ওদের উপর মুতে দিক! হতাশায় চেঁচালো ট্যানাস। নাকের সামনে থেকে ইনটেফ শয়তানকে তুলে নেবোই নেবো! হোরাসের প্রশ্বাসকে সরাসরি তীরের উদ্দেশ্যে ছুটিয়ে নিয়ে চললো সে।
ধনুকের সীমানায় এসে পড়তেই আমাদের জাহাজ লক্ষ্য করে এতো তীর ছুটে আসতে লাগলো, মাথার উপরের আকাশ অন্ধকার হয়ে এলো। বৃষ্টির মতো আমাদের খোলা পাটাতনে আঘাত করতে লাগলো একের পর এক তীর, একজন দুই জন করে লুটিয়ে পড়তে লাগলো মিশরীয় সৈন্যরা।
