বাতাস এখন অনুকূলে। বাহিনীর সমস্ত জাহাজকে একই সংকেত দাও সবাই পাল তুলুক। প্রতি ঘন্টায় দাঁড়-টানা যোদ্ধাদের বদল করো। ঢাক বাদকেরা, তাল দ্রুত করো তোমরা ছুটে দক্ষিণে চলো সবাই!
উত্তুরে বাতাস বইতে লাগালো জোরেসোরে। গর্ভবতী নারীর পেটের মতো ফুলে উঠলো পাল। দ্রুত লয়ের তালে দাঁড়ীদের উৎসাহ জোগালো ঢাকবাদকেরা। আমাদের সমস্ত জাহাজ ছুটে চললো দক্ষিণে।
সকল প্রশংসা দেবীর জন্যে, গর্জে উঠে ট্যানাস। পবিত্র আইসিস, জলপথে যেনো ওদের ধরতে পারি আমরা, অতটুকু সময় দাও আমাদের!
*
বিশাল আকৃতির কারণে রাজকীয় জলযানের গতিবেগ অত্যন্ত ধীর, কাজেই হিকসস্দের জলপথে ধরার জন্যে মরিয়া ট্যানাস, তার হোরাসের প্রশ্বাসে বাহিনীসহ স্থানান্তরিত করলো নিজেকে। হালকা, দ্রুতগামী গ্যালিটা রাজকীয় জাহাজের পাশে ভিড়িয়ে ওটাতে চড়ে বসলো সে। কখনো কখনো নিজের অজান্তেই বড়ো নির্বোধের মতো আচরণ করে থাকে মানুষ, যেমনটি নেমবেট করেছিলেন ট্যানাসের সতর্কবার্তা অবহেলা করে। হঠাৎ করে দেখি, আমি নিজে ট্যানাসের পিছু পিছু হোরাসের প্রশ্বাসে অবস্থান নিয়েছি, অথচ আমার দায়িত্ব ছিলো রানি আর রাজকুমারের সঙ্গে থাকা। কিন্তু যতক্ষণে নিজের এই অযাচিত আচরণ টের পেয়ে শুধরানোর চেষ্টা করলাম, ততক্ষণে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে রাজকীয় জাহাজ।
হোরাসের প্রশ্বাসে অবস্থান নিয়েই নতুন নির্দেশ দিতে লাগলো ট্যানাস। পতাকা সংকেত আর নাবিকদের চিৎকারে মুহূর্তেই বাহিনীর অন্যান্য যুদ্ধ-জলযানের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো তার আদেশ। গতিবেগ একটুও না কমিয়ে, নতুন করে জাহাজগুলো বিন্যস্ত করা হলো, ট্যানাসের হোরাসের প্রশ্বাস রইলো সবার সামনে।
আহতরা, যার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারবে না, তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হলো অপেক্ষাকৃত ধীর গতির জাহাজে। দ্রুতগামী গ্যালিগুলোতে লড়াইয়ের জন্যে মোতায়েন করা হলো মূলত রেমরেম-এর বাহিনীর যোদ্ধাদের। এখনো পর্যন্ত কোনো রকম ক্ষতি হয়নি এই বাহিনীর। আবনুবের অপমানের প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর তারা। হোরাসের প্রশ্বাসে নীল কুমির বাহিনীর পতাকা টানিয়ে দিতেই রণ-সঙ্গিতে মুখরিত হলো যোদ্ধারা। রক্তক্ষয়ী পরাজয়ের পর কী অসাধারণ নেতৃত্বের উদাহারণ দেখিয়ে মিশরীয় সৈনিকদের উদ্বুদ্ধ করেছিলো ট্যানাস সেদিন, না দেখলে বিশ্বাস হওয়ার নয়।
প্রতি লীগ জলপথ পাড়ি দেওয়ার সাথে সাথে নেমবেটের নির্বুদ্ধিতার আরো প্রমাণ মিলছিলো আমাদের। নিহত মিশরীয় যোদ্ধা, জাহাজের বড়ো বড়ো ভাঙ্গা অংশ, যুদ্ধের আবর্জনা নদীর দুই ধারের প্যাপিরাসের ঝারে আটকে গেছে। শেষমেষ, আমাদের সামনের আকাশে সেই রথসৃষ্ট ধূলিমেঘ আর ক্যাম্পের আগুনের ধোঁয়ার দেখা পাওয়া গেলো।
ঠিক যা ভেবেছিলাম, স্বস্তির স্বরে বললো ট্যানাস। থিবেস অভিমুখে যাত্রায় উগ্রতা কমেছে তাদের, এখন যখন নদী পার হওয়ার জন্যে জাহাজ পেয়েই গেছে নেমবেটের বদৌলতে, অতো তাড়াহুড়ো না করলেও চলে ব্যাটাদের। কিন্তু, এরা তো আর নাবিক নয়; নিজেদের রথ আর জানোয়ার ওঠাতে জান বের হয়ে যাওয়ার কথা। হোরাস সদয় হলে, আমরা তাদের এ ব্যাপারে কিছু সাহায্য করতে পারবো।
যুদ্ধের ভঙ্গিতে ছড়িয়ে পড়ে নদীর শেষ চওড়া বাঁক ঘুরলো মিশরীয় জাহাজবহর; সামনেই দেখা যাচ্ছে হিকসস্ বর্বরদের। ঠিক সেই সময়ই নদী পারাপারের জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো তারা।
টলোমলোভাবে, অপটু প্রচেষ্টায় পুরো পঞ্চাশটি দখল হারানো গ্যালি তখন মাঝ নদীতে ভাসমান; তালগোল পাকিয়ে গেছে পালগুলো, নিজের নিজের দাঁড় নিয়ে যেনো কসরৎ করছে হিকসস্ যোদ্ধারা। প্যাডলগুলো অযথাই পানি কাটছে, প্রতিটি জাহাজের চালকের অদক্ষতা একেবারে দৃশ্যমান, একটি জাহাজের সাথে অপরটির কোনো তাল মিল নেই।
পাটাতনে অবস্থান নেওয়া বেশির ভাগ হিকসস্ যোদ্ধার পরনে তামার বর্ম রয়েছে লক্ষ্য করলাম। বোঝাই যাই, ওই পোশাকে সাঁতার দেওয়া যে কতোটা অসম্ভব, এ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। ওদের উপরে যখন চড়ে বসলো আমাদের যুদ্ধ-গ্যালিগুলো,দৃষ্টিতে আতঙ্ক আর বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকলো তারা। এবারে, নিজেদের মাঠে তাদের পেয়ে গেছি আমরা।
কাছে এসে পড়তে শত্রুদের পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ পেলাম আমি। এখনো পুব তীরে রয়ে গেছে তাদের বাহিনীর মূল অংশ। সেই মরুর পাহাড়সারি পর্যন্ত বিস্তৃত তাদের সৈনিক বহর, হোরাসের প্রশ্বাসের পাটাতন থেকে যতোদূর চোখ পড়লো পুব দিগন্তে কেবল হিকসস্ যোদ্ধা নজরে এলো।
ছোট্ট একটা দলকে নদী পার হওয়ার আদেশ দিয়েছেন রাজা স্যালিতিস। নিঃসন্দেহে তাদের উপর নির্দেশ আছে যতো দ্রুত সম্ভব পশ্চিম তীর ধরে অগ্রসর হয়ে ফারাও এর সমাধি-মন্দিরের দখল নেওয়ার।
হিককসস বহনকারী জাহাজগুলোর উপর বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আমরা, রণ-হুঙ্কার আর আস্ফালন ছাপিয়ে চেঁচিয়ে ট্যানাসের উদ্দেশ্যে বললাম, ইতিমধ্যেই নিজেদের ঘোড়া পারাপার করে ফেলেছে তারা! ওদিকে দ্যাখো!
প্রায় কোনো প্রহরা ছাড়াই, কেবল অল্প কয়েকজন সৈনিক সহ, পশ্চিম তীরে চড়ে বেড়াচ্ছে বিশাল ঘোড়ার পাল। প্রথম দেখাতেই মনে হলো, কম করে হলেও কয়েক শ ঘোড়া রয়েছে সেখানে। আমাদের জন্যে দারুন চিন্তার বিষয়। আমার চারপাশে দাঁড়ানো কয়েকজন যোদ্ধা ভয়ে কেঁপে উঠে দেবতাদের কৃপা ভিক্ষা করতে লাগলো, ভয়ঙ্কর সেই জীব দেখে। একজনকে বলতে শুনলাম, হিকসস্ তাদের দৈত্যগুলোকে নির্ঘাত মানুষের গোশত খাওয়ায়। ঠিক পোষ মানানো সিংহের মতো। এজন্যেই এমনভাবে খুন করছে তারা, এই জানোয়ারগুলোকে খাওয়ানোর জন্যে শবদেহ প্রয়োজন তাদের! কে জানে, কতো সৈনিক এখন শয়তানগুলোর পেটে।
