তো, এইভাবেই, রাজকুমার মেমনন ওই নামধারী প্রথমজন, যিনি ছিলেন নতুন জাগরণের শাসক–তাঁর বিশ্বস্ত বন্ধুর সহায়তায় চাকার স্পোকের ধারণা করেছিলেন। তখন স্বপ্নেও ভাবিনি, একদিন আমরা দুজন বিজয়ীর বেশে ওই চাকায়-চলা রথে চড়বো।
*
দুপুরের আগেই প্রথম মিশরীয় নিহতের দেখা পেলাম আমরা। নদীর উজান থেকে ভেসে এলো দেহটা, পেট ফুলে উঠেছে, নিথর মুখ চেয়ে আছে আকাশের দিকে। কালো একটা কাক বসে আছে বুকের উপর, ঠুকরে চোখের মণি উপড়ে ফেলতে ঝাঁকি খেলো মাথাটা। নিঃশব্দে জাহাজের ধারে দাঁড়িয়ে মৃতদেহটা ভেসে যেতে দেখলাম আমরা।
সিংহ বাহিনীর জামা ওর পরনে, শান্তস্বরে বলে উঠলো ট্যানাস। নেমবেটের বাহিনীর প্রথমসারির যোদ্ধা এরা। হোরাসের কাছে প্রার্থনা করি, আর যেনো এর মতো কোনো শবদেহের দেখা পেতে না হয়।
কিন্তু তা হওয়ার নয়। দশ, একশ, আরো, আরো মৃতদেহ ভেসে আসতে লাগলো উজান থেকে একসময় নদীর দুই তীরের মধ্যবর্তী পানি ছেয়ে গেলো মিশরীয় যোদ্ধাদের মৃতদেহে। গ্রীষ্মের সেচ খালগুলো যেমন কচুরীপানায় ভরা থাকে, সে রকমভাবে পানিতে বিছিয়ে রইলো লাশের পর লাশ।
শেষমেষ, একজন জীবিতের দেখা পেলাম আমরা। সিংহবাহিনীর একজন উচ্চ পদস্থ যোদ্ধা সে, নেমবেটের ডানহাত । একটা প্যাপিরাসের ঝোঁপ আঁকড়ে ধরে স্রোতে ভেসে চলছিলো। পানি থেকে তাকে উদ্ধার করে আঘাতের পরিচর্যা শুরু করা হলো। একটা কাঁধ শেষ হয়ে গেছে বেচারার, আর কখনো ওই হাতে কিছু ধরা সম্ভব হবে না।
কথা বলার মতো সুস্থ হয়ে উঠতেই, ট্যানাস তার পাশে মাদুরে বসলো।
লর্ড নেমবেটের কী খবর?
মারা গেছেন তিনি, সঙ্গে তাঁর পুরো বাহিনী। কর্কশ কণ্ঠে মুখ খুললো যোদ্ধা।
হিকসস্দের সম্পর্কে আমার পাঠানো সতর্কবার্তা কী তার কাছে পৌঁছেনি?
যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে ওটা হাতে পেয়েছিলাম আমরা, পড়ে হেসেছিলেন নেমবেট।
হেসেছিলেন? গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চায় ট্যানাস। হাসির কী লেখা ছিলো ওখানে?
উনি বললেন কুত্তার বাচ্চাটা ধ্বংস হয়ে গেছে–আমাকে ক্ষমা করুন, ট্যানাস, কিন্তু ওই নামেই আপনাকে সম্বোধন করেছিলেন তিনি,–আর এখন নিজের কাপুরুষতা ঢাকতে আমার কাছে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছে! উনি আরো বলেছিলেন, চিরাচরিত রীতি অনুযায়ীই লড়বো আমরা।
আত্মগরিমাপূর্ণ আহাম্মক একটা, অনুতাপ করে বললো ট্যানাস। তারপর কী হলো?
নদীর সামনে, পুব তীরে তাবু গাড়লেন নেমবেট। ঠিক বাতাসের মতো আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পানিতে ফেলে দিলো শক্ররা।
কতোজন বেঁচে গেছে? শান্তস্বরে জানতে চায় ট্যানাস।
আমার ধারণা, নেমবেটের সঙ্গে ময়দানে যাওয়া যোদ্ধাদের মধ্যে কেবল আমি বেঁচে আছি। আর কোনো জীবিত সৈনিক আমার চোখে পড়েনি। যে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছে নদী তীরে, তার বর্ণনা করার ভাষা নেই আমার।
আমাদের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধারা শেষ হয়ে গেছে, শোকে মুষড়ে পড়লো ট্যানাস। আমরা প্রতিরক্ষাবিহীন হয়ে গেলাম। এক জাহাজগুলোই আছে এখন। নেমবেটের নৌবাহিনীর কী খবর? মাঝ নদীতে ছিলো ওগুলো?
বেশিরভাগ জাহাজই ছিলো মাঝ-নদীতে, কেবল পঞ্চাশটি গ্যালি তীরে ভিড়িয়েছিলেন নেমবেট।
কেমন করে এটা করেন তিনি, রাগে গর্জে উঠে ট্যানাস। জাহাজের নিরাপত্তা বিধান তো আমাদের চিরাচরিত যুদ্ধ-কৌশল!।
তিনি কী ভেবে এমন করেছিলেন, জানি না, তবে সম্ভবত আপনার সতর্কবার্তা সত্যি প্রমাণিত হলে পিছিয়ে যোদ্ধাদের নিয়ে জাহাজে উঠে পড়ার পরিকল্পনা ছিলো তার।
জাহাজগুলোর কী অবস্থা? সেনাবাহিনী হারিয়েছেন নেমবেট, গ্যালিগুলো রক্ষা করতে পেরেছিলেন? রাগে, দুশ্চিন্তায় কর্কশ শোনালো ট্যানাসের কণ্ঠ।
মাঝ নদীতে থাকা বেশিরভাগ জাহাজেই আগুন জ্বলতে দেখেছি আমি। কোনো কোনোটি নোঙর তুলে পালাচ্ছিলো থিবেসের পথে, এতে আতঙ্কিত ছিলো তারা, আমার চিৎকার শুনতে পায়নি।
আর, তীরে যে পঞ্চাশটি গ্যালি ছিলো দম নিয়ে প্রশ্নটা শেষ করে ট্যানাস। সেগুলোর কী হলো?
ওগুলো এখন হিকসস্ দের হাতে, কেঁপে উঠে মাথা নীচু করে ফেললো আহত সৈনিক। স্রোতে ভেসে আসার সময় পেছনে তাকিয়ে দেখেছি, দলে দলে আমাদের জাহাজের দখল নিচ্ছে শত্রু সৈনিকরা।
দাঁড়িয়ে, হন হন করে গলুইয়ের কাছে চলে এলো ট্যানাস। নদীর উজানে, যেখান থেকে শয়ে শয়ে মৃতদেহ আর নেমবেটের ধ্বংসপ্রাপ্ত নৌবাহিনীর জাহাজের ভাঙা কালো তক্তা ভেসে আসছে সবুজ জলের স্রোতে, সেদিকে চেয়ে রইলো সে। নীরবে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি।
তো, দম্ভপূর্ণ গর্দভটা নিজের আর সেনাদের জীবন শেষ করে দিলো, স্রেফ আমাকে ছোটো করতে গিয়ে। তার এই কাণ্ডের জন্যে অবশ্যই একটা পিরামিড তৈরি করা উচিত, কোনোদিনও মিশরের কেউ এমন কথা শোনেনি।
এ–ই সব নয়, যা শুনলে, বিড়বিড় করে বলতে আমার সঙ্গে সায় দেয় ট্যানাস।
হুমম। এমনকি, হিকসস্ দের নদী পার হওয়ার উপায় করে দিয়েছে সে। আইসিসের মিষ্টি বুকজোড়ার কসম, শত্রুবাহিনী একবার নীল নদ অতিক্রম করতে পারলে শেষ হয়ে যাবো আমরা।
সম্ভবত, নিজের নাম শুনতে পেলেন দেবী আইসিস; বিপরীত দিক থেকে বয়ে আসা বাতাস ধরে এলো। ট্যানাসও টের পেলো সেটা। ঝট করে ঘুরে, নিজের নাবিকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে চালকের প্রকোষ্ঠে চললো সে।
