খোলা পাটাতনে পায়চারী করতে করতে আকাশে তাকালো সে। কখন যে উত্তর থেকে বাতাস বইবে! প্রতি মুহূর্তে আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে হিকসস্ রথ। নেমবেটের নৌবাহিনীই বা কোথায়? তার সাথে একত্র হয়ে নদীর সীমানা ধরে রাখতে হবে আমাদের। যে কোনো মূল্যে।
*
সেই বিকেলে, রাজকীয় জাহাজের চালকের প্রকোষ্ঠে বসলো যুদ্ধ কালীন সভা। ওসিরিসের মন্দিরের প্রধান পুরোহিত ধর্মীয় প্রতিনিধি হিসেবে থাকলেন, লর্ড মারসেকেট রইলেন আহ্বায়ক, আর ট্যানাস, লর্ড হেরাব থাকলে সামরিক প্রতিনিধি হিসেবে।
তিনজন লর্ড মিলে রানি লসট্রিসকে বহন করে আমাদের এই মিশরের সিংহাসনে বসিয়ে দিলো, কোলে তুলে দিলো তার শিশুসন্তানকে। সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান জানালো নতুন শাসককে। যে জাহাজগুলো পাশ দিয়ে ভেসে গেলো, সেখানেও আহত যোদ্ধারা পর্যন্ত হাসিমুখে দাঁড়িয়ে শুভেচ্ছা জানালো মিশরের নতুন সম্রাজ্ঞী আর উত্তরসূরিকে।
ওসিরিসের মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রাজার প্রতীক, নকল দাড়ি আটকে দিলো আমার মিসট্রেসের চিবুকে। ওর সৌন্দর্য আর নারীত্ব তাতে এতোটুকু ক্ষুণ্ণ হলো না। লর্ড মারসেকেট সিংহের লম্বা লেজ বেঁধে দিলেন ওর কোমড়ে, অতঃপর লম্বা লাল সাদা মুকুট পরিয়ে দিলেন রানির মস্তকে। সবশেষে, সিংহাসনের কাছে এসে রাজ্যের প্রতীক রানির হাতে ধরিয়ে দিলো ট্যানাস। স্বর্ণের সেই প্রতাঁকে আকৃষ্ট হয়ে ট্যানাসের হাত থেকে ছোঁ মেরে ওটা নিয়ে নিলো মেমনন।
সে সত্যি একজন রাজা! রাজ্যের প্রতীক হাতে নিয়ে ফেলেছে! উৎসাহের সাথে বললো ট্যানাস, সাথে সাথে হর্ষধ্বনি করে নিজের সন্তুষ্টি প্রকাশ করে সভাষদ ।
আমার মনে হয়, আবনুবের সেই ভয়ঙ্কর দিনের পর সেই প্রথম হেসেছিলাম। এর আগ পর্যন্ত যুদ্ধে পরাজয় আর ফারাওকে হারানোর শোকে মুহ্যমান ছিলাম আমরা। আর এখন, রাজ্যের সমস্ত লর্ড যখন নিচু হয়ে সম্মান জানালেন সিংহাসনে উপবিষ্ট সুন্দরী তরুণী আর তার শিশুপুত্রকে, নতুন উদ্যম জেগে উঠলো আমাদের মাঝে।
সিংহাসনের সামনে নিচু হয়ে শপথবাক্য উচ্চারণ করলো ট্যানাস। ওর দিকে তাকানোর সময় রানির সুন্দর মুখাবয়বে ফুটে উঠলো নিখাদ ভালোবাসা, সবুজ চোখদুটো জুলছিলো ওর। আশ্চৰ্য্য, আমি ছাড়া কেউ সেটা টের পেলো বলে মনে হয় না।
সূর্যাস্তের পর, রাজকীয় প্রকোষ্ঠ থেকে আমার মাধ্যমে তার সামরিক প্রধানের উদ্দেশ্যে একটা বার্তা পাঠালো আমার কর্ত্রী। প্রধান কক্ষে ট্যানাসের সঙ্গে পরামর্শ সভায় বসতে চায় সে। সেই আদেশ অমান্য করার কোনো সুযোগ ছিলো না ট্যানাসের কাছে, মাত্রই রানির কাছে বাধ্য থাকার শপথ করেছে সে।
অদ্ভুত সেই যুদ্ধ-সভার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম আমি। কিন্তু সভা শুরু হতে হতেই আমাকে কক্ষ থেকে নির্বাসন দিয়ে দরোজা পাহারা দিতে পাঠালো মিশরের নতুন কর্ত্রী, যেনো কেউ বিরক্ত করতে না পারে। কক্ষের ভারী পর্দা টেনে দেওয়ার আগে এক ঝলক দৃশ্য দেখলাম–একে অপরের বাহুবন্ধনে জড়িয়ে রয়েছে ওরা দু জন। এতো তীব্র ছিলো ওদের আকর্ষণ, এতো দীর্ঘদিন এ থেকে বঞ্চিত হয়ে ছিলো ওরা, যেনো মরণপণ যুদ্ধে একে অপরকে পিষে ফেলতে লাগলো আলিঙ্গনে।
প্রেমমত্ত দয়িত-দয়িতার অস্ফুট ধ্বনি সারারাত কানে আসলো; নেমবেটের বাহিনীর সাথে যোগ দেওয়ার জন্যে আমাদের জাহাজ রাতেও ভেসে চলছিলো বলে রক্ষা। দাঁড় টানার শব্দ আর ঢাকের গুরুগম্ভীর ধ্বনি, রাজকীয় কক্ষের অভ্যন্তর থেকে ভেসে আসা শীকার আড়াল করে ফেললো।
রাতের শেষপ্রহরে জাহাজের দায়িত্ব নিতে চালকের প্রকোষ্ঠে এলো ট্যানাস। অদ্ভুত বিজয়ীর হাসি ওর ঠোঁটে, যেনো এই মাত্র কোনো যুদ্ধজয় করে এসেছে। কিছুসময় পর খোলা পাটাতনে লসট্রিস এলো ওর পিছুপিছু; স্বর্গীয় আভায় উদ্ভাসিত মুখ এমনকি আমি, যে ওর সৌন্দর্য্যে অভ্যস্ত পর্যন্ত চমকে গেলাম। দিনের পরবর্তী সময়ে সবার সাথে ঘুরে ঘুরে আলাপ করলো রানি, বিশেষত, কিছু সময় পর পরই তার সেনাপ্রধানের পরামর্শ শোনার ফুরসত হলো তার। রাজকুমার মেমননের সঙ্গে সারাদিন কাটালাম আমি।
ছোট্ট মেমননের জন্যে বেশ কটি খেলনা প্রস্তুত করেছিলাম কাঠ খোদাই করে । এর মধ্যে একটি হলো ঘোড়া সহ রথ। অপরটি হলো একটা চাকা এক্সেলের উপর তখনো কাজ করছিলাম।
পায়ের পাতার উপর দাঁড়িয়ে ছোট্ট কাঠের চাকার ঘূর্ণন দেখছিলো মেমনন।
নিখাঁদ চাকতিটা বেশ ভারী হয়ে যায়, কী বলো মেম? দেখছো, কতো দ্রুত গতি হারিয়ে থেমে পড়ছে।
ওটা দাও আমাকে! এক থাবায় চাকাটা কেড়ে নিতে হাত বাড়ায় সে। ওর ছোট্ট আঙুলের ফাঁক গলে পাটাতনে পরে গিয়ে ভেঙে গেলো চাকাটা, সমান চার ভাগ হয়ে গেলো।
তুমি হিকদের মতোই বর্বর দেখছি! আমার বকুনি প্রশংসা হিসেবে নিলো মেম, ওদিকে নিচু হয়ে সাধের খেলনার টুকরোগুলো তুলে নিলাম আমি।
তখনো গোলাকারভাবেই সাজানো অবস্থায় পড়ে আছে চাকার খণ্ডগুলো, হঠাৎই একটা চিন্তা এলো মাথায়। মনের চোখে, নিখাঁদ কাঠের জায়গায় ফাঁকা ফাঁকা স্থান যেনো দেখতে পেলাম আমি। আর মাঝখানে লম্বাটে দণ্ড।
হোরাসের মিষ্টি শ্বাসের কসম! কী করেছো তুমি, মেম! রাজকুমারকে আলিঙ্গন করলাম। গোলাকার আকৃতির মাঝে ছোটো ছোটো দণ্ড, কেন্দ্রে থাকবে একটা হাব! না জানি, ফারাও হলে আর কী চমৎকার দেখাবে তুমি!
