আমার কর্ত্রী যেনো তার শপথ রাখতে পারে, সে জন্যে সৰ্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। থিবেসে পৌঁছে, মমি প্রস্তুতকারীদের জিম্মায় তুলে দেবো ফারাও-এর শবদেহ। অবশ্য যদি, হিকসসেরা ইতিমধ্যে সেখানে না পৌঁছে গিয়ে থাকে, আর সেই জমজ নগরী এবং তার অধিবাসীরা আমরা যাওয়া পর্যন্ত টিকে থাকে।
*
দেয়ালঘেরা আসয়ুত নগরে পৌঁছুলো আমাদের গ্যালি বহর। ছোট্ট শহরের দখল নেওয়ার জন্যে খুব বেশি সৈন্য রেখে যায়নি হিকসস্ রথবাহিনী, সংখ্যায় একশ র অনেক কম। কিন্তু, পাথুরে দেয়ালের ওপাশে সুরক্ষিত রয়েছে রেমরেমের নেতৃত্বে পাঁচ হাজার যোদ্ধা, যাদের রেখে গিয়েছিলো ট্যানাস। মূল রথবাহিনী বীরবিক্রমে এগিয়ে চলেছে দক্ষিণে, থিবেস অভিমুখে। যদিও সংখ্যায় কম, তারপরেও হীন মনোবল মিশরীয় যোদ্ধাদের নিয়ে আবারো ভয়ঙ্কর রথের মুখোমুখি হওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিলো ট্যানাস, ওর ইচ্ছে দক্ষিণে এগিয়ে নেমবেটের ত্রিশ হাজার যোদ্ধার সঙ্গে একত্র হয়ে একবারে আক্রমণ শানানো। নীলের মূল স্রোতধারায় আমাদের ছুঁতে পারবে না রথ বাহিনী, তাই মাঝ নদীতেই রইলো গ্যালিগুলো। ট্যানাসের সংকেত পেয়ে রাতের অন্ধকারে কিছু সময়ে জন্যে বেলাভূমিতে ভীড়লো কয়েকটি জাহাজ, এই সময়ের মধ্যেই শত্রুরা তাদের রথে জানোয়ার জুড়ে নেওয়ার অবসরে নিরাপদে পালিয়ে আসতে সক্ষম হলো রেমরেমের প্রায় সমস্ত যোদ্ধা। দেরি না করে সাথে সাথেই থিবেসের উদ্দেশ্যে ভেসে চললাম আমরা।
রেমরেম জানালো, আমাদের বার্তাবহনকারী গ্যালি গতকালই আসয়ুত পেরিয়েছে, কাজেই ট্যানাসের নির্দেশে আমার লেখা সতর্কবাণী নিশ্চই এখন নেমবেটের হাতে।
হিকসস্দের সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেলাম রেমরেমের কাছে। দুজন মিশরীয় বিশ্বাসঘাতককে পাকড়াও করেছিলো সে, যারা আসতের ভেতরে গুপ্তচরবৃত্তি করছিলো হিকসস্ রাজার হয়ে। নির্যাতন করে ওই দু জনের মুখ থেকে মূল্যবান তথ্য বের করতে সমর্থ হয়েছে রেমরেম।
আবনুবের সমতলে যে রাজার সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিলাম আমরা, জানা গেলো, তার নাম স্যালিতিস। সেমেটিক রক্ত বইছে শরীরে, তার গোত্র মূলত যাযাবর গোছের, পেশায় রাখাল; জাগরোস পর্বতের কাছে ভ্যান হ্রদ এলাকায় তাদের বসবাস। এতে করে, রক্তপিপাসু এই এশীয়দের সম্পর্কে আমার প্রথম সন্দেহ সত্যি হলো। তাদের চেহারা দেখেই বুঝেছিলাম, এরা সেমিটিক বংশের; কিন্তু রাখাল গোছের। লোকেরা কেমন করে চাকায় চলা রথ তৈরি করলো, আর সেই ভয়ঙ্কর প্রাণী, আমরা মিশরীয়রা বর্তমানে যাকে ঘোড়া বলে জানি, যা আমাদের কাছে অন্ধকার জগতের জীব, সেগুলো কোথায় পেলো ভেবে কোনো কূল-কিনারা পেলাম না।
অন্যান্য ক্ষেত্রে, জানা গেলো, হিকসসেরা পিছিয়ে থাকা জাতি। লিখতে বা পড়তে জানে না তারা, একমাত্র শাসক এবং রাজা, স্যালিতিসের অধীনে দস্যুবৃত্তি করে বেড়ায়। রথ-টানা সেই ভয়ঙ্কর জীবের চেয়েও রাজা স্যালিতিসবে বেশি ভয় এবং ঘৃণা করতো মিশরীয়রা।
হিকসস্দের প্রধান দেবতার নাম সুতেখ-ঝড়ের দেবতা তিনি। আমাদের অন্ধকারের প্রতিনিধিত্বকারী দেবতা, সেথ-এর সাথে তার মিল খুঁজে পেতে বিশেষ ধর্মীয় জ্ঞানের প্রয়োজন হয় না। এদের ব্যবহার আর যে দেবতার পূজো করে তারা –তা থেকে তাদের সম্পর্কে ভালো কোনো ধারণা হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। কোনো সভ্য জাতিই এমনভাবে খুন, বর্বরতা আর জ্বালাও-পোড়াও নীতি চালিয়ে যেতে পারে না।
সত্যি, আগেও লক্ষ্য করেছি, নিজেদের প্রকৃত রূপ প্রকাশ করার জন্যে পছন্দমতো দেবতাদের পূজো করে বিভিন্ন জাতি। ফিলিস্তিনীরা বাল-এর অনুসারী জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে শিশুদের নিক্ষেপ করে তারা, যা তাদের কাছে দেবতার মুখ। কালো কুশীয়রা পূজো করে অন্ধকার জগতের দৈত্য-দানোর, বিচিত্র তাদের ধর্মীয় আচার-আচরণ। আমরা মিশরীয়রা দয়ালু এবং প্রকৃত দেব-দেবীর আরাধনা করি, মানব জাতির প্রতি যারা অত্যন্ত সদয়, বলি দেওয়া আমাদের ধর্মে নিষেধ।
ধারণা করি, রেমরেমের পাকড়াও করা গুপ্তচর দুজনই নয়, আরো মিশরীয় চর রয়েছে রাজা স্যালিতিস এর বাহিনীতে। পাছায় জ্বলন্ত কয়লার হ্যাঁকা খেয়ে একজন বন্দী স্বীকার গিয়েছিলো, উচ্চ-রাজ্যের কিছু লর্ড রয়েছে স্যালিতিসের যুদ্ধ পরামর্শকদের মধ্যে। বুঝলাম, কেমন করে আমাদের সেনাবাহিনীর একান্ত নিজস্ব কৌশল-বিন্যাস আগে থেকেই জেনে গিয়েছিলো হিকসসেরা, আবনুবের সমভূমিতে। তখনো মনে হয়েছিলো, আমাদের মধ্যে তাদের কোনো গুপ্তচর না থেকেই যায় না।
এসব সত্যি হলে, আমাদের শক্তিমত্তা, দুর্বলতা সবই তাদের জানা হয়ে গেছে। সমস্ত মিশরীয় নগরের মানচিত্র, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জানতে বাকি নেই তাদের। বিশেষত, সমাধি-মন্দিরে রাখা ফারাও-এর বিপুল ধন-সম্পদের হদিশ পেয়ে গেছে তারা।
সম্ভবত, এ কারণেই এতো দ্রুত থিবেস অভিমুখে চলেছে স্যালিতিস, ট্যানাসকে বললাম আমি। প্রথম সুযোগেই নীল নদ অতিক্রম করতে চাইবে তারা। তিক্তস্বরে অভিশাপ বকে ট্যানাস।
হোরাস সদয় হলে, বিশ্বাসঘাতক মিশরীয় লর্ডদের হাতে পাবো আমি, হাতে ঘুষি পাকিয়ে বললো সে। কিছুতেই নদী পেরোতে দেওয়া যাবে না রাজা স্যালিতিসকে। আমাদের জাহাজগুলোই একমাত্র শক্তি ওদের বিরুদ্ধে। কাজে লাগাতে হবে ওগুলোকে।
