মাঝে-মধ্যে মৃতের পুস্তক উদ্ধৃতি করছিলেন। সেই বালক বয়স থেকে পুরোহিতেরা শিক্ষা দিয়ে এসেছেন, স্বর্গের বিস্তীর্ণ মাঠে ঠিকানা খুঁজে পাবার চাবিকাঠি বা মানচিত্র হলো তা :
ফটিক-পথে আছে একুশটি বাঁক।
সবচেয়ে সরু পথ ঠিক তামার ফলার মতো।
দ্বিতীয় প্রবেশদ্বার প্রহরারত দেবী অত্যন্ত ধূর্ত
এবং কূটিল।
প্রজ্জ্বলিত শিখার রমনী তিনি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বেশ্যা,
মুখ তার সিংহীর ন্যায়,
পুরুষকে গিলে খায় তার যোনী,
দুগ্ধস্রোতে পথ হারায় তারা।
ক্রমশই দুর্বল হয়ে আসতে থাকে তাঁর কণ্ঠস্বর এবং নড়াচড়া। দুপুর গড়ানোর কিছু সময় পরে শেষ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিথর হয়ে গেলেন তিনি। নিচু হয়ে তাঁর গলায় হৃদস্পন্দন অনুভব করলাম, নেই, আমার স্পর্শের নিচে ধীরে ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। ফারাও-এর শরীর।
মহান ফারাও আর নেই, নরম স্বরে বলে তাঁর চোখের পাতা বন্ধ করে দিলাম।
শোকে চিৎকার করে কান্নায় ভেঙে পড়লো উপস্থিত প্রতিটি মানুষ। রাজবধূদের সঙ্গে চেঁচিয়ে কাঁদলো লসট্রিসও। এমন তীব্র-তীক্ষ সেই চিৎকার, আমার বৃকের নিচে যেনো সুড়সুড় করে উঠলো কোনো মাকড়শা, ধীরে প্রকোষ্ঠে ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। আমার পিছুপিছু পাটাতনে এসে হাত আঁকড়ে ধরলো ট্যানাস।
তোমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে তো? হিসহিস স্বরে বললো সে। নাকি, এ তোমার নতুন কোনো চাতুৰ্য্য?
জানি, নিজস্ব অপরাধবোধ আর ভয় থেকে ও রকম আচরণ করেছিলো ট্যানাস, কাজেই ভদ্রভাবে উত্তর দিলাম। হিকসস্ তীর তাঁকে শেষ করে দিয়েছিলো। আমার সমস্ত ক্ষমতা দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু এ যে নিয়তির খেলা, আমন রার ইচ্ছে। আমাদের কারো কোনো দোষ নেই।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটা ভারী হাত আমার কাঁধে রাখে ট্যানাস। এসব ঘটবে, কখনো ভাবতেও পারিনি। কেবল রানি আর আমাদের দুজনের সন্তানের কথা ভেবেছিলাম। ওর এই মুক্তিতে আমার বোধহয় আনন্দ করা উচিত; কিন্তু পারছি না। বহুকিছু শেষ হয়ে গেছে। দেবতার ইচ্ছাধীন আমরা সবাই।
এর পর থেকে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করে আছে সুখ আর আনন্দ। ওকে আশ্বস্ত করে বললাম। যদিও এই দাবির পেছনে কোনো যুক্তি নেই। কিন্তু, এখনো আমার কর্ত্রীর উপর বেশ বড়ো একটা দায়িত্ব ন্যস্ত আছে। এবং তার মাধ্যমে, তোমার আর আমার উপরও। রাজাকে করা লসট্রিসের শপথের কথা মনে করিয়ে দিলাম ট্যানাসকে ফারাও-এর নশ্বর দেহকে যথাযথরূপে সমাধিস্থ করে তাঁর আত্মাকে স্বর্গের মাঠে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার শপথ সেটা।
বলো, কেমন করে সাহায্য করতে পারি আমি? ট্যানাস জানতে চায়। কিন্তু মনে রেখো, আমাদের সামনে উচ্চ-রাজ্যের অভ্যন্তরে তছনছ করছে হিকসস্ বাহিনী, কোনো নিশ্চয়তা নেই ফারাও-এর সমাধি লজ্জিত হবে না।
সেক্ষেত্রে, প্রয়োজনবোধে, তার জন্যে নতুন একটা সমাধি খুঁজে বের করতে হবে আমাদের। এই গরমে, সূর্যাস্তের আগেই পঁচে-গলে যাবে তাঁর দেহ। যদিও শবপ্রস্ত তিতে ভালো দখল নেই আমার, কিন্তু কথা রাখার জন্যে মাত্র একটা উপায়ের কথাই জানা আছে।
ট্যানাসের নির্দেশে জাহাজের ভাড়ার থেকে বিশাল মাটির একটা পাত্র বের করলো নাবিকেরা। এরপর, আমার পরামর্শে, ওটা খালি করে ফুটন্ত পানিতে ভর্তি করা হলো। পানি গরম থাকতে থাকতেই বিশুদ্ধ সামুদ্রিক লবণের তিনটি পাত্র খালি করলো ট্যানাস, ওটার ভেতর। এরপর, চারটি ছোট্ট পাত্রে সেই পানি নিয়ে খোলা পাটাতনে ঠাণ্ডা হওয়ার জন্যে রেখে দেওয়া হলো।
ইত্যবসরে, রাজ-প্রকোষ্ঠে একা কাজ করছিলাম আমি। মিসট্রেস অবশ্য সাহায্য করতে চাইছিলো, কিন্তু রাজকুমারের যত্ন নেওয়ার জন্যে তাকে পাঠিয়ে দিলাম।
বুকের খাঁচা থেকে কোমড়ের হাড় পর্যন্ত ফারাও-এর শবদেহের একপাশ চিরে ফেললাম আমি। সেই ফাঁক দিয়ে বুক আর পেটের সমস্ত অঙ্গ আর বস্তু বের করে ফেললাম। মধ্যচ্ছদাও টেনে বের করে নিলাম ছুরির সাহায্যে। স্বাভাবিক কারণেই, জীবন আর বুদ্ধিমত্তার অঙ্গ হিসেবে হৃদপিণ্ড রেখে দিলাম শরীরের অভ্যন্তরে। বৃক্ক দুটোও রাখলাম–কেননা, ও দুটো হলো জলের ধারক, নীল নদের প্রতিনিধিত্বকারী অঙ্গ। শরীরের ফাঁপা অভ্যন্তরে লবন দিয়ে পূর্ণ করে সেলাই করে দিলাম। করোটির ভেতর থেকে থকথকে সেই বস্তু বের করার জন্যে নাকের ফুটো দিয়ে উপরে সেঁধিয়ে দেওয়ার যে বিশেষ চামচ প্রয়োজন, আমার কাছে তা না থাকায় রেখে দিতে হলো মগজ। অবশ্য, এর কোনো গুরুত্বও নেই। আলাদা করে রাখলাম সমস্ত অঙ্গ : যকৃত, পাকস্থলি, ফুসফুস আর নাড়ি। নাড়ি-ভুড়ি আর পাকস্থলি ধুয়ে পরিষ্কার করে নিলাম লবণাক্ত জল দিয়ে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কঠিন কাজ ছিলো সেটা।
এ সমস্ত কাজ শেষ হতে, রাজার ফুসফুস পরীক্ষা করে দেখার ফুরসত পেলাম। ডান দিকের ফুসফুসটি এখনো গোলাপী, সুস্থ; কিন্তু তীরবিদ্ধ বাম দিকের ফুসফুস ফুটো হওয়া বেলুনের মতো চুপসে গেছে। এমন ভয়ঙ্কর আঘাত নিয়েও বুড়ো মানুষটা এতোটা সময় বেঁচে ছিলো কীভাবে, সেটাই আশ্চর্য। পৃথিবীর কোনো চিকিৎসকের সাধ্য ছিলো না, তাকে বাঁচিয়ে তোলে।
শেষমেষ, ঠাণ্ডা হয়ে আসা পানিভর্তি ছোট্ট পাত্রগুলো নিয়ে আসতে বললাম নাবিকদের। ট্যানাসের সহায়তার ভ্রুণের আকৃতিতে ভাঁজ করে অলিভের সেই প্রকাণ্ড জারে ঢোকালাম ফারাও-এর শবদেহ। শরীরের প্রতিটি অংশ অত্যন্ত শক্তিশালী লবণাক্ত তরলে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়েছে কি না নিশ্চিত করলাম আমি। দেহ অভ্যন্তরের অঙ্গগুলোর স্থান হলো ছোট্ট পাত্রগুলোতে। পিচ আর মোম দিয়ে সীলগালা করা হলো সবগুলো পাত্র। জাহাজের পাটাতনের নিচে একটা প্রকোষ্ঠে নিরাপদে সাজিয়ে রাখলাম সেগুলো। ওখানেই নিজের ধন-সম্পদ রাখতেন তিনি। আমার ধারণা, স্বর্ণ আর রুপোয় পরিবেষ্টিত অবস্থায় থাকতে খারাপ লাগবে না ফারাও-এর।
