জ্বলন্ত মশালের মতো জাহাজগুলোর দিকে তাকিয়ে সমগ্র মিশর আর ট্যানাসের জন্যে শোকে মুহ্যমান হলাম আমি এবং লসট্রিস। সকালের সূর্যকে ম্লান করো দিয়ে জ্বললো আমাদের জাহাজগুলো।
এরপর, ট্যানাসের নির্দেশে অসুস্থ আর মৃতপ্রায় লোকে বোঝাই আমাদের অবশিষ্ট গ্যালি নোঙর তুললো। আবারো দক্ষিণে রওনা হলাম আমরা।
আমাদের পেছনে প্রজ্জ্বলিত কাঠামো থেকে বের হওয়া ধোয়া সকালের আকাশে উঁচু হয়ে রইলো, ওদিকে, সামনের আকাশের বহু উপরে এগিয়ে চললো হলুদ ধুলোর মেঘ; নীল নদের পুব তীর ধরে ক্রমশই ভেতরে প্রবেশ করছে হিকসস্ রথবাহিনী, এগিয়ে চলেছে অসহায় থিবেসের দিকে, উচ্চরাজ্যের আরো গভীরে।
মনে হলো, দেবতারা আমাদের মিশরের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন; বছরের এই সময়ে উত্তর থেকে সাধারণত জোরালো হাওয়া বয়, কিন্তু এখন বাতাসে থমথমে স্থবিরতা। কিছু সময় পর বিপরীত দিকে থেকে বাতাস বইতে শুরু করায় সর্বনাশের ষোলোকলা পূর্ণ হলো। আহত, মৃতপ্রায় লোকে বোঝাই আমাদের গ্যালিগুলো স্রোত এবং বাতাসের বিরুদ্ধে ধীর গতিতে এগুতে লাগলো। স্বল্প সংখ্যক নাবিক প্রাণপণে দাঁড় টেনেও হিকসস্ বাহিনীর সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না, দ্রুত গতিতে দূরে সরে যাচ্ছে তারা।
রাজার চিকিৎসায় পুরো সময় ব্যয় করতে লাগলাম আমি। কিন্তু, অন্য জাহাজগুলোয় অনেক আহত সৈনিক চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছে। যতোবার ফারাও এর শয্যাপাশ থেকে উঠে একটু দম নিতে ভোলা পাটাতনে এলাম, আশেপাশের গ্যালিগুলো থেকে নদীতে লাশ ফেলতে দেখলাম। সাথে সাথেই পানিতে আলোড়ন করে উঠলো কুমিরের দল। ঠিক ক্ষুধার্ত শকুনের মতোই আমাদের গ্যালিগুলোর পেছনে চললো শয়তান সরীসৃপগুলো।
টিকে রইলেন ফারাও, দ্বিতীয় দিনে সামান্য একটু তরল খাওয়াতে সক্ষম হলাম। সেই সন্ধায় আবারো রাজকুমারকে দেখতে চাইলেন তিনি, ডেকে আনা হলো মেমননকে।
ততদিনে ঘাসফরিঙের মতো চঞ্চল আর পাখির মতো কিচির মিচির করতে শিখে। গেছে সে। সবসময়ই ছেলেটাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন ফারাও। মাঝে মধ্যে হয়তো বাড়াবাড়ি রকম প্রশ্রয় দিয়ে ফেলতেন, কাজেই তাঁর সান্নিধ্যে খুশির কমতি ছিলো না ছোট্ট মেমননের। ইতিমধ্যে অত্যন্ত সুন্দর এক শিশুতে পরিণত হয়েছে সে, পরিষ্কার, লম্বা হাত-পা, মায়ের মতো মসৃণ ত্বক আর গাঢ় সবুজ চোখ। সদ্য জন্মানো মেষশাবকের মতো কোঁকড়া ছিলো ওর চুল, কিন্তু সূর্যের আলো পড়লে ঠিক ট্যানাসের চুলের মতোই জ্বলতো।
অন্য সময়ের চেয়েও বেশি টান অনুভব করতেন ফারাও, মেমননের প্রতি। এই ছেলে আর আমার কীর থেকে নেওয়া শপথ তাঁর অমরত্বের চাবিকাঠি। সূর্যাস্ত পর্যন্ত আমার সান্নিধ্যে রাজকুমারকে নিজের কাছে রাখতেন তিনি। জানতাম, মেমননের চঞ্চলতা, দুষ্টামি ফারাও-এর শক্তি শুষে নিচ্ছিলো, কিন্তু একমাত্র রাতের খাবারের সময় ছাড়া ছেলেকে কাছ ছাড়া করতেন না ফারাও।
আমার কর্ত্রী আর আমি, তিনি না ঘুমিয়ে যাওয়া পর্যন্ত শয্যাপাশে থাকতাম। প্রসাধনী ছাড়াও তার মুখাবয়ব ছিলো লিনেন চাদরের মতো সাদা।
পরবর্তী দিনটি হলো আঘাতপ্রাপ্তির তৃতীয় দিন, কাজেই সবচেয়ে বিপদজনক। যদি এই দিনটি টিকে থাকেন তিনি, আমি জানি, তাকে সেরে তুলতে পারবো। কিন্তু সকালে ঘুম ভেঙে জেগে উঠে দেখি, পুরো প্রকোষ্ঠে মৃত্যুর গন্ধ। ফারাও-এর হুক ছুঁয়ে দেখি দারুন উত্তাপে পুড়ে যাচ্ছে। চিৎকার করে মিসট্রেসকে ডাকলাম। হন্তদন্ত হয়ে পর্দার ওপাশ থেকে উঠে এলো সে।
কী হয়েছে, টাইটা? আর কিছু না বলে নীরবে আমার চেহারায় তাকিয়ে রইলো লসট্রিস। আমার পাশে বসতে, ধীরে ফারাও-এর বুকের পট্টি খুলে ফেলতে লাগলাম। যে সূতো দিয়ে সেলাই করেছিলাম ক্ষতটা, ওগুলো কেটে ফেলতে দৃষ্টি গোচর হলো আঘাতের ভয়াবহতা।
দয়াময়ী হাপি, উনার প্রতি দয়া করুন! ক্ষতের দিকে তাকিয়ে কঁকিয়ে উঠলো রানি। কালো যে পরত পড়েছিলো ক্ষতের মুখে, ওটা ফেটে গিয়ে ধীরে বেরিয়ে আসতে লাগলো ঘন, সবুজ পুঁজ।
পঁচন ধরে গেছে! ফিসফিসালাম আমি। এ হলো যে কোনো শল্যবিদের চরমতম দুঃস্বপ্ন। তৃতীয় দিবসে শুরু হয়ে সারা দেহে ছড়িয়ে পরে পঁচন।
কী করবো আমরা এখন? লসট্রিসের প্রশ্নের উত্তরে এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লাম।
রাত নামার আগেই মারা যাবেন উনি, বললাম ওকে। পুরো জাহাজে এ খবর রটে যেতে সভাসদ, মহৎপ্রাণ, জমিদারগণ ভীড় করে এলেন ছোট্ট প্রকোষ্ঠে। নীরবে অপেক্ষায় রইলাম আমরা।
সবার শেষে এলো ট্যানাস। এক হাতে শিরস্ত্রাণ ধরে রেখে মাথা নিচু করে শোকের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো সে। মৃত্যুশয্যায় নয়, ওর নজর স্থির হলো লসট্রিসের উপর।
কারুকাজ করা লিনেনের শাল দিয়ে মাথা ঢেকে রেখেছিলো রানি, শরীরের ঊর্ধ্বাংশে কিছু পরেনি সে। রাজকুমারের মাতৃদুগ্ধ ছাড়ার পর স্বাভাবিক আকৃতি ফিরে পেয়েছে তার বুক জোড়া। কুমারীর মতোই পাতলা শরীরের কোথাও গর্ভাস্থার কারণে রুপালি দাগ পড়ে নি। এতো মসৃণ, উজ্জ্বল ত্বক ওর, যেনো মাত্রই সুগন্ধি তেল মেখেছে।
জ্বর কমানোর জন্যে ফারাও-এর শরীরে ভেঁজা কাপড় রাখলাম আমি। তাপে খুব দ্রুতই শুকিয়ে গেলো সেটা, বারবার পাল্টাতে হলো। এপাশ-ওপাশ করে, বেহুঁশ অবস্থায় তড়পালেন ফারাও সম্ভবত অন্য জগতের দৈত্য-দানোর আতঙ্কে।
