দেবী হাপি আর সমস্ত দেবতাদের শপথ করলাম, নরম অথচ পরিষ্কার স্বরে বললো রানি লসট্রিস। সামনের বছরগুলোয় অন্ততঃ একশবার এই নিয়ে পরিতাপ করেছিলাম আমি, যদি শপথ এড়িয়ে যেতো লসট্রিস!
সন্তুষ্টির ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ফারাও, ধীরে লসট্রিসের হাত ছেড়ে দিলেন। এবার তবে, তোমার চিকিৎসার জন্যে তৈরি আমি টাইটা। দেবতাদের যা ইচ্ছে করুন, কেবল একবার আমার শিশুপুত্রকে চুমু খেতে চাই।
ছোট্ট রাজকুমারকে নিয়ে আসার অবসরে সমস্ত মহৎপ্রাণ আর রাজবধূদের তাড়িয়ে দিলাম আমি প্রকোষ্ঠ থেকে। এরপর, দারুন শক্তিশালী একটা মিশ্রণ তৈরি করলাম লাল শেপেনের গুড়া থেকে। এতো ব্যথা হবে ফারাও-এর, যার ফলে মৃত্যু ঘটতে পারে।
সবুটুক মিশ্রণ খেয়ে ফেলতে তার চোখের মণি ছোটো হওয়ার অপেক্ষায় রইলাম। অবশেষে, ফারাও-এর চোখের পাতা বন্ধ হতে, পরিচারিকাদের সঙ্গে বাইরে পাঠিয়ে দিলাম রাজকুমারকে।
*
ট্যানাস যখন রাজকীয় জাহাজে চড়লো, ততক্ষণে অন্ধকার ঘনিয়েছে। মশালের আলোয় যুদ্ধক্ষেত্রের কোনো শবদেহের মতোই দেখালো তাকে। ক্লান্তি আর ধুলোয় মাখামাখি বিবর্ণ, ফ্যাকাসে মুখ। শুকনো রক্ত আর কাদামাটি লেপ্টে আছে কাপড়ে, চোখের নিচে কালো আর নীলাফোলা ছায়া। আমাকে দেখতে পেয়েই ফারাও-এর সম্বন্ধে জানতে চাইলো সে।
তীরটা বের করেছি আমি, জানালাম তাকে। কিন্তু আঘাত অত্যন্ত গভীর, হৃদপিণ্ডের কাছাকাছি। একেবারেই দুর্বল হয়ে পড়েছেন তিনি। তিনদিন পর্যন্ত টিকে গেলে হয়তো প্রাণ বাঁচানো যাবে।
তোমার কর্ত্রী আর তার পুত্রের কী খবর? যখনই দেখা হয়, এই প্রশ্ন ট্যানাস করবেন আমাকে।
রানি ক্লান্ত; তীর বের করার সময় শল্যচিকিৎসায় আমাকে সাহায্য করেছে সে। ফারাও, তাকে দেশের শাসনভার দিয়েছেন। রাজকুমার আগের মতোই সুস্থ, হাসিখুশি।
লক্ষ্য করলাম, কাঁপছে ট্যানাস। মূলত নিজের অসাধারণ শক্তিমত্তার প্রান্তসীমায় পৌঁছে গেছে সে। বিশ্রাম প্রয়োজন তোমার বলতেই, মাথা নেড়ে উড়িয়ে দিলো ট্যানাস।
আলো নিয়ে এসো এখানে, আদেশ করে সে। টাইটা, লেখার সরঞ্জাম রঙ তুলি, কালির পাত্র আর স্ক্রোল নিয়ে এসো। নেমবেটকে একটা সতর্কবার্তা পাঠাতে হবে এখনই, নচেৎ সরাসরি হিকসস্দের হাতে এসে পড়বে।
কাজেই, অর্ধেক রাত জাহাজের খোলা পাটাতনে বসে থেকে নেমবেটের উদ্দেশ্যে জরুরি বার্তা লিখলাম আমরা। বার্তাটি ছিলো এরকম : :
মিশরের সাহসী সিংহ, ফারাও সেনাবাহিনীর রা বিভাগের সেনাপতি, লর্ড নেমবেটকে অভিনন্দন। আপনি চিরজীবি হোন!
আপানাকে জানানো যাচ্ছে যে, আবনুবের সমভূমিতে শত্রু হিকসস্দের সঙ্গে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছি আমরা। ভয়ঙ্কর শক্তিশালী এবং হিংস্র তারা এমন অদ্ভুত, দ্রুতগামী বাহন আছে সঙ্গে, যার বিরুদ্ধে আমরা অসহায়।
আপানাকে আরো জানাতে চাই, শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে আমাদের সেনাবাহিনীর, ধ্বংস হয়ে গেছি আমরা। হিকসস্দের ঠেকিয়ে রাখার কোনো উপায় নেই আমাদের কাছে।
আরো জানানো হচ্ছে, যুদ্ধে মারাত্বক আহত অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন ফারাও। আপনাকে সতর্ক করে দিয়ে জানাচ্ছি, কিছুতেই খোলা ময়দানে হিকসস্ বাহিনীর মুখোমুখি হবেন না; তাদের বাহন বায়ুর গতিতে চলে। যথাসম্ভব, পাথুরে দেওয়ালের আড়ালে আশ্রয় নিন, অথবা, জাহাজে অবস্থান নিন।
হিকসস্দের নিজস্ব কোনো জাহাজ নেই, কাজেই শুধুমাত্র আমাদের জাহাজের মাধ্যমেই তাদের সাথে যুদ্ধে টিকে থাকা সম্ভব।
আমরা আপনার বাহিনীর সঙ্গে যোগদান না করা পর্যন্ত লড়াইয়ে নামা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো যাচ্ছে।
হোরাস এবং সমস্ত দেবতা আপনার সঙ্গী হোন।
ট্যানাস, লর্ড হেরাব, ফারাও সেনাবাহিনীর টাহ্ বিভাগের সেনাপতি।
.
চারটি বার্তা লিখলাম এ রকম, দক্ষিণে লর্ড নেমবেটের কাছে পৌঁছানোর জন্যে বার্তাবাহকদের খবর দিলো ট্যানাস। বার্তা সমেত দুইটি দ্রুতগামী গ্যালি নদীর উজানে পাঠিয়ে দিলো সে, এছাড়াও, নীল নদের পশ্চিম তীর ধরে পায়ে হেঁটে পাঠিয়ে দিলো কয়েকজন সৈনিককে।
একটা না একটা স্ক্রোল নেমবেটের কাছে পৌঁছুবেই। সকালের আগে আর কিছু করার নেই তোমার, ট্যানাসকে আশ্বস্ত করে বললাম আমি। এখন কিছুক্ষণ অন্তত ঘুমাও, না হলে তোমার সাথে সাথে মিশরের সমস্ত আশাও শেষ হয়ে যাবে।
রাজার প্রকোষ্ঠে ফিরে আমার কর্ত্রীকে সান্ত্বনা দিতে চললাম।
পরদিন সকালে আলো ফোঁটার আগেই জাহাজের পাটাতনে পৌঁছে শুনলাম, আমাদের জাহাজ পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিচ্ছে ট্যানাস। অবাক বিস্ময়ে থ মেরে গেলাম, অবশেষে কর্কশ কণ্ঠে ট্যানাস বললো, আমার দলের অধিনায়কদের থেকে এই মাত্র খবর পেয়েছি গতকাল, আবনুবের সমভূমিতে যে ত্রিশ হাজার যোদ্ধা হিকসস্ রথের সঙ্গে লড়াইয়ে গিয়েছিলো, তাদের মধ্যে কেবল সাত হাজার বেঁচে গেছে। তার মধ্যে পাঁচ হাজার যোদ্ধা আহত, কারো কারো অবস্থা আশঙ্কাজনক। সুস্থদের মধ্যে নাবিকের সংখ্যা খুবই কম। কাজেই, জাহাজ চালানোর পর্যাপ্ত লোকবল নেই আমার। বাকি জাহাজগুলো নিশ্চই হিকসস্ দের জন্যে রেখে যেতে পারি না।
নলখাগড়ার ঝোপে করে আগুন জ্বাললো তারা। পুরো ছাই হয়ে গেলো আমাদের বহু গ্যালি। এর চেয়ে করুণ দৃশ্য আর কখনো দেখি নি। রাজকীয় জাহাজের গলুইয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো ট্যানাস, মুখের প্রতিটি রেখায়, চওড়া কাঁধের অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠলো শোক। তার কাছে জীবিত কোনো কিছুর মতোই সুন্দর ওই জাহাজবহর।
