এখনো, আবনুবের সমভূমির উপর ঝুলে আছে ধুলোর মেঘ, অর্থাৎ রথবাহিনী এখনো সক্রিয় সেখানে, তবে শত্রুর আক্রমণের ভয় না থাকলে এখনো কিছু করার আছে ট্যানাসের। রথ দিয়ে হয়তো যুদ্ধ জেতা যায়, কিন্তু পায়েচলা সৈনিক শুধু পারে বিজয় ধরে রাখতে। পরবর্তী বছরগুলোতে এই জিনিসটি শিখেছি আমি।
নদীর তীরে এখন যে যুদ্ধ চলছে, এ ট্যানাসের একান্ত ব্যক্তিগত কাজ। ওদিকে, রাজকীয় জাহাজের ভেতরে মৃত্যুর সাথে যুদ্ধে নামতে হচ্ছে আমাকে।
৬. একেবারে আশা নেই
একেবারে আশা নেই আমাদের এমন নয়, ফিসফিস করে বললাম লসট্রিসকে; রাজার শয্যাপাশে বসে সে। ট্যানাস ওর বাহিনী গোছাচ্ছে, আর আমাদের এই মিশরকে যদি কেউ রক্ষা করতে পারে, তো সে ট্যানাস। এরপর রাজার চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।
ক্ষত পরীক্ষা করে দেখার সময় আমার অভ্যাসবশত জোরে বলছিলাম। তীরবিদ্ধ হওয়ার পর এক ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে; তীরের দণ্ডের চারপাশের মাংস ফুলে বিচিত্র রঙ ধারণ করেছে।
ওটাকে বের করতেই হবে। ভেতরে থাকলে আগামীকাল সূর্যোদয়ের আগেই মারা যাবেন ফারাও। আমি ভেবেছিলাম, রাজা হয়তো অচেতন আছেন, কিন্তু আমার কথা শুনেছেন তিনি।
কোনো সম্ভাবনা আছে, টাইটা? দুর্বল কণ্ঠে জানতে চাইলেন ফারাও।
নিশ্চই। একেবারেই মিথ্যে কথা ওটা, আমার কণ্ঠস্বরেই প্রকাশ পেয়ে গেলো তা।
ধন্যবাদ, টাইটা। আমি জানি, চেষ্টার কোনো ত্রুটি করবে না তুমি। এই মুহূর্তে যে কোনো রকম দায়-দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিলাম তোমাকে। এ ছিলো তার দয়ালু স্বভাবের আরো একটি নমুনা, অতীতে বহুবার রাজার জীবন রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হয়েছে চিকিৎসককে।
তীরের মাথাটা অনেক গভীরে আটকে গেছে। প্রচণ্ড ব্যথা করবে, আমি লাল শেপেনের গুঁড়ো দিচ্ছি, এতে করে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়বেন।
আমার প্রিয়তমা স্ত্রী, রানি লসট্রিস কোথায়? তার প্রশ্নের সাথে সাথেই সাড়া দিলো মিসট্রেস। আমি আপনার পাশেই আছি, মহান ফারাও।
একটা প্রত্যাদেশ আছে আমার। সমস্ত রাজবধু আর লিপিকারদের খবর দেওয়া হোক, আমার ঘোষণা সবাই শোনার পর লিপিবদ্ধ করা হবে। ছোট্ট প্রকোষ্ঠে গাদাগাদি করে জড়ো হলো সবাই।
আমার কর্ত্রীর উদ্দেশ্যে হাত বাড়ালেন ফারাও। আমার হাত ধরো; আর যা বলছি, শোনো, তার নির্দেশে নিচু হয়ে বসলো লসট্রিস। নরম, প্রায় রুদ্ধশ্বাসে ফারাও বলে চললেন।
আমার মৃত্যুর পর, রানি লসট্রিস আমার পুত্রসন্তানের একমাত্র অভিভাবকরূপে বিবেচিত হবে। যে অল্প সময়ে তাকে জানার সুযোগ হয়েছে আমার, তা থেকে জানি, সে অত্যন্ত শক্ত মনের, বিচক্ষণ নারী। তা না হলে এতো বড়ো দায়িত্ব ওর উপর ন্যস্ত করতাম না।
আপনার বিশ্বাস আর ভালোবাসার জন্যে ধন্যবাদ, মহান মিশর। বিড়বিড় করে বললো রানি লসট্রিস, এবারে সরাসরি ওকে উদ্দেশ্যে করে ফারাও বললেন, সৎ আর জ্ঞানী লোকেদের নিজের চারপাশে রাখবে সবসময়। একজন যোগ্য ম্রাটের সমস্ত গুণাবলিতে ভূষিত করে গড়ে তোলো আমার পুত্রকে। তুমি জানো, কী চেয়েছি আমি।
সাধ্যমতো চেষ্টা করবো, ম্যাজেস্টি।
শাসনভার নেয়ার মতো বয়স হয়ে গেলে আর দেরি করো না। সে আমার রক্ত, ওর মাধ্যমেই আমার বংশধারা টিকে থাকবে।
আপনার ইচ্ছেমতো সবকিছু হবে, ফারাও।
যতোদিন তুমি শাসন করবে এই দেশ, জ্ঞান আর সতোর সাথে করবে যেনো আমার লোকেদের কোনো কষ্ট না হয়। বিভিন্নভাবে, বহুজন তোমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইবে এই মিশরের কর্তৃত্ব; কেবল এই হিকসস্ নয়, আরো শক্র আছে, যারা তোমার সিংহাসনের ছত্রছায়ায় বাস করবে। কিন্তু, তাদের বিরুদ্ধে লড়ে এই দ্বৈত-মুকুট আমার পুত্রের জন্যে সুরক্ষিত রাখবে তুমি।
আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, মহান ফারাও।
বেশ কিছু সময় নিশ্চুপ রইলেন রাজা। আমি ভাবলাম, হয়তো অচেতন হয়ে পড়েছেন, কিন্তু হঠাৎই আবার মিসট্রেসের হাত আঁকড়ে ধরলেন তিনি।
শেষ একটা দায়িত্ব আমি তোমাকে দিয়ে যেতে চাই। আমার সমাধি আর মন্দির এখনো অসম্পূর্ণ। আমার রাজ্যের মতো আজ ওগুলোও হুমকির মুখোমুখি, যে ভয়াবহ পরাজয় ঘটেছে আমাদের। আমার বীর সেনাপতিরা ওদের ঠেকিয়ে রাখতে না পারলে, হিকসসেরা থিবেস দখল করে নেবে।
দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করি, তেমনটি যেনো না ঘটে, ফিসফিস করে বললো লসট্রিস।
আমি তোমাকে কড়াকড়িভাবে বলে যেতে চাই, আমার শবদেহ মমি করে, সমস্ত ধন-সম্পদসহ মৃতের পুস্তক অনুযায়ী যেনো সমাধিস্থ করা হয়।
চুপ করে বসে রইলো লসট্রিস। আমি জানি, ওই বয়সেও ও বুঝেছিলো কতো কঠিন দায়িত্ব অর্পণ করলেন ফারাও।
লসট্রিসের হাতে ফারাও-এর মুঠি শক্ত হলো, আঙুলের গাঁট সাদা হয়ে গেছে একেবারে। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো লসট্রিস। তোমার জীবন আর অমরত্বের নামে শপথ করো শপথ করো, আমার সমস্ত সভাসদের সামনে। হাপির নামে শপথ করো–শপথ করো সেই মহান তৃতীয়া ওসিরিস, আইসিস আর হোরাসের নামে
করুণ চোখে আমার দিকে চাইলো লসট্রিস। আমি জানি, একবার শপথ করলে জীবন দিয়ে হলেও তার প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে সে, ঠিক তার প্রেমিকের মতোই। এই ক্ষেত্রে ট্যানাস এবং লসট্রিস একই সুতোয় গাঁথা। আজ, রাজার কাছে করা শপথের কারণে একদিন হয়তো রাজকুমার মেমনন, ক্রীতদাস টাইটার জীবন বিপন্ন হবে। কিন্তু মৃত্যুশয্যায় একজন রাজাকে কেমন করে ফিরিয়ে দিতে পারে কেউ? নিজের অজান্তেই ওর উদ্দেশ্যে মাথা ঝোঁকালাম আমি।
