সেথ এর পাছার দুর্গন্ধের কসম, টাইটা আমাদের সবাইকে মারতে চাও তুমি! দিবাস্বপ্ন বন্ধ করো! ক্ৰাতাস চেঁচিয়ে উঠে বললো।
ঘোর ভেঙে, রথের এক পাশের দেয়ালে রাখা থলে থেকে একটা প্রান্ত বাঁকানো ধনুক আর গোটা দুই তীর নিয়ে নিলাম আমি। পরে কখনো পরীক্ষা করে দেখা যাবে । এরপর, জলার পানি ভেঙে ছুটতে লাগলাম। আবারো আক্রমণ শানালো হিকসস্ রথ বাহিনী; জলাভূমির পার ধরে আমাদের পাশাপাশি ছুটতে লাগলো ওগুলো। আঁকে ঝকে তীর ছুটে আসছে আমাদের দিকে।
রাজাকে বহনকারী যোদ্ধারা আমার থেকে অনেক এগিয়ে গেছে ততক্ষণে। আর অনুসরণ করার উপায় রইলো না রথ বাহিনীর, সামনে শুকনো পথ শেষ হয়ে গেছে। হতাশার ধ্বনি বেরুলো তাদের মুখ থেকে। একের পর এক তীর ছুটে যাচ্ছে আমার চারপাশ দিয়ে, এরই মধ্যে প্রাণ হাতে করে ছুটলাম। একটা তীর আমার কাঁধে আঘাত করলো, কিন্তু শরীরে না ঢুকে পিছলে গেলো ওটা। পরে দেখেছিলাম, সামান্য একটু নীলাফোলা ছাড়া আর তেমন কিছু হয়নি আমার।
যদিও অনেক পিছনে ছিলাম যোদ্ধাদের থেকে, নীল নদের তীরে পৌঁছুতে পৌঁছতে ধরে ফেললাম ওদের। যুদ্ধ-ফেরত মিশরীয় সৈন্যে ভরে গেছে দুই তীর। বেশিরভাগের কাছেই কোনো অস্ত্র নেই; অল্প কয়েকজন ছাড়া সবাই আহত। সবার একই উদ্দেশ্য যতো দ্রুত সম্ভব জাহাজে চড়ে থিবেস প্রত্যাবর্তন।
আমাকে খুঁজে পেতে ডাকলো ট্যানাস। ফারাও-এর দায়িত্ব তোমার হাতে দিলাম, টাইটা। রাজকীয় জলযানে নিয়ে জীবন বাঁচানোর জন্যে যা করার, করো।
তুমি ফিরছো কখন? জানতে চাইলাম।
এখানে, আমার যোদ্ধাদের সাথে থাকবো আমি। এদের সবাইকে বাঁচাতে হবে, এক এক করে জাহাজে তুলে দেবো এখন। দ্রুত আমার দিকে পিছন ফিরে চেঁচিয়ে সেনাপতিদের ডেকে নির্দেশ দিতে লাগলো ট্যানাস।
রাজার কাছে ফিরে গিয়ে ঝুঁকে দেখলাম আমি। এখনো বেঁচে আছেন তিনি। পরীক্ষা করে বুঝলাম, অর্ধ-সচেতন অবস্থায় আছেন। সরীসৃপের মতো শীতল হয়ে গেছে ত্বক, হালকা শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে। ক্ষত থেকে উঠে আসা তীরের মধ্যে সামান্য একটু রক্ত লেপ্টে আছে। কিন্তু বুকে কান পেতে শুনতেই টের পেলাম, প্রতিবার শ্বাসের সাথে সাথে গুড়গুড় আওয়াজ করে ফুসফুঁসে ঢুকছে রক্ত। সরু ধারায় মুখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। যা কিছু করার, খুব দ্রুত করতে হবে আমাকে। চিৎকার করে একটা নৌকা ডাকলাম।
ফারাওকে বহনকারী সৈন্যরা একটা তলা-সমান নৌকায় উঠিয়ে দিলো তাঁকে। আমি চড়ে বসতেই রওনা হলো ওটা, দূরে, নীল নদের মূল স্রোতপ্রবাহে নোঙর-ফেলা রাজকীয় জলযানের উদ্দেশ্যে দ্রুত দাঁড় বাইতে লাগলো দুজন।
*
আমাদের দেখে জাহাজের পাশে ভীড় করে এলো সভাষদবর্গ। রাজবধূ, পুরোহিত, রাজকুমারীসহ সাধারণ লোক এরা যুদ্ধে যাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই। কাছাকাছি এসে পড়তে ভীড়ের মাঝে আমার কর্ত্রীকে চিনতে পারলাম। কোলে শিশু সন্তান, ওর মুখ ভয়ে-দুশ্চিন্তায় পাণ্ডুর।
জাহাজের লোকজন যখন বুঝতে পারলো, আমার সাথে নৌকায় শায়িত আছেন ফারাও, মুখ থেকে ছলকে রক্ত পড়ছে তার আহাজারি আর কান্নায় ভারী হয়ে গেলো বাতাস। মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলো মেয়েরা, আর পুরুষেরা ভেজা চোখে তাকিয়ে থাকলো।
জাহাজের পাশ দিয়ে রাজাকে উঠানোর সময় সবচেয়ে কাছাকাছি ছিলো মিসট্রেস। রানি হিসেবে ফারাও-এর সমস্ত পরিচর্যার দায়িত্ব তার উপরই বর্তায়। অন্যরা সরে গিয়ে পথ করে দেয় তাকে। ঝুঁকে, ফারাও-এর মুখমণ্ডল থেকে রক্ত আর কাদামাটি মুছে দিলো লসট্রিস। ওকে চিনতে পারলেন রাজা; বিড়বিড় করে পুত্রের নাম ধরে ডাকলেন। শিশুপুত্রকে এগিয়ে দিতে হাত বাড়িয়ে ওকে ধরতে চাইলেন ফারাও, সরু এক চিলতে হাসি ফুঁসে উঠলো তার ঠোঁটে; কিন্তু শক্তি নেই শরীরে। এক পাশে ঝুলে পড়লো তাঁর হাত ।
দ্রুত ফারাওকে তাঁর প্রকোষ্ঠে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলাম আমি জাহাজের নাবিকদের। আমার কাছে এসে নরম অথচ উদ্বিগ্ন স্বরে লসট্রিস জানতে চাইলো, ট্যানাস কোথায়? ও ঠিক আছে? টাইটা, সত্যি কথা বলো!
ট্যানাস নিরাপদ। ওর কিছুই হয়নি। ইন্দ্রজালের কথা তো জানো তুমি। এ সমস্তই লেখা ছিলো। এখন আমার সঙ্গে এসো, রাজার পরিচর্যায় তোমার সাহায্য প্রয়োজন। মেমননকে পরিচারিকাদের কাছে ছেড়ে দাও কিছু সময়ের জন্যে।
ফারাও-এর মতোই আমিও কাদামাটিতে মাখামাখি হয়ে আছি। রানি লসট্রিস এবং আরো দুজন রাজবধুকে বললাম, ফারাওকে গোসল করিয়ে পরিষ্কার পোশাক পরিয়ে দেওয়ার জন্যে। ইত্যবসরে, নদী থেকে তোলা বালতিভর্তি জল দিয়ে নিজে গোসল সেরে নিলাম। অভিজ্ঞতা থেকে জানি, অপরিচ্ছন্নতা রোগীর জন্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর।
শরীরে পানি ঢালতে ঢালতেই পুব কোণে, যেখানে জলাশয়ের নিরাপত্তায় টিকে আছে আমাদের বেঁচে যাওয়া যোদ্ধারা সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম। লজ্জা আর ভয়ে আমার হৃদয় পরিপূর্ণ এই ছন্নছাড়া, তাড়া-খাওয়া লোকগুলো নাকি মিশরের শক্তিশালী সেনাবাহিনী। এরপর, ট্যানাসকে দেখতে পেলাম, আহতদের পরিদর্শন করছে। যখনই ওকে দেখতে পেলো সেনারা; কাদা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো তারা। এমনকি, তার নামে জয়ধ্বনি পর্যন্ত করছিলো কেউ কেউ।
এখন যদি কোনো মতে এখানে প্রবেশ করতে পারে শত্রুরা, হত্যাযজ্ঞের ষোলোকলা পূর্ণ হবে। আমাদের শক্তিশালী সেনাবাহিনীর একজন সদস্যও বেঁচে থাকবে না সেক্ষেত্রে, একা ট্যানাস আর কী করবে? কিন্তু ভালো করে তাকিয়েও শত্রু শিবিরের কোনো চিহ্নও দেখতে পেলাম না জলার ধারে।
