সবাই জাহাজের কাছে ফিরে চলো! দ্রুত!
আমাদের পাথুরে আশ্রয় থেকে বেরিয়ে আসতেই হিকসস্ রথ তেড়ে এলো।
সৈন্যদের নয়, জন্তুগুলোকে মারো! সঠিক উপায় বাতলেছে ট্যানাস! প্রথম রথ, আমাদের কাছাকাছি চলে আসতেই লানাটা কাঁধে তুলে নেয় সে। তার সঙ্গীরা সবাই একসাথে নিজেদের ধনুক তুলে নেয়।
জমিন বন্ধুর হওয়ার কারণে আমাদের ছোঁড়া বেশিরভাগ তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। কিছু কিছু গিয়ে মাথা ঠুকলো রথের কাঠামোতে; আবার কিছু তীর ঘোড়াগুলোর বুকের চারপাশের বর্মে লেগে ছিটকে গেলো।
কেবল একটি ধনুক জায়গামতো আঘাত হানলো। লানাটা থেকে উড়ে যাওয়া তীরটা বাম ধারের ঘোড়ার কপালে সেঁধিয়ে গেলো পুরোপুরি। ঢালু জমিনে আছাড় খাবার মতো করে পড়লো ওটা; দড়ি-দড়া সমেত টেনে নিয়ে চললো রথের কাঠামো, সঙ্গের ঘোড়াটাও ধরাশায়ী হলো নিমিষেই। যন্ত্রণায় পা ছুঁড়তে লাগলো, ধুলোর ঝড় উঠলো চারপাশে। উল্টে পড়া রথ থেকে শূন্যে নিক্ষিপ্ত হলো আরোহীরা। অপর রথগুলো প্রাণপণ চেষ্টায় ধ্বংসাবশেষ এড়িয়ে ডানে বাঁয়ে ছুটলো। উল্লাসমুখর চিৎকার ধ্বনিত হলো নীল বাহিনীর মধ্য থেকে; ভয়ঙ্কর সেই দিনে এ-ই ছিলো আমাদের প্রথম সাফল্য। কর্কশ কণ্ঠে রণ-সংগীত গেয়ে উঠলো তারা, ট্যানাসের নেতৃত্বে। নদীর উদ্দেশ্যে ছুটে চললাম আমরা। প্রথমবারের মতো আক্রমণ শানাতে ইতঃস্তত করলো হিকসস্ দের রথবাহিনী। সহযোগী রথের দুর্গতি দেখেছে তারা। তিনটি রথ এবারে আমাদের কাছিমের খোলের আকৃতির সামনের দিকে ধেয়ে আসে।
জম্ভগুলোর মাথায় আঘাত করো! চেঁচিয়ে উঠলো ট্যানাস, তার ছোঁড়া তীরে আবারো লুটিয়ে পড়লো একটা ঘোড়া। পাথুরে জমিনে উল্টে পরে টুকরো টুকরো হলো রথ। তার সঙ্গী দুটো সাথে সাথে দূরে সটকে পড়তে লাগলো। ধ্বংসপ্রাপ্ত রথটাকে যাত্রাপথে পেয়ে হিংস্র মিশরীয় যোদ্ধারা শত্রু সৈন্য আর ছটফট করতে থাকা প্রাণীগুলোকে মেরে ফেলতে চড়াও হলো।
দুটো রথের দুরবস্থা দেখে আমাদের ছোট্ট দলটাকে আক্রমণে ক্ষান্ত দিলো হিকসস্ বাহিনী, কাদাটে মাঠ আর জলমগ্ন সেচের জমিনের উদ্দেশ্যে দ্রুত এগোতে লাগলাম আমরা । শুধুমাত্র আমি বুঝতে পারলাম, জলায় আমাদের ছুঁতে পারবে না শত্রুর চাকা।
রাজাকে বহনকারী বর্মের পাশাপাশি ছুটলেও যোদ্ধাদের শরীরের ফাঁক-ফোকড় দিয়ে যুদ্ধের ময়দানের বিভিন্ন দৃশ্য আমার চোখে পড়ছিলো ।
এমন নৃশংসতা আমি কখনো দেখিনি। প্রাচীনকালের কোনো যুদ্ধের এমন ভয়াবহ বর্ণনা পড়িও নি। আহত বা সুস্থ-আমাদের লোকেদের ধরে ধরে জবাই করছিলো হিকসস্ বর্বরেরা। আবনুবের সমভূমি যেনো রক্তাক্ত প্রান্তর। জায়গায় জায়গায় জট পাকিয়ে পরে আছে মিশরীয় যোদ্ধাদের মৃতদেহ।
এক হাজার বছর ধরে আমাদের সেনাবাহিনী ছিলো অপরাজেয়, আমাদের তরবারি শাসন করেছে পুরো পৃথিবী। এইখানে, আবনুবের সমভূমিতে আজ একটি যুগ শেষ হয়েছে। এমন দুরবস্থার মধ্যেও গেয়ে চললো নীল বাহিনীর যোদ্ধারা; লজ্জায়, শোকে, অপমানে সবার চোখে পানি–তবুও গাইছে তারা।
আর একটু সামনেই প্রথম জলমগ্ন মাঠ। তিনজন সৈন্য সমেত আরো একটি রথ। হঠাৎ কোণাকুনিভাবে ধেয়ে এলো আমাদের ছোট্ট দলটার দিকে। বৃষ্টির মতো তীর ছুটে গেলো সেদিকে, কিন্তু হেষারবে মুখরিত ঘোড়াগুলোকে চাবুক কষিয়ে এগিয়ে আসতে লাগলো শত্রু রথ। ট্যানাসকে দুই বার তীর ছুঁড়তে দেখলাম আমি। প্রতিবারই খানাখন্দে পড়ে নড়ে যাওয়ায় টলে গেলো ওর নিশানা। পরস্পর জোড়া লেগে থাকা বর্মের উপর হামলে পড়লো হিকসস্ রথ।
ঘূর্ণায়মান চাকার কেন্দ্রে বসানো ধারালো ফলার আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো ফারাওকে বহনকারী দুজন সৈন্য। উল্টে মাটিতে পড়ে গেলেন আহত ফারাও। হিকসস্ ফলার হাত থেকে বাঁচাতে নিজের শরীর দিয়ে তাঁকে আড়াল করে নিঃসারে পড়ে রইলাম আমি। অবশ্য, যেমন এসেছিলো, ঝড়ো গতিতে আমাদের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে গেলো রথ। কোনোক্রমেই আটকে পড়তে চায় না তারা। তলোয়ারধারী যোদ্ধারা কিছু করার আগেই খোলা ময়দানে চলে গেলো হিকসস্ রথ।
নিচু হয়ে আমাকে টেনে তুললো ট্যানাস। এখনই যদি মরে যাও, আমাদের বীরত্বগাথা কে লিখবে হে? চিৎকার করে যোদ্ধাদের একত্র করে আবারো ফারাওকে বহন করে নিকটতম জলার উদ্দেশ্যে রওনা হলো সে।
দ্রুতগতিতে ধেয়ে আসা রথের চাকার শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমি, কিন্তু একবার পিছু ফিরে তাকালাম না। এমনিতে আমি বেশ ভালো দৌড়বিদ, এখন যখন জান হাতে করে ছুটছি, ফারাওকে বহনকারী যোদ্ধাদের গতি আমার কাছে কিছুই নয়। এক লাফে জলমগ্ন জায়গাটা পেরুতে চাইলাম, কিন্তু যথেষ্ট বড়ো ওটা; শেষমেষ এক হাঁটু কাদায় মুখ থুবরে পড়লাম। আমাকে অনুসরণ করা রথটা বাড়ি খেলো জলাভূমির পাড়ে, সাথে সাথে ফেটে গেলো একটা চাকা। রথকাঠামো উল্টে পড়লো জলের মধ্যে, আর একটু হলে পিষে ফেলেছিলো আমাকে। যাই হোক, নিজেকে সামলে নিয়ে আবারো ছুটলাম।
অসহায় অবস্থায় কাদাটে জলায় পড়ে থাকা শত্রুসৈন্য আর ঘোড়াগুলোকে তলোয়ারের কোপে কচুকাটা করে ফেললো আমাদের যোদ্ধারা। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে ভালো করে দেখলাম রথটা।
উল্টো পরে থাকা রথের একটা চাকা তখনো ঘুরছিলো। এক হাতে ধরলাম ওটাকে, আমার আঙুলে বাড়ি খেতে দিলাম । তিনবার শ্বাস নিতে যতোটুকু সময় লাগে, কেবল ততক্ষণ দেখলাম; কিন্তু ওইটুকুই যথেষ্ট ছিলো। যে কোনো হিকসসের মতো এখন চাকা বানাতে পারবো আমি, মনে মনে তখনি নকশা করা শুরু করে দিলাম।
