ছোটো পাহাড়ের নিচে ট্যানাসের দলের অভ্যন্তরে আশ্রয়ের জন্যে ছুটলো এবারে বেশ কজন সৈনিক। বিশৃঙ্খল, ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় জট পাকিয়ে ফেললো ট্যানাসের যোদ্ধাদের সাথে। তখনো লড়াই করার মতো কিছু সৈনিক ছিলো ট্যানাসের কাছে, কিন্তু সক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়লো ভীতি; এলোমেলো ছুটে পালাতে চাইলো ওর লোকেরা। হিকসস্ রথ হিংস্র নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো তাদের উপর।
এমন বিশৃঙ্খলা, রক্তাক্ত হত্যাযজ্ঞ আর শোচনীয় পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসেও নীল বাহিনী তখনো অবিচল। পরাজিত লোকেদের ভীড়ে তারা যেনো এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। শত্রু রথ পর্যন্ত তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পারেনি। বিজ্ঞ সমরনায়কের মতো তাদের নিয়ে পিছিয়ে গিয়েছিলো ট্যানাস, পাথুরে-উঁচু-নিচু একটা স্থানে উঠে গেছে যেখানে হিকসস্ রথ পৌঁছুতে পারবে না। ফারাও-এর সিংহাসনের চারিদিকে অপ্রতিরোধ্য দেয়াল তৈরি করে রেখেছে নীল কুমির বাহিনী।
রাজার পাশে থাকায় পুরোটা সময়ই এই বীরদের কেন্দ্রে ছিলাম আমি। ছত্রভঙ্গ ডান পাশ থেকে মরিয়া লড়ে আমাদের সাথে যোগ দিতে সমর্থ হলো ক্ৰাতাস। ওর মাথার আচ্ছাদনের পাখির পালক হিকসস্ তীরন্দাজদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই বৃষ্টি মতো তীর ছুটে আসতে লাগলো আমাদের উদ্দেশ্যে। শেষমেষ, অক্ষত অবস্থাতেই আমাদের রক্ষণবুহ্যে প্রবেশ করতে পারলো সে। আমার দিকে চোখ পড়তেই কর্কশ হাসলো ক্ৰাতাস। সেথ্ এর কসম, টাইটা, ছোট্ট রাজকুমারের জন্যে প্রাসাদ তৈরির চেয়ে ঢের মজা এখানে! নিজের পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকার জন্যে যেখানে লড়তে হচ্ছে আমাকে, উত্তর দেওয়ার ফুরসত কোথায়?
ট্যানাস এবং ক্ৰাতাস সিংহাসনের কাছে ঘেষে আসে। গর্দভের মতো তখনো হাসছিলো ক্ৰাতাস। ফারাও-এর সমস্ত সম্পদ দিলেও এটা ফেলে রেখে যাবো না আমি! ওই হিকসস্ স্লেজ আমার চাইই চাই
অভিবাদনের ভঙ্গিতে তার শিরস্ত্রাণ তলোয়ারে চ্যাপ্টা মাথা দিয়ে ঠুকে দেয় ট্যানাস। হালকা স্বরে বললেও ওর অভিব্যক্তি ছিলো সর্বহারার। সম্রাটের উপস্থিতিতে এইমাত্র যুদ্ধ এবং সাম্রাজ্য হারিয়েছে সে।
এখানে আর কিছুই করার নেই, ক্ৰাতাসকে বললো ও। দেখা যাক, যেমন ছুটতে পারে, তেমন করে তারাতে পারে কি না এরা। নদীর উদ্দেশ্যে ফিরে চলো সবাই! কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সিংহাসনের কাছে ছুটে গেলো ওরা দু জন।
ওদের মাথার উপর দিয়ে আমাদের ছোট্ট রক্ষণবুহ্যের বাইরে তাকিয়ে দেখলাম, নদীর উদ্দেশ্যে ছুটছে যোদ্ধারা এখনো হিকসস্ রথ তাড়া করে ফিরছে তাদের।
দলছুট হয়ে হিকসস্ রাজার সোনালি রথ হঠাৎ করেই আমাদের দিকে রওনা হলো। পাথরের দেয়ালের সামনে এসে থেমে দাঁড়ালো ওটা। সহজেই পাদানীর উপর দাঁড়িয়ে প্রান্ত-বাঁকানো ধনুক হাতে তুলে নেয় হিকসস্ রাজা। মনে হলো, যেনো আমার দিকে তীর তাক করছে। মাথা নিচু করে ফেলতে গিয়ে বুঝলাম, ওটার নিশানা আসলে আমি নই। বাতাসের তীক্ষ্ণ শব্দে মাথার উপর দিয়ে উড়ে গেলো সেই তীর; ঘাড় ঘুরিয়ে ওটার গতিপথ দেখতে লাগলাম আমি। ফারাও-এর বুকের উপরিভাগে আঘাত করলো তীরটা; অর্ধেক সেঁধিয়ে গেলো মাংস ফুড়ে।
কর্কশ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠে টলোমলো অবস্থায় সিংহাসনে টিকে থাকলেন ফারাও। কোনো রক্ত বেরুচ্ছে না ক্ষতটা থেকে, মুখ বন্ধ পুরোপুরি। একপাশে কাত হয়ে সামনে ঝুঁকে পড়লেন ফারাও, পড়ে যাওয়ার আগে ছুটে গিয়ে দুই হাতে জড়িয়ে ধরলাম আমি তাকে। বিশাল ওজনের ধাক্কায় হাঁটুর উপর পরে গেলাম, সোনালি রথের প্রস্থান দেখতে না পেলেও হিকসস্ সম্রাটের ব্যঙ্গপূর্ণ হাসি কানে বাজলো।
ফারাওকে সোজা করে ধরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছি, ট্যানাস ঝুঁকে এলো তার উপর । কতোটা মারাত্মক আঘাত? জানতে চাইলো সে।
উনি শেষ হয়ে গেছেন, নিজের অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো শব্দ ক টা। যে কোণে ঢুকেছে তীর, আর যে অবস্থানে ঢুকেছে ওটা এর একটা ফলাফলই হতে পারে। কিন্তু মহান ফারাও মৃত্যুশয্যায় আছেন, এ খবর পেলে আমাদের যোদ্ধাদের হৃদয় ভেঙে যাবে ভেবে চুপ করে রইলাম। শেষমেষ জানালাম, বেশ খারাপ আঘাত। তবে রাজকীয় জলযানে নিয়ে যেতে পারলে হয়তো এখনো কিছু করা যাবে।
কেউ একটা বর্ম দাও আমাকে! হুঙ্কার দিয়ে উঠে ট্যানাস। এরপর ওটার উপর শুইয়ে দিলো ফারাওকে। এখনো পর্যন্ত রক্ত বেরোয়নি তার দেহের ক্ষত থেকে, কিন্তু আমি জানি, সুরার পাত্রের মতো তার বুকের ভেতরটা ভরে যাচ্ছে রক্তে। তীরের মাথাটা খুঁজে বের করতে চাইলাম, কিন্তু পিঠ ফুঁড়ে বেরোয়নি ওটা। বুকের খাঁচার গভীরে কোথাও আটকে গেছে। বের হয়ে থাকা প্রান্তটা ভেঙে ফেলে দিয়ে, লিনেনের চাদর দিয়ে ঢেকে দিলাম তার শরীর।
টাইটা, ক্ষীণ স্বরে বলে উঠলেন ফারাও। আর কি আমার সন্তানকে দেখতে পাবো না?
নিশ্চই, মহান মিশর। শপথ করে বলছি।
আর, আমার বংশধারা টিকে থাকবে?
ঠিক তাই। আমন রার ভবিষ্যতের ছবি তা-ই তো বলে।
দশজন শক্ত লোক সামনে এগোও! গর্জে উঠে ট্যানাস। ওর চারপাশে ঘিরে আসে যোদ্ধারা। বর্মের উপর শায়িত রাজাকে উঁচু করে ধরে তারা।
কাছিমের আকৃতি নাও! আমার সাথে এসো, বীর সেনারা! একে অপরের বর্ম জোড়া লাগিয়ে একটা দেয়ালের মতো তৈরি করলো যোদ্ধারা, ফারাওকে ঘিরে।
