এরপর, নিজের পাশ থেকে অদ্ভুত ধনুকটা তুলে নিলো হিকসস্ রাজা। ঝটকা মেরে একটা তীর টানলো ধনুকে, টেনেই ছেড়ে দিলো। ট্যানাসের লানাটা থেকে ছোঁড়া তীরের চেয়েও উঁচুতে উঠলো সেটা। ট্যানাসের মাথা ছাড়িয়ে সোজা আমার উদ্দেশ্যে ধেয়ে এলো। নড়তেও যেনো ভুলে গেছি, আমার মাথাটা মাত্র এক হাত দূরত্বের জন্যে রক্ষা পেলো। ফারাও-এর সিংহাসনের পাদদেশে গিয়ে বিধলো তীরটা। অপমানজনক ভঙ্গিতে সিডার কাঠের ভেতর গাঁথা অবস্থায় কাঁপলো ওটা, আবারো তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো হিকসস্ রাজা; সমতলের উপর দিয়ে সোজা নিজের বাহিনীর দিকে ঘুরিয়ে নিলো রথ।
জানি, শেষ হয়ে গেছি আমরা। এমন দ্রুতগামী রথ আর আমাদের সেরা তীরন্দাজকে অনায়াসে পরাজীত করা প্রান্ত-বাঁকানো ধনুকের বিরুদ্ধে কী করে লড়বো আমরা? রথ বাহিনী যখন একত্র হয়ে চূড়ান্ত আক্রমণের জন্যে আমাদের দিকে ধেয়ে আসতে লাগলো, হতাশার ধ্বনি উঠলো মিশরীয় শিবিরে। এখন বুঝলাম, কেমন করে তলোয়ার বের করার আগেই নিহত হয়েছেন উত্তরের ফারাও।
ছোটার মধ্যেই এক সারিতে চারটি করে রথ সাজিয়ে ফেললো হিকসস্ বাহিনী। ভীষণ গতিতে ধেয়ে আসছে তারা। সম্বিৎ ফিরে পেতে ঢাল বেয়ে দৌড়াতে শুরু করলাম আমি। হাঁপাতে হাঁপাতে ট্যানাসের পাশে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, ওই পতাকাগুলো দিয়ে আমাদের রক্ষণবুহ্যের দুর্বল অংশগুলো চিহ্নিত করেছে সে! ওই অবস্থান দিয়েই মূল আক্রমণ শানাবে এরা!
কেমন করে যেনো আমাদের যুদ্ধ-ক্রম আর রক্ষণবুহ্যে দুর্বলতা জেনে গেছে হিসসসেরা। ঠিক আমাদের বিভাজন রেখায় পতাকা ফেলে গেছে তাদের রাজা। আমাদের মধ্যেই একজন বিশ্বাসঘাতকের কথা তখনো মাথায় এসেছিলো, কিন্তু উত্তেজনায় ভুলে গেছিলাম।
সাথে সাথেই চিৎকার করে পতাকাগুলো তুলে আনার নির্দেশ দেয় ট্যানাস। কিন্তু সময় নেই আর। আমাদের যোদ্ধারা ওগুলো তুলে ফেলার আগেই বর্শা সমেত হিকসস্ রথ চড়ে বসলো তাদের উপর। দূরের রথগুলো থেকে ছোঁড়া তীরের আঘাতে ধরাশায়ী হলো বহু যোদ্ধা শত্রু-তীরন্দাজদের নিশানা অপূর্ব।
প্রথম চোটে বেঁচে যাওয়া সৈন্যারা প্রাণপণে ছুটে আসতে লাগলো আমাদের রক্ষণবুহ্যের দিকে। অনায়াস দক্ষতায় তাদের পিষে ফেললো শত্রু রথ। ঠিক যেনো জাদুমন্ত্রের মতো চালকের সামান্য টানে বাধ্যগতের মতো এদিক-ওদিক ঘুরলো ঘোড়াগুলো। সরাসরি শিকারের উপের না চড়ে পাশ ঘেঁষে বেরিয়ে গেলো প্রতিটি রথ। তখনই ছুরিগুলো দেখতে পেলাম আমি। দৈত্যাকার কোনো কুমিরের মতো চাকার কেন্দ্রস্থল থেকে চোখা প্রান্ত বেরিয়ে এসেছে।
ঘুরন্ত ছোরার ফলায় আঘাত পেতে দেখলাম আমাদের এক যোদ্ধাকে, যেনো রক্তের মেঘ সৃষ্টি হলো তার চারপাশে। একটা ছেঁড়া হাত ছুটে গেলো আকাশ পানে, শরীরের টুকরো টুকরো খণ্ডগুলোকে পিষে ফেললো রথের চাকা। মিশরীয় যোদ্ধাদের সামনের সারির উদ্দেশ্যে ছুটে চললো শত্রু রথ। শুনলাম, ক্ৰাতাস চিৎকার করে তার সৈন্যদের উৎসাহ দিচ্ছে। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে ততক্ষণে।
বর্ম সমেত বর্শাধারীদের তৈরি প্রথম রক্ষণ দেয়ালে ঝাঁপিয়ে পড়লো হিকসস্ রথ। এতো সহজে সেই দেয়াল ভেদ করে ঢুকে পড়লো, যেনো কুয়াশার পাতলা চাদর। এক নিমিষেই আমাদের এতোদিনের অপরাজেয় রক্ষণবুহ্য ভেঙে তছনছ হয়ে গেলো। একবার মিশরীয় বাহিনীর ভেতরে ঢুকে যেতে পেছনের তুলনামূলক অরক্ষিত সৈন্যদের উপর বৃষ্টির মতো তীরের ঝাক বর্ষণ করে এগিয়ে গেলো হিকসস্ বাহিনী।
পেছনের এই বর্বর আক্রমণ সামাল দিতে যখন প্রতিআক্রমণ শুরু করলো। আমাদের যোদ্ধাদের বিচ্ছিন্ন একটা দল, খোলা সমভূমি থেকে আরো একদল হিকসস্ রথ ঝাঁপিয়ে পড়লো তাদের উপর। প্রথম চোটেই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলো আমাদের সেনাবাহিনী। ট্যানাস আর ক্রাতাস এখন পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে। এরপর, আরো দ্রুতগামী রথবাহিনী ইতিমধ্যেই ছত্রভঙ্গ হওয়া যোদ্ধাদের ছোটো ছোটো দলে ভাগ করে কচুকাটা করতে লাগলো। এখন আর মিশরীয় সেনাবাহিনীর কোনো সংগঠিত দল নেই রণাঙ্গনে। জীবন বাঁচানোর তাগিদে বোকার মতো লড়ছে কেউ কেউ।
ধুলোর মেঘ তুলে স্রোতের মতো আসতে লাগলো হিকসস্ বাহিনী। দুই চাকার রথের পেছনে রয়েছে চার চাকার বিশাল রথ-দশজন করে সৈনিক বহন করছে ওগুলো। কাঠামোর দুই ধারে নরম পশমের দেয়াল, মিশরীয় যোদ্ধাদের মরিয়া আঘাত বা তলোয়ারের কোপ অনায়াসে আটকে গেলো সেখানে। রথের উপর বসে বর্শার আঘাতের পর আঘাতে আমাদের সৈন্যদের রক্তাক্ত করে ফেললো হিকসস্ যোদ্ধারা। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করলো তারা। ভয়ঙ্কর প্রান্ত বাঁকানো ধনুক থেকে ছোঁড়া তীরের নির্ভুল লক্ষ্যভেদে একে একে লুটিয়ে পড়তে লাগলো মিশরীয় সেনাপতিরা।
এখন আর যুদ্ধ নয়, এক তরফা নরহত্যার উৎসবে পরিণত হয়েছে এই লড়াই। আমার ডান ধারে থাকা কাতাসের অবশিষ্ট যোদ্ধাদের তীর ফুরিয়ে গেছে। মাথার আচ্ছাদনে পাখির পালকের কারণে সমস্ত সেনাপতিদের আলাদা করে চিহ্নিত করে এক এক করে তাদের মারতে লাগলো হিকসস্রা। অস্ত্র এবং নেতৃত্ব হারিয়ে শেষ প্রতিরোধ পর্যন্ত গড়তে পারলো না মিশরীয় যোদ্ধারা। দৌড়ে পালাতে চাইলো তারা। অস্ত্র ফেলে রেখে কাছের নদীর উদ্দেশ্যে ছুটলো, কিন্তু হিকসস্ রথ অত্যন্ত দ্রুতগামী এক নিমিষে ধরে ফেললো তাদের।
