এখনো, এতো বছর পরেও, প্রথমবারের মতো ঘোড়া দেখার উত্তেজনা মনে আছে আমার। এতো সুন্দর প্রাণীর তুলনায় শিকারী চিতা কিছুই নয় । ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলো ক্যাম্পের প্রতিটি যোদ্ধা। শুনলাম, আমার কাছের একজন সেনাপতি চেঁচিয়ে বোলছে, নির্ঘাত এই দৈত্যগুলো খুনে, মানুষের মাংস খায়! এ কী ভয়ঙ্কর পরীক্ষায় পড়েছি আমরা?
আতঙ্কে সিটিয়ে গেছে বাহিনীর যোদ্ধারা। মুহূর্তের মধ্যে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে জন্তুগুলো, ঠিক মাংসাশী সিংহের মতো! কিন্তু নেতৃত্বে থাকা বাহনটি বাঁক ঘুরে আমাদের সামনের সারির সমান্তরালে দাঁড়ালো। পাক খেতে থাকা চাকতির উপর চলছে ওটা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম আমি। প্রথম কয়েক মুহূর্ত এতোটাই বিস্ময়ে ছিলাম, কী দেখছি বিশ্বাস করতে মন চাইলো না। টেনে চলা ঘোড়াগুলোর মতোই জীবনে প্রথমবারের মতো রথ দেখে একেবারে নাড়া খেয়ে গিয়েছিলাম। ঘোড়াদুটোর মাঝখানে লম্বা একটা তক্তা, যা সংযুক্ত আছে একটা কাঠামোর সাথে পরে জেনেছিলাম, তার নাম এক্সেল। উঁচু কাঠামোটা স্বর্ণের পাতায় মোড়া; দুই পাশের দেয়াল নিচু করে তৈরি করা হয়েছে যেনো তীরন্দাজরা সেদিক দিয়ে তীর চালাতে পারে অনায়াসে।
এ সবই এক লহমায় দেখে নিলাম, এরপর আমার সমস্ত মনোযোগ গিয়ে পড়লো সেই ঘুরন্ত চাকতিতে যার উপর ভর করেই এতো দ্রুত আর মসৃণ গতিতে ছুটছে হিকসস্ রথ। হাজার বছর ধরে এই পৃথিবীর সবচেয়ে শিক্ষিত আর সভ্য মানুষ আমরা, মিশরীয়রা; কি বিজ্ঞান কি ধর্ম সব বিষয়েই বাদবাকি সমস্ত জাতি আমাদের নিচে রয়েছে। কিন্তু এতো প্রজ্ঞা আর দীক্ষা থাকা সত্ত্বেও এমন কোনো বস্তু তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি আমরা। ষাঁড়ের শক্তিতে সমতল জমিনের উপর হেঁচড়ে চলে আমাদের স্লেজ; ভীষণ ভারী প্রস্তরখণ্ড স্থানান্তরের জন্যে কাঠের বড়ো বড়ো গুঁড়ি ব্যবহার করি আমরা কিন্তু এ ধরনের অভিনব চাকতির কথা কেউ কখনো শোনেনি।
জীবনে প্রথমবারের মতো চাকা দেখেছিলাম সেদিন; এর সাধারণত্ব আর সৌন্দর্য্য যেনো আমার মাথার ভেতর বিস্ফোরণ ঘটালো। সাথে সাথেই নিজেকে তিরস্কার করলাম, কেননা এ জিনিসের পরিকল্পনা আমার মাথায় আসেনি। এ বস্তু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রতিভাবান কোনো এক জাতির, বুঝলাম, আজ এখানে ধ্বংস হয়ে যাবো আমরা ঠিক যেমন নিম্ন-রাজ্যের লাল-ফারাও-এর বাহিনী উড়ে গেছে এদের সামনে।
সোনালি সেই রথটা দ্রুত গতিতে চলে গেলো আমাদের সামনে দিয়ে, তীর-ছেঁড়া দূরত্বের সামান্য বাইরে থেকে। বাহনটা ঘুরে পিছন ফিরতেই চমৎকার ঘুরন্ত চাকতি আর রথ টেনে চলা সেই ভয়ঙ্কর জীবের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পাটাতনে বসা লোক দু জনের দিকে তাকালাম। একজন নিঃসন্দেহে রথ-চালক। প্রাণী দুটোর মাথার সাথে আটকে রাখা চামড়ার লম্বা ফিতে টেনে ধরে ওগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করছে সে। লম্বা অবয়বের যে লোকটি তার পাশে বসে আছে, সে হলো হিকসস্ রাজা। রাজকীয় পোশাক দেখে ভুল করার কোনো উপায় নেই।
সাথে সাথেই বুঝলাম, সে একজন এশীয় লোকচকচকে ধাতুর মতো তামাটে ত্বক, বাঁকা নাক। মুখে ঘন কালো দাড়ি, কোঁকড়া, রঙিন ফিতায় সজ্জিত। বুকের বর্মে তামার তৈরি মাছের আঁশের মতো নকশা, মাথার মুকুট লম্বা আর চৌকোনা। মূল্যবান পাথর আর স্বর্ণের উপর বিভিন্ন বিচিত্র দেব-দেবীর মূর্তি খোদাই করা। রথের দুই পাশের দেয়ালে ঝোলানো আছে তার অস্ত্র একেবারে হাতের নাগালে। চামড়ার খাপে রাখা তলোয়ারের ফলা বেশ চওড়া, হাতলটা স্বর্ণ আর হাতির দাঁতে তৈরি। এছাড়াও, গোড়ায় পাখির পালক সমৃদ্ধ তীরে ভর্তি দুটি থলেও রয়েছে। পরে জেনেছিলাম, জমকালো রঙ দারুন ভালোবাসতো হিকসস্ রা। রাজার পেছনে রাখা ধনুকটি বেশ অদ্ভুত-অমন ধনুক আমি কখনো দেখিনি এর আগে। মিশরীয় ধনুকের মতো সাধারণ কিছু নয় সেটা; হিকসস্ ধনুকের প্রান্ত দুটো বিপরীত দিকে বাঁকানো।
আমাদের যোদ্ধাদের সামনে দিয়ে যেনো উড়ে গেলো হিকসস্ রাজাকে বহন করা রথটা, একটু নিচু হয়ে মাটিতে কিছু একটা ছুঁড়ে দিলো রাজা স্বয়ং। লাল-রঙা পতাকার মতো কিছু। সাথে সাথেই প্রশ্নবাণে আমাকে জর্জরিত করে ফেললো যোদ্ধারা। কী করছে সে? কী ওটা? কোনো ধর্মীয় প্রতীক, নাকি হুমকি?
কেঁপে উঠে পতাকাটা হাতে নিলাম আমি, উত্তেজনায় অবশ আঙুলে কোনো অনুভূতি নেই। ঠিক তীরের নাগালের বাইরে দিয়ে উড়ে চলে গেলো সোনালি রথ; এশীয় রাজা আরো একটি পতাকা গেঁথে গেলো জমিনে, তারপর আবারো ফিরে এলো। সিংহাসনে বসা ফারাওকে দেখেছে সে, তার সামনে এসে থামলো রথ। ঘামে ভিজে সপসপ করছে ঘোড়াগুলো, মুখের কোণায় সাদা ফেনা। চোখ দুটো হিংস্র ভঙ্গিতে ঘুরছে কোটরের ভেতর, নাকের পাটা ফুলে উঠছে বারবার। সুগঠিত, গর্বিত মস্তক ঝাঁকাতে উড়লো কাঁধের কেশরগুলো, ঠিক রমনীর চুলের মতো।
ফারাও মামোসকে অভিবাদন জানালো হিকসস্ রাজা; ব্যাঙ্গের সুরে হাসলো সে। ভাষার ভিন্নতা সত্ত্বেও তাঁর বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার ফারাওকে দ্বন্দযুদ্ধে আহ্বান জানাচ্ছে সে। এহেন তাচ্ছিল্যে রাগে গর্জে উঠলো মিশরীয় সেনাবাহিনীর যযাদ্ধারা। যেনো বজ্রপাত ঘটলো কোথাও।
আমার নিচে কিছু একটা নড়ে উঠতে দৃষ্টি সরিয়ে দেখলাম, এক সামনে এগিয়ে বিশাল লানাটা ধনুক কাঁধে তুলে নিচ্ছে ট্যানাস। একটা তীর ছুঁড়লো সে। দুধ সাদা আর নীল আকাশের বুকে বাঁকা পথে ছুটলো সেটা। অন্য যে কোনো ধনুকের নাগালের বাইরে হলেও লানাটার নাগালের মধ্যে আছে হিকসস্ রথ । গতিপথের শীর্ষে পৌঁছে বাজপাখির মতো ছোটো মারার ভঙ্গিতে নিচে নামতে লাগলো তীরটা। ঠিক এশীয় রাজার বুকের মধ্যখান লক্ষ্য করে । তিনশো গজ পর্যন্ত উড়ে গেছে তীর, শেষ মুহূর্তে বর্ম তুলে ধরলো হিকসস্ রাজা-ওটার মধ্যে গেঁথে গেলো তীরটা। এতো চমৎকার দক্ষতার সাথে ঠেকালো সে, অবিশ্বাসে গুঙ্গিয়ে উঠলো মিশরীয় যোদ্ধারা।
