ধ্রুপদি ভঙ্গিতে নিজের যোদ্ধাদের সাজিয়েছে ট্যানাস। সামনের সারিতে রয়েছে ভারী বর্শাধারীরা; তাদের বর্ম পরস্পরের সঙ্গে জোড়া লেগে অবিচ্ছিন্ন দেয়াল করেছে। বর্শার হাতল মাটিতে ঠেকানো। নরম সূর্যালোকে ঝকঝক করছে ওগুলোর ডগা। যোদ্ধাদের মুখাবয়বে নিষ্ঠুর কাঠিন্য। এদের পেছনেই রয়েছে তীরন্দাজের দল, ধনুকের ছিলো টেনে অপেক্ষায় আছে তারা। প্রত্যেকের পেছনে তীর রাখার থলে হাতে নিয়ে একজন করে বালক দাঁড়ানো। যুদ্ধের উন্মত্ততার মধ্যে শক্রর ছোঁড়া তীর সংগ্রহ করে তীরের মজুত বাড়াবে ওরা। সবচেয়ে পেছনে, সুরক্ষিত অবস্থায় আছে তলোয়ারবাজেরা। ছোটোখাটো এই দলগুলো তড়িৎ গতিতে শত্রু শিবিরের কোনো ফাঁক-ফোকড় গলে যেমন ঢুকে যেতে পারে, তেমনি নিজস্ব বাহিনীর প্রতিরক্ষাবুহ্যের দুর্বল অংশগুলো মেরামত করাও তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
যুদ্ধের ময়দানের কলা-কৌশল অনেকটা বাও খেলার মতো। ধ্রুপদি শুরু, সঠিত প্রতিরক্ষা শতকের পর শতক ধরে যা চলে আসছে। এ বিষয়ে প্রচুর পড়ালেখা করেছি আমি। রণ-কৌশলের উপর আমার লেখা তিনটি স্ক্রোল এখন থিবেসের সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণে অবশ্য পাঠ্য।
এই মুহূর্তে ট্যানাসের কৌশল পর্যবেক্ষণ করে কোনো ভুল পেলাম না। আত্মবিশ্বাসের পালে হাওয়া লাগলো আমার । কেমন করে এমন শক্তিশালী, অভিজ্ঞ, যুদ্ধের ময়দানের কৌশল সম্পর্কে দারুন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একটি সেনাবাহিনী হেরে যেতে পারে? এরা কখনো কোনো লড়াইয়ে হারে নি।
এবারে আমাদের বাহিনীকে ছাড়িয়ে দূরের ঘূর্ণায়মান, ভীষণ হলুদ ধুলোর মেঘের দিকে তাকালাম । আমার আত্মবিশ্বাস যেনো টলে গেলো। সামরিক ইতিহাসের যে কোনো কিছুর সাথে এর কোনো মিল নেই; আমাদের দেশের দীর্ঘ লড়াইয়ের কোনো সমরনায়কের নেই এ জিনিস দেখার অভিজ্ঞতা। এরা আসলে মরণশীল মানুষ, নাকি গুজবে যেমন বলা হয়েছে সেই অন্ধকারের শক্তি?
এখন এতো কাছে চলে এসেছে পাক খেয়ে ওঠা ধুলোর মেঘ, তার মাঝে কালো কালো অবয়ব দেখতে পাচ্ছি আমি। ঠিক যেমন বলেছিলো নিম্ন-রাজ্যের বন্দীরা, সেই রকম অদ্ভুত জাহাজ এগিয়ে আসছে বালির উপর দিয়ে। কিন্তু জলপথের যে কোনো সময়ের যে কোনো বাহনের চেয়ে দ্রুত এগুলোর গতি, আকৃতিতেও ছোটো। মাটির বুকে যা কিছু চড়েছে আজ অবধি, তার কোনোটিই এর চেয়ে দ্রুতগামী নয়।
চোখ দিয়ে অনুসরণ করা যায় না এই বাহনগুলোকে, ঠিক মশালের চারিপাশে নৃত্যরত পোকা-মাকড়ের মতো দ্রুত এরা। অগ্রসরমান মেঘের ভেতর ঘুরে ঘুরে, নিমিষে অদৃশ্য হয়ে আবার দেখা দিচ্ছিলো। বোঝার কোনো উপায় নেই, সেই একই বাহন দেখা যাচ্ছে বারবার, নাকি অন্য একটা? গুনে দেখার উপায় নেই, কেউ বলতে পারবে না কয়টি বাহন আমাদের যোদ্ধাদের প্রথম সারির উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসছে। ওগুলোর পেছনে, সেই দিগন্তরেখা পর্যন্ত উঁচু হয়ে আছে ধুলোর মেঘ।
যদিও শক্ত-কঠোর ভঙ্গিতে নিজেদের অবস্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো আমাদের যোদ্ধারা, ওদের বিস্ময় আর দুশ্চিন্তা ঠিকই টের পেলাম আমি। দলনেতাদের সাথে ট্যানাসের কথোপকথন থেমে গেছে অনেক আগেই। নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে শত্রুর প্রদর্শনী দেখছে তারা।
হঠাৎ টের পেলাম, আর সামনে এগোচ্ছে না ধুলোর মেঘ। আকাশে ঝুলে রইলো ওটা; ধীরে পরিষ্কার হতে লাগলো আকাশ। সামনের সারির থেমেপড়া বাহনগুলোর দিকে নজর দিলাম আমি। কতগুলো আছে বোঝা সম্ভব হলো না।
পরে জেনেছিলাম, এই নিশ্চলতা মূলত রাখাল রাজার নিজস্ব কৌশল। তখন বুঝতে পারি নি, এই সময়ে নিজেদের সংগঠিত করে চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো হিকসস্ বাহিনী।
ভয়ঙ্কর নীরবতা বিরাজ করছে আমাদের শিবিরে। বাতাসের ফিসফিসানি পর্যন্ত পরিষ্কার শোনা যায়; চারপাশের ছোটো পাহাড়ে লেগে থেকে থেকে গুঙিয়ে উঠছে।
ধীরে, ধুলোর মেঘ থিতিয়ে আসতে সারি সারি হিকসস্ বাহন দৃষ্টিগোচর হলো। এখনো যথেষ্ট দূরে, খুটিনাটি বোঝার উপায় নেই; কিন্তু লক্ষ্য করলাম, পেছনের বাহনগুলো সামনেরগুলোর তুলনায় বেশ বড়ো । মনে হলো, কাপড় বা চামড়ার তৈরি আচ্ছাদন দিয়ে ছাদ তৈরি করা হয়েছে ওগুলোর উপর। সেই বিশাল বাহনগুলো থেকে বড়ো বড়ো পাত্রে করে পানি নামানো হচ্ছে সম্ভবত। এতো পানি কারা পান করে, কে জানে। এই ভিনদেশি আক্রমণকারীরা যা-ই করছে, অত্যন্ত দুর্বোধ্য ঠেকছে আমার কাছে। কিছুই বুঝতে পারছি না।
নীরবতা অসহ্য হয়ে উঠলো আমাদের জন্যে। শরীরের প্রতিটি পেশি টানটান হয়ে আছে, স্নায়ুগুলো যেনো ছিঁড়ে যাবে। হঠাই, আবারো জেগে উঠলো শত্রু শিবির।
সামনের সারি থেকে কিছু বাহন সরাসরি এগিয়ে আসতে লাগলো আমাদের উদ্দেশ্যে। ওগুলোর গতি দেখে অবাক বিস্ময়ে বিড়বিড় করে উঠলো যোদ্ধারা। অল্প কিছু সময়ের বিশ্রাম যেনো তাদের গতিবেগ দ্বিগুন করে ফেলেছে। আরো কাছে চলে এলো বাহনগুলো, আবারো বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠলাম আমরা যখন টের পেলাম ওগুলোকে টেনে নিয়ে আসছে এক জোড়া অদ্ভুত জীব।
বুনো ওরিক্সের মতো লম্বা, সেই রকমেরই ঋজু আকৃতির; বাঁকা ঘাড়ের উপর ছড়িয়ে রয়েছে কেশর। অবশ্য ওরিক্সের মতো শিং নেই এদের, কিন্তু দারুন সুন্দর গড়ন মাথার । বড়ো বড়ো চোখ, নাকের পাটা ফুলে উঠছে থেকে থেকে। খুরওয়ালা পা গুলো লম্বা, অদ্ভুত এক ছন্দে পা ফেলছে, যেনো বালিতে ঘষা খাচ্ছে কেবল।
