মধ্যরাতের পর পর্যন্ত চললো আমাদের তর্ক-বিতর্ক। কিন্তু এবারে আমিও মূল্যবান কিছু বাতলাতে পারলাম না। বেশ রাত হয়ে যাওয়ায় জাহাজে ফেরার উপায় রইলো না। ওর তাবুর এক কোণে মাদুর বিছিয়ে আমাকে শুয়ে পড়তে বললো ট্যানাস। স্বভাবগত কারণেই সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম, দেখি, ট্যানাস নেই বিছানায়। তাঁবুর লিনেন পর্দার ওপাশে এখনো ঘুমে নিমগ্ন ক্যাম্প। মরুর বুকে সকাল জেগে উঠার দৃশ্য দেখতে তড়িঘড়ি করে বিছানা ছাড়লাম আমি।
ক্যাম্পের পেছনের পাহাড়ে চড়ে দৃষ্টি দিলাম নদীর দিকে। রান্নার আগুন থেকে সরু সুতার মতো উঠে আসা নীল ধোয়ার রেখা পুরো আকাশে লেপ্টে গেছে এখন, নদীর বাতাসের কুয়াশার সাথে মিলেমিশে একাকার। জাহাজগুলোর ভেতরে জ্বলা মশালের আলো এসে পড়ছে কালো পানির বুকে। অন্ধকারে ঠিক ঠাওর করতে পারলাম না, আমার কী কোন্ জাহাজটায় আছে।
এরপর পুব দিগন্তে দৃষ্টি ফিরালাম আমি। ধীরে মরুর বুকে জেগে উঠছে সূর্য, আলোর আভায় মুক্তোর মতো জ্বলছে। আলো পরিষ্কার হয়ে আসতে কেমন নরম আর সুন্দর দেখালো মরুর বালিয়াড়ি, বিষণ্ণ আর গাঢ় পার্পল বর্ণে ঢাকা পড়ে গেছে। স্বচ্ছ আলোয় এতো কাছে দেখালো দিগন্ত, যেনো হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে।
তখনই, পরিষ্কার-স্বচ্ছ আকাশের নিচে, দিগন্তরেখার কাছে দেখতে পেলাম ভীষণ ঘন মেঘমালা। আমার বুড়ো আঙুলের প্রান্তের চেয়ে কোনো অংশেই বড়ো নয় ওটা, কিছু সময় পেছনে তাকিয়ে আবার সেই মেঘে ফিরে এলো আমার দৃষ্টি। প্রথমটায় কোনো সতর্কঘণ্টা ধ্বনিত হলো না মাথার ভেতর; এরপর ভালো করে তাকাতে টের পেলাম–নড়ছে ওটা।
অদ্ভুত তো, জোরে বলে উঠলাম, হয়তো, মরুঝড় আসছে। কিন্তু এখন খামসিনের মৌসুম নয়, আর বাতাসেও নেই কোনো স্থবিরতা। ঠাণ্ডা, শান্তিময় সকাল চারিদিকে।
আমার দৃষ্টির সামনেই দূরের সেই মেঘ ক্রমশ লম্বা হতে লাগলো। মেঘের চওড়া অংশটা উপরে নয়, রয়েছে জমিনে; কিন্তু এতো দ্রুতগতির এতো প্রশস্ত আকৃতি স্থলে তৈরি হবে কেমন করে। একঝাক পাখি হয়তো এতো দ্রুত উড়তে পারে, একপাল কীটপতঙ্গের মেঘও অমন হতে পারে কিন্তু কেনো যেনো মনে হলো, এ দুটোর কোনোটাই নয় ওটা।
ধূসর-হলুদ ছিলো সেই মেঘের রঙ, প্রথমটায় বিশ্বাস করতে মন সায় দিলো না যে ওটা ধুলোর মেঘ। বালির উপর একশর বেশি শিং ওয়ালা ওরিক্স দাবড়াতে দেখেছি আমি, কিন্তু ওগুলোর খুড়ের ঘায়েও এতো বড়ো ধুলোর মেঘ তৈরি হয়নি। যদি মরুতে পুড়ে যাওয়ার মতো কিছু থাকতো, তা হলে না হয় ধরে নিতাম ওটা আগুনের ফলে সৃষ্ট। এ ধুলোর মেঘ না হয়ে যায় না, কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার পরেও আমার মন সায় দিতে চাইলো না। অসম্ভব দ্রুতগতিতে কাছে চলে আসছে ওটা, বোকার মতো তাকিয়ে থাকলাম আমি।
আচমকা, ভীষণ উঁচু সেই মেঘের নিচে একটা আলো চমকাতে দেখলাম। সাথে সাথেই আমার মন ফিরে গেলো আমন রার ভবিষ্যতের ছবিতে। ঠিক এই দৃশ্যই ছিলো সেটা। কিন্তু এখনকার দৃশ্য ভবিষ্যতের কিছু নয়, জ্বলজ্যান্ত বাস্তব। আমি জানি, ওই আলোর ঝলকানি মূলত বর্ম আর চকচকে বর্শা থেকে ঠিকরে আসা সূর্যরশ্মি। দাঁড়িয়ে পাহাড়ের মাথার উপর থেকে চেঁচিয়ে সতর্ক করে দিতে চাইলাম আমাদের যোদ্ধাদের, কিন্তু বাতাসের বিপরীতে থাকায় কেউ শুনতে পেলো না আমার কথা।
এরপরই, নিচে ক্যাম্পে বেজে উঠা যুদ্ধ-দামামা আমার কানে পৌঁছুলো। প্রহরীদের চোখে অবশেষে ধরা দিয়েছে অত্যাশ্চর্য এই মেঘ, ওরাই সতর্ক করেছে সবাইকে। এই রণ-দামামাও তো আমার ভবিষ্যত-দর্শনের অংশ ছিলোমনে পড়লো। ভীষণ তীক্ষ্ণ সেই আওয়াজ যেনো খুলি ফাটিয়ে দেবে, শরীরের রক্ত ঠাণ্ডা মেরে যাবে যেনো। আমি জানি, আজকের দিনে পতন ঘটবে এক সাম্রাজ্যের; পুব থেকে আসা কীটপতঙ্গ আমাদের এই মিশরের অধিকার নেবে। আমার কর্ত্রী আর তার শিশুপুত্রের জন্যে মন কেঁদে উঠলো–ওই ছোট্ট রাজকুমারই যে ফারাও-এর শেষ বংশধর।
আমার নিচে, ক্যাম্পের সমস্ত যোদ্ধারা অস্ত্র হাতে ছুটছে। ঠিক যেনো তছনছ হওয়া আবাস ছেড়ে আসা মৌমাছির ঝাঁক, যে যেভাবে পারছে হুঙ্কার দিয়ে ছুটছে। তীক্ষ্ণ রণ-সংগীতে তলিয়ে গেলো সেনাপতিদের চিৎকার।
দেখলাম, নিজের তবু ছেড়ে সশস্ত্র যোদ্ধাদের একটি দলের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো ফারাওকে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে তাকে বহন করে ছুটলো যোদ্ধার দল, সমতলের উপরে পাথরের উপর অবস্থিত তার সিংহাসনে নিয়ে যাচ্ছে। ওখানে বসিয়ে, হাতে রাজ্যের প্রতীক আর মাথায় দ্বৈত-মুকুট পরিয়ে দিলো তারা। ছাই বর্ণ ধারণ করেছে ফারাও-এর মুখাবয়ব, মার্বেল পাথরের মূর্তির মতো স্থির বসে রইলেন তিনি; ওদিকে তাঁর নিচে রণক্ষেত্রে বিন্যস্ত হতে শুরু করেছে সেনাবাহিনী। প্রথম সতর্কধ্বণীর পর দ্রুতই নিজের যোদ্ধাদের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছে ট্যানাস।
দৌড়ে ঢাল বেয়ে নেমে ফারাও-এর কাছে চলে এলাম আমি। ওদিকে, মরুর বুকে ছড়িয়ে পড়েছে ট্যানাসের বাহিনী। ভীষণ ধুলোর মেঘের সঙ্গে লড়ার জন্যে প্রস্তুত।
নিজের যোদ্ধাদের নিয়ে ডান ধারে রইলো ক্ৰাতাস। প্রথম ঢালের মাথায় তার লম্বা অবয়ব চিনতে পারলাম আমি। চারপাশে ঘিরে আছে সেনাপতিরা, নদীর মৃদুমন্দ বাতাসে কাঁপছে তাদের মাথার আচ্ছাদনের পাখির পালক। আমার ঠিক নিচেই অবস্থান নিয়েছে ট্যানাস আর তার যোদ্ধারা; এতো কাছে, ওদের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছি আমি। ধীর, অকম্পিত কণ্ঠে আগুয়ান বাহিনীকে নিয়ে আলাপে মগ্ন তারা।
