দলবলসহ জমিনে নেমে, উঁচু একটা স্থানে ক্যাম্পে চলে গেলেন ফারাও। যেখানে নেমেছি, পরিত্যক্ত একটা গ্রাম এটা; বহুকাল আগে ভুয়া-ফারাও-এর সঙ্গে যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে পালিয়ে গিয়েছিলো অধিবাসী কৃষকেরা। অভিশপ্ত এই গ্রামের নাম আবনুব।
আবনুবে আমরা পৌঁছার আগে থেকেই বন্যার প্লাবন কমে আসছিলো, যদিও সেচের জন্যে তৈরি খালগুলো এখনো পানিতে টইটুম্বর, ফসলের মাঠে কালো পলিমাটির চিহ্ন রেখে নেমে গেছে নীল নদের পানি।
নেমবেটের আদেশ অনুযায়ী শত্রুর সঙ্গে মোকাবেলার জন্যে তৈরি হলো ট্যানাস। যুদ্ধ-ক্রম অনুযায়ী ক্যাম্প ফেললো বাহিনী। নদীপথে গ্যালিগুলোর নেতৃত্বে রইলো আস্ তেস। রণক্ষেত্রের কেন্দ্রে রইলো ট্যানাস, ডানদিকে থাকলো ক্রাতাসের দল।
সেই পুব দিগন্ত পর্যন্ত যেদিকে নজর যায়, কেবল ধু ধু মরু৷ গনগনে রোদে তপ্ত, পানিবিহীন ওই জায়গায় কোনো সেনাবাহিনী টিকতে পারে না। তাই আমাদের ডান দিক থেকে আক্রমণের কোনো ভয় নেই।
হিকসস্ সম্পর্কে যতটুকু শুনেছি, তার নিজস্ব কোনো নৌবহর নেই; জমিন হয়ে এসেছে। কাজেই স্থলযুদ্ধে তার সাথে লড়ার প্রস্তুতি নিয়েছে ট্যানাস। সে জানে, নদী পার হওয়ার কোনো উপায় নেই রাখাল রাজার। এমনিতে সে নিজে অবশ্য আবনুবে থাকতো না, কেবল নেমবেটের নির্দেশ বলে কথা।
ছোটো একটা ঢালে আবব গ্রামের অবস্থান। চারপাশে জংলাঘেরা ফসলের মাঠ। অন্তত, শত্রুপক্ষ আক্রমণ করার অনেক আগেই তাদের দেখতে পাবো আমরা।
মিশরের শ্রেষ্ঠ ত্রিশ হাজার যোদ্ধা রয়েছে ট্যানাসের অধীনে। এতো বড়ো বাহিনী জীবনেও দেখিনি আমি। নীল নদের উপত্যকায় কোনোদিনও এতো বিশাল বাহিনী একসাথে হয়নি। ওদিকে আরো ত্রিশ হাজার সৈনিক নিয়ে আসছেন নেমবেট । ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সেনাবাহিনী হতে যাচ্ছে এটা।
এদেরকে হারিয়ে দিতে পারে, এমন কোনো শক্তি নেই। পালিশ করা চামড়ার মাথার আচ্ছাদনের নিচে বারো হাজার তীরন্দাজ, আট হাজার বর্শা নিক্ষেপকারী, চিতার চামড়ার টুপি পরা দশ হাজার তলোয়ারবাজ; পাথর নিক্ষেপকারী গুলতি সহ কয়েক হাজার যোদ্ধা। পঞ্চাশ গজ দূর থেকে খুলির হাড় ফাটিয়ে দিতে পারে এরা।
দিনদিন আশান্বিত হয়ে উঠতে থাকি আমি। কেবল একটা ব্যাপার আশঙ্কা জাগায়, হিকসস্ দের শক্তিমত্তা সম্পর্কে কিছুই জানি না আমরা। ওদিকে, ট্যানাসের উপর কঠোর নির্দেশ আছে যেনো পর্যবেক্ষক দল না পাঠানো হয় সামনে। কিন্তু যুদ্ধ গ্যালি সামনে পাঠানোর ব্যাপারে তো নিষেধ করা হয়নি। ট্যানাসকে বললাম সে কথা।
তোমার আসলে আইন-লেখক হওয়া উচিত ছিলো, ট্যানাস হাসে। শব্দ-খেলায় তোমার জুড়ি নেই। খালি ফাঁক-ফোকড় বের করো! এরপর, হুইকে একটা ছোটো গ্যালি নিয়ে মিনিয়ে নগরী পর্যন্ত এগোনোর নির্দেশ দিলো সে। একসময়ের শ্রাইক, বর্তমানে ট্যানাসের গুণমুগ্ধ শিস্য, হুই তার গ্যালি নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলো।
কোনো রকম লড়াইয়ে না গিয়ে কেবল সংবাদ সংগ্রহের কঠোর নির্দেশ ছিলো ওর উপর। ঠিক চতুর্থ দিনে প্রত্যাবর্তন করলো সে। সেই মিনিয়ে পর্যন্ত ঘুরেও একটি জাহাজ বা শক্রর কোনো রকম চিহ্ন দেখেনি সে। নদীর ধারের গ্রামের পর গ্রাম নাকি এখন মৃতপুরী। জ্বলছে মিনিয়েহ্ নগরী।
অবশ্য, ভুয়া ফারাও-এর ছত্রভঙ্গ সেনাবাহিনীর বেশ কিছু যোদ্ধাকে ধরে নিয়ে এসেছে সে। হিকসস্ আক্রমণের একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রথমবারের মতো প্রশ্ন করার সুযোগ পেলাম আমরা। কিন্তু, এমনকি একবারের জন্যেও রাখাল রাজার সাথে যুদ্ধ করেনি তাদের কেউই। শক্রর আগমনের সংবাদেই চম্পট দিয়েছে। কাজেই, তাদের মুখে কেবল শোনা-কথা আর গুজব, যার সত্যতা কতটুকু কে জানে।
কেমন করে এটা বিশ্বাস করি, বাতাসের মতো দ্রুতগতির জাহাজে করে মরু পাড়ি দিয়েছে কোনো সেনাবাহিনী? তাদের মতে, সেই জাহাজের সামনের ধুলোর মেঘ নাকি এতো ভীষণ লম্বা যে কোনো যোদ্ধার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে যাবে।
ওরা মানুষ নয়, একবাক্যে জানালো বন্দীরা, অন্ধকার জগতের শক্তি তারা। আর, শয়তানের পাখায় ভর দিয়ে উড়ে মরু পাড়ি দেয়!
এমনকি, গরম কয়লা চাঁদিতে রাখার পরও নিজেদের গল্প পরিবর্তন করলো না তারা। এ ধরনের খবর বাহিনীতে ছড়িয়ে পড়লে আত্মবিশ্বাস টলে যাবে। কাজেই, ভুয়া ফারাও-এর যোদ্ধাদের মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত করা হলো।
*
আবনুবে আমাদের অপেক্ষার দশম দিনে খবর পাওয়া গেলো শেষপর্যন্ত তাঁর বাহিনীকে একত্র করে রওনা দিয়েছেন নেমবেট; দুই সপ্তাহের মধ্যে আসয়ুতে পৌঁছানোর আশা করছেন তিনি। দারুন উত্তেজনায় টগবগ করে ফুঁসে উঠলো যোদ্ধারা, এক লহমায় চড়ুইপাখি থেকে ঈগলে পরিণত হলো এই সংবাদে। আনন্দের বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ সুরা আর মাংসের বাড়তি অংশ বরাদ্দ করলো ট্যানাস সবার জন্যে। আবব গ্রামের সমভূমিতে রান্নার অগ্নিকুণ্ড যেনো আকাশের তারা হয়ে জ্বললো সেই রাতে। ঝলসানো মাংসের জীভে জল আসা গন্ধে মৌ মৌ করছে বাতাস। রাতের শেষ প্রহর পর্যন্ত হাস্যরস আর গানের শব্দে মুখরিত হলো আমাদের ক্যাম্প।
রাজকুমারসহ মিসট্রেসকে গ্যালিতে রেখে ট্যানাসের আহ্বাণে জমিনে চলে এসেছিলাম আমি। নিজস্ব বাহিনীর প্রধানদের সাথে নিয়ে শেষবারের মতো পরামর্শসভায় বসেছে সে, চায় আমি যেনো সভায় উপস্থিত থাকি। তুমি সব সময়ই পরিকল্পনার ডিপো একটা, বুড়ো বন্ধু । বাতাসে ভর দিয়ে মরুর উপর দিয়ে উড়ে আসে–এমন জাহাজ ধ্বংস করার জন্যে তোমার কাছে হয়তো কোনো উপায় আছে, কী বলো?
