মহান ফারাও! কাপুরুষ অভিধায় গর্জে উঠে ট্যানাস। কেবলমাত্র একজন গর্দভ–বুড়ো গর্দভের পক্ষেই সম্ভব শক্রর সম্পর্কে কোনেকিছু না জেনে লড়তে যাওয়া । নির্বুদ্ধিতার সময় অবশিষ্ট নেই আর
কোনো লাভ হলো না ট্যানাসের কথায়। সেনাবাহিনীতে তার চেয়ে অভিজ্ঞ সমরনায়কদের কথা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো।
সঙ্গে সঙ্গেই উত্তরে গিয়ে পলায়নরত সেনাবাহিনীকে সুস্থির করার আদেশ দেওয়া হলো ট্যানাসকে। সম্মুখ সমরে নিজেদের সীমানা ধরে রাখার জন্যে প্রাণপণ লড়তে হবে তাকে। এমনকি, আসয়ূত নগরের সীমানায়, যেখানে পাহাড়ের সারি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষায় ভূমিকা রাখবে এবং শহরের দেয়াল দ্বিতীয় প্রতিরক্ষাব্যুহ হিসেবে কাজ করবে, কৌশলগত পশ্চৎপসরণ করে সেই পর্যন্ত আসতেও কঠোর ভাষায় নিষেধ করা হলো তাকে।
এই সময়ে দক্ষিণের সেই কুশ থেকে বাকি সেনাবাহিনীকে একত্র করে নিয়ে আসবে নেমবেট। এহেন বিপদজনক পরিস্থিতিতে আফ্রিকার হুমকিকে গণ্য না করলেও চলবে। যোদ্ধাদের একত্র করা শেষ হতে নেমবেট উত্তরের বাহিনীর সাথে মিলিত হয়ে আক্রমণ চালাবেন। একমাসের মধ্যেই ষাট হাজার যোদ্ধা এবং চারশো গ্যালির এক অজেয় বাহিনী তৈরি হবে আসয়ূত নগরে। ইত্যবসরে, যে কোনো মূল্যে মাটি কামড়ে পড়ে থাকতে হবে ট্যানাসকে।
কঠোর একটি ঘোষণার মাধ্যমে বক্তব্য শেষ করলেন নেমবেট। সীমান্তে তার সমস্ত যোদ্ধা মজুত রাখার জন্যে লর্ড হেরাবকে আদেশ দেওয়া হলো। কোনো ধরনের পর্যবেক্ষক বাহিনী বা কৌশল না করারও পরামর্শ দেওয়া হলো তাকে।
সাহসী নেমবেট, এ সমস্ত ঘোষণা আমাকে, আমার তলোয়ারধারী হাতকে বেঁধে ফেলছে। বীরোচিত এবং ফলপ্রসু উপায়ে লড়ার সমস্ত সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে আমাকে। ট্যানাসের প্রতিবাদে কাজ হলো না। তরুণ এই প্রতিযোগীর উপর নিজের আদেশ চাপিয়ে দিতে পেরে আত্মপ্রসাদ লাভ করছিলেন নেমবেট, এতে করে যেনো প্রতিশোধ নেওয়া হলো তার। কত মামুলি মানবিক আবেগ একটি জাতীর নিয়তি পাল্টে দিতে পারে, ভেবে অবাক হতে হয় আজো।
সেনাবাহিনীর প্রথম সারিতে নিজে অবস্থান নেয়ার ইচ্ছে পোষণ করলেন ফারাও। ইতিহাসের সমস্ত নিয়তি নির্ধারণের যুদ্ধে ফারাও নেতারা সেনাবাহিনীর প্রথম সারিতে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর সাহসীকতাকে শ্রদ্ধা করলেও এই সময়ে এ ধরনের ইচ্ছে পোষণ না করাই সঠিক বলে আমার মতো। ফারাও মামোস, মোটেও বীরযোদ্ধা নন; তার উপস্থিতি এমন কোনো সুবিধা এনে দেবে না। হতে পারে, তার উপস্থিতিতে উৎসাহ বাড়বে যোদ্ধাদের, কিন্তু বিশাল সভাষদ ট্যানাসের রণ-কৌশলে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে ।
রাজা তো আর উত্তরের যুদ্ধের ময়দানে একা যাবেন না। রানি এবং রাজকুমার সহ পুরো সভাষদ তাঁর সঙ্গী হবে। আমাকেও তাই যেতে হচ্ছে আসয়ূতের রণক্ষেত্রে।
কেউ কিছু জানতো না আমাদের এই নতুন শত্রু সম্পর্কে। অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে আমার রানি আর রাজকুমার। অন্যদিকে, একজন ক্রীতদাসের নিরাপত্তার প্রশ্ন তোলাটাই অবান্তর, তবে ক্রীতদাসের নিজের কাছে হয়তো তা নয়। বন্যা প্লাবিত নদীতে ভেসে উত্তরের সমরাঙ্গনের উদ্দেশ্যে পাল তোলার আগের রাতটা তাই নিধুম কাটলো আমার।
*
যতোই উত্তরে ভেসে চললো আমাদের জাহাজবহর, অসংখ্য ভয়ঙ্কর সংবাদ, গুজব কানে আসতে লাগলো সামনের রণাঙ্গন থেকে। ভয় আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব আমাদের ইতিমধ্যেই ক্ষয়িষ্ণু আত্মবিশ্বাসের মূলে আঘাত হানলো। যাত্রার সময়ে প্রায়ই আমাদের গ্যালিতে এসে এ সমস্ত খবর-গুজব নিয়ে আলোচন করতো ট্যানাস। অধশ্য, কিছুটা সময় রাজকুমার আর তার মার সঙ্গে কাটাতো সে।
যুদ্ধ চলাকালে সেনাবাহিনীতে নারীর উপস্থিতি কখনোই সঠিক বলে মনে হয়নি আমার। কী শান্তির সময়, কী যুদ্ধের সময় নারীর মতো মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আর কিছুর বা কারোর নেই। এমনকি, ট্যানাসের মতো একজন বীরের ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। এই মুহূর্তে আসন্ন যুদ্ধের দিকেই শুধু ওর মনোযোগ থাকা উচিত; আমার এই মন্তব্যে ট্যানাস হাসে।
ওদের দেখে বরং যুদ্ধে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাই, বুড়ো বন্ধু। ঠিক সিংহের মতোই লড়বো, দেখে নিও!
কয়েকদিনের মধ্যেই পলায়নপর সেনাদের প্রথম দলটাকে ধরে ফেললাম আমরা। নদীর তীর ধরে দক্ষিণে পালানোর পথে গ্রামের পর গ্রাম লুট করছে তারা। কোনো রকম দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়াই শ খানেক যোদ্ধার কল্লা ফেলে দিয়ে বর্শার ডগায় গেঁথে নদীর পারে সাজিয়ে রাখলো ট্যানাসসতর্কবানী হিসেবে। এরপর বাকিদের উপযুক্ত সেনাপতির অধীনে নিয়োজিত করে দিলো। পালানোর কথা ভুলে নতুন উদ্যমে সামনে এগিয়ে চললো তারা।
নদী তীরবর্তী দেয়ালঘেরা শহর, আসমূত-এ পৌঁছলো আমাদের নৌবহর। নেমবেট-এর নির্দেশ অমান্য করে রেমরেম-এর অধীনে পাঁচ হাজার যোদ্ধার একটা দল এখানে মোতায়ান রাখলো ট্যানাস। আরো উত্তরে ভেসে চললাম আমরা। সীমান্তে, যেখানে অপেক্ষায় রয়েছে রহস্যময় রাখাল রাজার বাহিনী।
নদীর উপর যুদ্ধের ভঙ্গিমায় নোঙর করলো আমাদের গ্যালিগুলো। মূল যোদ্ধাদের দলটা নদীর পুব তীর ধরে ওত পেতে থাকলো।
বড়ো, আরামদায়ক জলযানে রাজকুমার আর রানির অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখার কথা বললাম আমি ফারাওকে। পানির উপরে বাতাস শান্ত; আর তাছাড়া, বেগতিক দেখলে পালানো সহজ হবে এতে করে ।
