বছর কেটে গেলো। আবারো, পূর্বের অসংখ্যবারের মতো বন্যার পানিতে উঁচু হলো নদীর পানির সমতল। আমার ইন্দ্রজালে ভবিষ্যৎ অবলোকনের পর এ হলো চতুর্থ বন্যা। ওদের মতো আমিও এ বছরের শেষ নাগাদ ইন্দ্রজালের কথা সত্যি হওয়ার অপেক্ষায় আছি। তা যখন ঘটলো না, আমার কর্ত্রী এবং ট্যানাস দুজনেই ভীষণ করে ধরলো আমাকে।
কবে আমি ট্যানাসের হতে পারবো? রানি লসট্রিস দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কিছু একটা করো না, টাইটা।
আমাকে নয়, দেবতাদের বলো ও কথা। আমি তো কেবল প্রার্থনা করতে পারি, আর কিছু নয়।
অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটলো না। এভাবেই কেটে গেলো আরো একটি বছর। এমনকি, ট্যানাস পর্যন্ত অধৈৰ্য্য হয়ে উঠলো। তোমার উপর এতোটা বিশ্বাস করেছিলাম আমি, টাইটা, ভবিষ্যতের সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তোমার কথার উপর ছেড়ে দিয়েছি। কসম, যদি দ্রুত কিছু একটা না করো হঠাৎ থেমে পরে আমার দিকে করুণ চোখে চেয়ে থাকতো ও।
আরো একটি বছর কেটে গেলো। ততদিনে নিজের ভবিষ্যৎ-দর্শনে আমার বিশ্বাস টলে যেতে বসেছে। বিশ্বাস করতে বসেছি, দেবতারা তাদের ইচ্ছে পাল্টে ফেলেছেন, নচেৎ আমি নিজেই আকাঙ্ক্ষাপ্রসূত কল্পনার আশ্রয় নিয়েছিলাম তখন।
রাজকুমার মেমননের বয়স তখন পাঁচ, ওর মায়ের একুশ। এ সময়ই, হঠাৎ একদিন উদভ্রান্ত অবস্থায় উত্তর থেকে খবর নিয়ে এলো একটা টহলদার গ্যালির বার্তাবাহক।
ডেল্টার পতন ঘটেছে। লাল-ফারাও নিহত হয়েছেন! আগুন জ্বলছে নিম্ন-রাজ্যে। ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে মেমফিস এবং আভারিস নগরী। মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে সমস্ত মন্দির, দেবতাদের মূর্তিগুলো সব ধুলোয় লুটাচ্ছে, চেঁচিয়ে ফারাওকে বললো গ্যালির যোদ্ধা । উত্তরে তিনি বললেন, এটা সম্ভব নয়। বিশ্বাস হয় না। আমরা টের পাবার আগে কেমন করে ঘটলো এতোকিছু? যথেষ্ট শক্তিশালী বাহিনী রয়েছে উত্তরের জবর-দখলকারী ফারাও-এর, বিগত পনেরো বছর ধরে চেষ্টা করেও তাকে উপড়ে ফেলতে পারিনি আমরা। একদিনের মধ্যে কেমন করে এটা সম্ভব হলো? কার দ্বারা?
ভয় আর উত্তেজনায় কাঁপছিলো বার্তাবাহক, বহুদূর পথ ছুটে এসেছে সে।
তলোয়ার খাপ থেকে বের করার আগেই নিহত হয়েছেন লাল-ফারাও। যুদ্ধের দামামা পর্যন্ত বেজে উঠেনি তার বাহিনীতে তখনো।
কেমন করে সম্ভব হলো এটা?
মহান মিশর, কেমন করে বলবো বলুন? শুনেছি, ভয়ঙ্কর এক বাহিনী হানা দিয়েছে সেই পুব থেকে বাতাসের মতো দ্রুত, কোনো জাতীর সাধ্য নেই তাদের সামনে দাঁড়ায়। উত্তর সীমান্ত থেকে পিছু হটছে আমাদের বাহিনী, সবচেয়ে বীর যোদ্ধারও সাহস নেই তাদের মুখোমুখি হওয়ার।
কে এই শত্রু? ফারাও জানতে চাইলেন, প্রথমবারের মতো ভয় ফুটে উঠলো তার কণ্ঠস্বরে।
তার নাম রাখাল রাজা। হিকসস্।
একদিন ওই নাম নিয়ে তামাশা করেছিলাম আমি আর ট্যানাস। আর কখনোই করবো না সেটা।
*
যুদ্ধাবস্থা ঘোষণা করে উপদেষ্টাদের নিয়ে গোপন সভায় বসলেন ফারাও। এরও বহুদিন পরে, ক্রাতাসের কাছ থেকে শুনেছিলাম, কী আলোচনা হয়েছিলো সেদিনের সভায়। শপথ ভেঙে গোপন আলোচনার কোনোকিছু এমনকি লসট্রিস বা আমাকেও বলার লোক নয় ট্যানাস। কিন্তু আমার ধূর্ত বাক্যবাণে অবশেষে সবকিছু বলতে বাধ্য হয়েছিলো ক্ৰাতাস।
তাকে দশ হাজারের সেরা পদবিতে উন্নিত করে নীল কুমির বাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করেছিলো ট্যানাস। ওদের দুজনার মধ্যকার বন্ধুত্ব তখনো অটুট। কাজেই, বাহিনীগুলোর অন্যতম প্রধান হওয়ায় গোপন সভায় উপস্থিত থাকতে পেরেছিলো সে, যদিও নীচু পদমর্যাদার কারণে কোনো বিষয়ে মতো প্রকাশ করতে পারেনি। যা যা ঘটেছিলো সেদিন, সবই আমার আর মিসট্রেসের কাছে বলেছিলো সে।
নেমবেটের নেতৃত্বে প্রাচীনপন্থিরা আর ট্যানাসের নেতৃত্বে তরুণ যোদ্ধারা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছিলো সভায়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে শেষপর্যন্ত মূল দায়িত্ব ন্যস্ত হলো বয়োজ্যেষ্ঠ যোদ্ধাদের হাতে; তাদের প্রাচীন সমরকৌশল অনুসরণ করা ছাড়া কোনো গতান্তর রইলো না তরুণদের জন্যে।
ট্যানাসের মতে, মূল সমরাঙ্গন থেকে সেনাবাহিনীকে পিছু হটিয়ে নদীর গতিপথ বরাবর কয়েকটি স্থানে শক্ত ঘাঁটি গড়ে শক্রর জন্যে অপেক্ষা করাই শ্রেয়; একইসঙ্গে ছোটো ছোটো প্রহরী এবং পর্যবেক্ষক বাহিনী পাঠিয়ে রহস্যময় এই শত্রুর গতিপ্রকৃতি অনুধাবন করার পরামর্শ দিয়েছিলো সে। উত্তরের সমস্ত শহরে তার চর মজুদ আছে। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে কারো কাছ থেকেই কোনোরকম সংবাদ আসছে না। কাজেই, তাদের কাছ থেকে খবর সংগ্রহ করে মূল বাহিনীকে একত্র করতে চাইছিলো সে।
যতক্ষণ পর্যন্ত না জানতে পারছি, কাদের সাথে লড়তে হচ্ছে আমাদের, সঠিক রণ-কৌশল বের করা মুশকিল, সভায় বলেছিলো সে।
নেমবেট আর তার সহযোগী বয়োজ্যেষ্ঠরা বিরোধিতা করেছিলো ট্যানাসের বক্তব্যে। রাজকীয় জলযান রক্ষার ঘটনায় ট্যানাসের দ্বারা অপমানিত হওয়ার কথা কখনো ভুলে যাননি বৃদ্ধ এই সমরনায়ক। যুক্তির চেয়ে একগুঁয়েমির কারণেই মূলত ট্যানাসের সমস্ত বক্তব্যে বিরোধিতা করেছিলেন তিনি।
আমাদের এই পবিত্র ভূমির এক ইঞ্চি মাটিও শত্রুর কাছে ছেড়ে আসবো না! অমন চিন্তা করাও কাপুরুষের কাজ। বরঞ্চ আগে বেড়ে, যে-ই হোক, তাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া উচিত! গ্রাম্য কুমারীদের মতো লজ্জাবনত চিত্তে আগুপিছু করার কোনো মানে হয় না!
