সেই সন্ধাতেই, হোরাসের মন্দিরে ধরনা দিয়ে দান করে এলাম আমি। প্রার্থনায় বসে তার কাছে ফরিয়াদ জানালাম, ইন্দ্রজালের ঘটনাবলিকে খুব বেশি দেরি করিয়ে দিয়ো না, হোরাস। নিজেদের বাধা দিয়ে রাখতে পারবে না ওরা। এর অর্থ হবে, আমাদের সকলের অসম্মান আর মৃত্যু।
কখনো ঐশ্বরিক ঘটনাপ্রবাহে মানবের হস্তক্ষেপ না করাই সর্বোত্তম। আমাদের প্রার্থনা অনেক সময়ই এমন বিচিত্র উপায়ে সত্যি হয়ে যায়, তা একাধারে যেমন অপ্রত্যাশিত, তেমনি বেদনাদায়ক।
*
আমি ছিলাম রাজকুমারের চিকিৎসক। কিন্তু চিকিৎসাবিদ্যায় আমার দক্ষতার তেমন কোনো প্রয়োজন হলো না ওর। বাবার কর্কশ, অসাধারণ স্বাস্থ্য আর শক্তিমত্তা পেয়েছিলো সে। মেমননের ক্ষুধা আর হজমশক্তি ছিলো উদাহরণযোগ্য। যা কিছু মুখে দেওয়া হতো, গোগ্রাসে গিলে ফেলতো সে।
নিরবচ্ছিন্ন ঘুম দিয়ে উঠেই খাবারের জন্যে গর্জে উঠতো সবসময়। একটা আঙুল তুলে ওর সামনে রেখে এদিক-ওদিক যখন নাড়াতাম আমি, বড়ো বড়ো কালো চোখে ওটাকে অনুসরণ করতে মেমনন; সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে ওটা ধরে উঠে বসতে চাইতো। আমার দেখা যে কোনো বাচ্চার চেয়ে দ্রুত বসতে শিখেছিলো সে। যখন উঠে বসে হামা দিতো ও, ততদিনে অনেক বাচ্চা বসতেও শিখেনি। আবার, যেদিন প্রথম টলোমলো পা ফেললো, অনেক বাচ্চাই অতুটুক বয়সে কেবল হামা দিতে শিখেছে।
সেদিন ট্যানাস ছিলো আমাদের সাথে। গত দু মাস ধরেই যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলো সে, লাল-ফারাও ততদিনে আয়ুত দখল করে ফেলেছে। ফারাও-এ নির্দেশে জলপথে সমস্ত শক্তি নিয়োগ করে সেই নগরীর দখল ফিরে পাবার জন্যে লড়ছিলো উত্তুরে বাহিনী।
পরে কাতাসের কাছে শুনেছিলাম, কী ভয়ানক যুদ্ধ হয়েছিলো সেখানে; অবশেষে শহরের দেয়াল ভেঙে ট্যানাসের নেতৃত্বে দখল প্রতিষ্ঠা করেছিলো নীল বাহিনী। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে লাল ফারাও-এর বাহিনীকে বিতারিত করেছিলো তারা।
থিবেস প্রত্যাবর্তনের পর উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলো ট্যানাস। ওর গলায় সম্মানসূচক সেরা সমরনায়কের পদক পড়িয়ে দিয়ে বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে অর্থ পুরস্কার দিলেন ফারাও।
রাজার কাছ থেকে সরাসরি বারাজ্জায় চলে এলো ট্যানাস, ওর অপেক্ষাতেই বসে ছিলাম আমরা। প্রবেশমুখে পাহাড়ায় থাকলাম আমি, ওদিকে দারুন আবেগে পরস্পরকে আলিঙ্গন করলো ওরা দুজন। শেষমেষ, আমি গিয়ে আলাদা করলাম ট্যানাস এবং লসট্রিসকে।
প্রভু ট্যানাস, তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠলাম, রাজকুমার অধৈৰ্য্য হয়ে পড়েছেন। অনিচ্ছার ভঙ্গিতে আলিঙ্গন ভেঙে, ছায়ার নিচে শেয়ালের চামড়ার উপর হাত-পা ছড়িয়ে ন্যাংটো পড়ে থাকা মেমননের দিকে এগোলো ট্যানাস। এক হাঁটুতে ভর দিয়ে ওর উদ্দেশ্যে নিচু হলো সে।
অভিবাদন, সম্মানিত রাজকুমার! আমাদের বাহিনীর বিজয়ের খবর নিয়ে এসেছি আমি– বাপকে চিনতে পেরে খুশিতে আওয়াজ করে উঠলো ছোট্ট মেমনন। চকচকে স্বর্ণের হারটা তার দৃষ্টি কেড়েছে। জোর এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালো ও, টলোমলো পায়ে চারকদম এগিয়ে দুই হাতে জাপটে ধরলো ওটা।
আমরা খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠতেই চমকে পেছন ফিরে চাইলো মেমনন, তখনো ধরে রেখেছে স্বর্ণের হারটা।
হোরাসের ডানার কসম, তোমার চেয়ে স্বর্ণের প্রতি ওর লালসা কম নয়, টাইটা! হেসে উঠে বলে ট্যানাস।
স্বর্ণ নয়, সম্মানটাই ওর কাম্য, আমার কী শুধরে দিলো। একদিন, ওর গলাতেও শোভা পাবে শ্রেষ্ঠ সমরনায়কের পদক।
কোনো সন্দেহ নেই! মেমননকে উঁচতে ছুঁড়ে দিয়ে আবার লুফে নিলো ট্যানাস। খুশিতে চেঁচিয়ে উঠে পা ছুঁড়ে আবারো ওটা করার নির্দেশ দিলো রাজকুমার।
এভাবেই, ট্যানাস এবং আমার জন্যে নদীর উথান আর পতনের মতোই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে লাগলো ছোট্ট শিশু মেমনন। আর, পুত্র এবং ভালোবাসার মানুষের সান্নিধ্যে কেটে যেতে লাগলো আমার মিসট্রেসের একান্ত প্রহরগুলো। ট্যানাসের সঙ্গে বিচ্ছেদের সময়টা যেনো আর কাটতো না ওর, প্রতিটি একান্ত মুহূর্ত আরো অসহ্য রকম ক্ষণস্থায়ী হয়ে উঠলো বারবার।
*
সেই গ্রীষ্মে নদীর পাবন গজ-দ্বীপের জলউৎসবে ঘোষিত পূর্বানুমান মতোই যথেষ্ট ছিলো। বন্যার পানি নেমে যেতে, কালো পলিতে চকচক করে উঠলো আমাদের ফসলের মাঠ । ক্রমেই, ঘন সবুজ শস্য আর ফলমূলে ভরে উঠতে লাগলো জমিন। যতদিনে শক্ত করে পা ফেলতে শিখলো রাজকুমার, রাজ্যের প্রতিটি গোলাঘর কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। এমনকি, মিশরের সবচেয়ে দরিদ্র ব্যক্তির ভাঁড়ারেও পর্যাপ্ত খাদ্য মজুত রইলো। পশ্চিম তীরে মেমননের প্রাসাদ ধীরে ধীরে আকৃতি পাচ্ছিলো; ওদিকে, ভুয়া ফারাও-এর সাথে উত্তরের যুদ্ধ ক্রমেই আমাদের অনুকূলে চলে আসছে। ফারাও আর তার রাজ্যের প্রতি কৃপাদৃষ্টি পড়েছে দেবতাদের।
একমাত্র অসন্তুষ্টি বলতে, প্রেমিক যুগলের মধ্যকার দূরত্ব এতো কাছাকাছি থাকার পরও যেনো আমাদের এই নদীবিধৌত উপত্যকার চেয়েও চওড়া। লসট্রিস ও ট্যানাস দু জনেই সুযোগ পেলে আমন রার ইন্দ্রজালে আমার দেখা ভবিষ্যদ্বানী নিয়ে কটাক্ষ করতো, যেনো ইন্দ্রজাল সত্যি করার দায়িত্ব আমারই। মিনমিন করে বোঝাতে চাইতাম, আমি ভবিষ্যতের ঘটনাবলির আয়না হতে পারি, কিন্তু নিয়তির বাও খেলার ঘুটি তো আমার নিয়ন্ত্রণাধীন নয়।
