বোঝাই যাচ্ছে, কোনো এক মরুঝড়ের সময়ে পেটে ধরেছিলে ওকে! আমার শুষ্ক স্বরে করা মন্তব্যে লসট্রিস হেসেই খুন। পরপরই অবশ্য মন খারাপ করে ফেললো সে।
ট্যানাস কখনো এমন মুহূর্তগুলোয় ভাগ বসাতে পারবে না। একবার ভেবে দেখেছো, মেমননকে এমনকি একবার কোলেও নেয়নি ও? আর পারবেও না কোনোদিন। আমার আবার কান্না পাচ্ছে, টাইটা।
নিজেকে প্রবোধ দাও, মিসট্রেস। কাঁদলে, বুকের দুধ নোনা হয়ে যাবে যে! মোটেও সত্যি নয় কথাটা, তবে কাজ হলো এতে। কান্না গিলে ফেললো লসট্রিস।
কোনো উপায় কী নেই, যাতে করে ট্যানাস বাচ্চাটাকে কাছে পেতে পারে?
কিছুসময় ভেবে নিয়ে একটা পরামর্শ দিলাম। শুনে খুশিতে চেঁচিয়ে উঠলো মিসট্রেস। যেনো আমার কথায় সায় দিতেই, আবারো বায়-ত্যাগ করে দিলো রাজকুমার।
ঠিক তার পরদিন যখন ফারাও তার পুত্র-সন্তানকে দেখতে এলেন, আমার পরামর্শ মতো কাজ শুরু করে দিলো লসট্রিস। প্রিয় স্বামী, রাজকুমার মেমননের আনুষ্ঠানিক শিক্ষক নিয়োগের ব্যাপারে কিছু ভেবেছেন কি?
প্রশ্রয়দানের ভঙ্গিতে হাসলেন ফারাও। আরে, ও তো এখনো শিশু। আগে হাঁটা চলা, কথাবার্তা শিখুক তো, তারপর না হয় অন্য কিছু শিখবে।
আমার মনে হয়, এখনি ওর শিক্ষক নিয়োগ দিলে ভালো হয়। এতে করে ও যেমন তাকে চিনতে শিখবে, তাঁরাও ওকে ভালো বুঝবেন।
ঠিক আছে, হেসে ছোট্ট রাজকুমারকে হাঁটুর উপর নিলেন রাজা। কাকে উপযুক্ত মনে হয় তোমার?
বিদ্যাশিক্ষার জন্যে আমাদের সেরা পণ্ডিতকে প্রয়োজন। এমন একজন, সকল বিজ্ঞান আর রহস্যে যার দখল আছে।
রাজার চোখজোড়া ঝিক করে উঠলো। এমন মাত্র একজনের কথাই আমার মনে আসছে, বলে, আমার উদ্দেশ্যে হাসলেন তিনি। বাচ্চা হওয়ার পর থেকে ফারাও-এর হাবভাব পাল্টে গেছে; মেমননের জন্মের পর থেকেই আমুদে হয়ে গেছেন তিনি। ক্ষণিকের জন্যে ভাবলাম, হয়তো চোখ টিপবেন তিনি, কিন্তু অতোটা বাড়াবাড়ি অবশ্য করলেন না।
এই প্রতিক্রিয়ায় একটুও ভ্রূক্ষেপ না করে রানি বলে চললো, রণ-কৌশলে পারদর্শী একজন যোদ্ধারও প্রয়োজন হবে আমাদের। ওকে লড়াইয়ের কৌশল শেখানো জন্যে। আমার মতে, তরুণ আর বীর কেউ হলে সবচেয়ে ভালো। বিশ্বাসী, সিংহাসনের প্রতি অনুরক্ত–এমন কেউ।
ওই পদের জন্যে কার নাম প্রস্তাব করছো তুমি, প্রিয়তমা? খুব কম সৈনিকেরই এমন গুণাবলি আছে। ফারাও-এর মনে কোনো দুরভিসন্ধি ছিলো বলে আমার মনে হয় না, কিন্তু আমার কর্ত্রী তো আর গর্দভ নয়। রাজকীয় ভঙ্গিমায় মাথা নেড়ে সে বললো, আপনি জ্ঞানী মানুষ, নিজের বাহিনীকে সম্যক চেনেন। আপনার সিদ্ধান্তই যথার্থ।
পরবর্তী রাজসভায় রাজকুমারের শিক্ষক নিয়োগ করলেন রাজা । ক্রীতদাস এবং চিকিৎসক টাইটার উপর ভার পড়লো রাজকুমারের বিদ্যাশিক্ষা দানের। এতে অবশ্য কেউই তেমন অবাক হলো না, কিন্তু ফারাও-এর পরবর্তী বক্তব্যে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেলো। অস্ত্রশিক্ষা এবং সমরকৌশলের জন্যে মিশরের সাহসী সিংহ, লর্ড হেরাবকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। অবশ্যই, যুদ্ধ বিরতিতে এই দায়িত্ব পালন করবেন লর্ড হেরাব।
নদীর ওপারের প্রাসাদে লসট্রিসের বাসস্থান নির্মাণ পর্যন্ত হারেম ছেড়ে রাজ উজিরের প্রাসাদে উঠেছে সে, ওর বাবার জন্যে আমার তৈরি করা জল-বাগানের কাছাকাছি একটা কক্ষে। রাজার প্রধান স্ত্রী এবং মহারানি পদমর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো সেটা। লসট্রিসের উপস্থিতিতে, জল-বাগানের বারাজ্জায় অনুষ্ঠিত হলো রাজকুমার মেমননের শিক্ষক নিয়োগ অনুষ্ঠান। মাঝে মধ্যেই ফারাও এবং উচ্চ-মর্যাদার সভাষদের আগমন ঘটতো ওখানে, কাজেই বেশ চাপের মুখেই রইলাম আমরা।
অবশ্য, মাঝেমধ্যেই দেখা যেতো কেবল আমরা চারজন উপস্থিত বারাজ্জায়। প্রথম এ ধরনের সুযোগ আসতেই বাবার কোলে রাজকুমারকে তুলে দিলো রানি। যে অনুপম আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিলো ট্যানাসের মুখ, যখন ছেলের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলো সে–তা ভুলার নয়। বাবার সামরিক পোশাকের সামনের অংশটা কামড়ে ধরে তাকে যেনো স্বাগত জানিয়েছিলো মেমনন।
সেই থেকে, ট্যানাস আমাদের সঙ্গে থাকলে রাজকুমারের বিশেষ কোনো পারদর্শিতা প্রদর্শনে ওকে উৎসাহিত করতাম আমরা। বুকের দুধ ছেড়ে প্রথম ট্যানাসের চামচ থেকেই খাবার খেলে মেমনন। অবশ্য, নতুন স্বাদে বিরক্ত হয়ে সাথে সাথেই মুখ বিকৃত করে তারস্বরে কান্না জুড়ে দিয়েছিলো সে। লসট্রিস যখন কোলে নিয়ে আবারো বুকের দুধে ওর মন ভরাতে চাইলো, মুগ্ধ বিস্ময়ে চেয়ে রইলো ট্যানাস। হঠাৎ করেই হাত বাড়িয়ে মেমননের মুখের ভেতর থেকে দুধের বৃন্ত সরিয়ে দিলো সে, এহেন সামরিক ব্যবহারে সাথে সাথেই আবার কান্না জুড়ে দিলো রাজকুমার। ওদিকে চমকে উঠলাম আমি। যদি এই মুহূর্তে রাজা এখানে প্রবেশ করে এই চিত্র দেখতেন, তার প্রতিক্রিয়া কী হতো সহজেই অনুমেয়।
আমি বাধা দিয়ে উঠতেই মিসট্রেস বলে উঠলো, বৃদ্ধা মহিলাদের মতো আচরণ করো না, টাইটা। আমরা তো কেবল নির্দোষ মজা করছিলাম।
মজা–ঠিক আছে, কিন্তু নির্দোষ কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে বটে, বিড়বিড় করে বললাম। পরস্পরের ছোঁয়ায় ওদের মুখের জ্যোতি আমি লক্ষ্য করেছি। জানি, নিজেদের বেশিদিন ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না ওরা, এমনকি ট্যানাসের দায়িত্ববোধ আর রাজার প্রতি সম্মানও এর জন্যে যথেষ্ট নয়।
