লসট্রিসের প্রশ্নের জবাবে একযোগে চেঁচিয়ে উঠে রাজবধুরা।
ছেলে! জয় হোক মেমননের! মিশরের রাজকুমারের জয় হোক!
কথা বলতে পারছিলাম না আমি। শুধু যে রাজকীয় সূত্র আমার চোখে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছিলো, তা নয়, স্বস্তি আর খুশির কান্না কাঁদছিলাম। ওদিকে, চেঁচিয়ে কেঁদে উঠলো মেমনন-রাগে যেনো ফেটে পড়ছে!
হাত-পা নেড়ে এতো জোরে লাথি কষালো ও, আর একটু হলে আমার হাত ফসকে পড়ে গিয়েছিলো। দৃষ্টি পরিষ্কার হতে একমাথা গাঢ় চুলের, শক্তপোক্ত, গর্বিত মস্তকের ছোট্ট শরীরটা দেখলাম প্রাণ ভরে।
*
উত্তরসূরি প্রাপ্তির গর্বে, আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন ফারাও। নবজাতকের সম্মানে মুক্ত ভোজের আয়োজন করলেন তিনি। পুরো এক রাত জুড়ে নেচে গেয়ে উৎসব করলো উচ্চ-মিশরের প্রতিটি জনতা। ফারাও-এর দেওয়া মাংস আর মদে ডুবে থেকে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ জানালো রাজকুমার মেমননকে। এমননিতেও লসট্রিসকে দারুন ভালোবাসতো তারা, তাই রাজকুমারের প্রতি তাদের অনুভূতি ছিলো স্বতস্ফূর্ত।
এতো তরুণী আর শক্ত মনের ছিলো আমার কর্ত্রী, অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই ছোট্ট শিশু মেমননকে বুকে নিয়ে জনতার সামনে এলো সে। রাজার নিম্নবর্তী সিংহাসনে উপবিষ্ট লসট্রিসকে সত্যিই অপরূপ দেখাচ্ছিলো। যখন বাচ্চা কোলে নিয়ে একটা দুধের বোঁটা এগিয়ে দিলো সে, ছোট্ট রাজকুমার মুখে নিতে চাইলো ওটা। এতো জোরে আওয়াজ করে উঠলো আনান্দাচ্ছল জনতা, থুতু মেরে মুখ সরিয়ে নিয়ে ভীষণ চিৎকার জুড়ে দিলো সে। সাথে সাথে নিজেদের বুকে রাজকুমারকে জায়গা দিয়ে দিলো উপস্থিত জনতা।
সে একটা সিংহ, তারা ঘোষণা করলো। যোদ্ধা আর রাজার রক্ত বইছে ওর শরীরে!
অবশেষে, মাতৃদুগ্ধ মুখে নিয়ে যখন শান্ত হলো রাজকুমার, উঠে দাঁড়িয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন ফারাও।
এই শিশুকে নিজের পুত্র, এবং আমার বংশধারার সরাসরি উত্তরাধিকারী হিসেবে গ্রহণ করলাম। এ হলো আমার প্রথম পুত্রসন্তান, আমার পরবর্তী ফারাও। সমস্ত মহৎপ্রাণ, রাজবধুদের সামনে আমি রাজকুমার মেমননের অভিভাবকত্ব স্বীকার করছি।
জনতার গগনবিদারী হর্ষোধ্বনি যেনো থামবেই না।
এসব কিছুর সময়ে অন্যান্য চাকর এবং দাসদের সঙ্গে সভার উপরের দর্শনার্থীস্থানে ছিলাম আমি। ঘাড় ঘুরিয়ে ট্যানাসের লম্বা অবয়ব আবিষ্কার করলাম ভীড়ের মাঝে। নেমবেট এবং আরো কয়েকজনের সঙ্গে সিংহাসনের নিচে তৃতীয় সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলো সে। অন্য সবার মতোই হর্ষোধ্বনিতে মুখরিত হচ্ছিলো, কিন্তু ওর চওড়া, খোলা মুখের অনুভূতি ছিলো বানোয়াট। তারই পুত্র অপর একজনের অভিভাবকত্বে চলে যাচ্ছে, অথচ এটা প্রমাণ করার কোনো উপায় নেই ওর। এমনকি, আমি যে ট্যানাসকে সবেচেয়ে ভালো জানি পর্যন্ত অনুভব করতে পারছিলাম না কতোটা কষ্ট বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো ও সেদিন।
এবারে, সবার নীরবতা কামনা করলেন রাজা, শোরগোল কমে আসতে আবারো মুখ খুললেন তিনি, রাজকুমারের মা, লেডি লসট্রিসকে আমার অভিনন্দন। হে আমার প্রাণপ্রিয় জনতা, তোমরা জেনে রাখো, সে আমার সিংহাসনের অত্যন্ত নিকটজন। আজকের দিন থেকে লসট্রিস, আমার জ্যেষ্ঠ স্ত্রীর মর্যাদায় আসীন। তাকে এখন থেকে রাণী লসট্রিস নামে অভিহিত করা হবে। পদমর্যাদায় স্বয়ং ফারাও এবং রাজকুমারের পরেই তার অবস্থান। এতদ্বারা আমি ফারাও আরো ঘোষণা করছি, রাজকুমার সাবালক হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আমার অবর্তমানে, অথবা অসুস্থ অবস্থায় রাণী লসট্রিস সমস্ত শাসনক্ষমতার কর্ত্রী হিসেবে পরিগণিত হবে।
উচ্চ-রাজ্যে এমন কেউ নেই যে লসট্রিসকে ভালোবাসে না; শুধুমাত্র রাজার বয়োজ্যেষ্ঠ স্ত্রীরা ছাড়া, যারা তাকে ছেলেসন্তানের উত্তরাধিকারী দিতে পারেনি। তারা ছাড়া আর সবাই উদ্বেলিত হলো এমন ঘোষণায়।
ফারাও-এর উত্তরাধিকারীর নাম নির্বাচনের অনুষ্ঠানের জন্যে সভাস্থল ত্যাগ করলো রাজকীয় পরিবার। প্রাসাদের মূল সভাকক্ষে রাজকীয় স্লেজে চড়লেন ফারাও; তাঁর পাশে রাণী লসট্রিস বসলো রাজকুমারকে কোলে নিয়ে। সাদা রঙের ষাঁড়ের একটি দল রামজি আভেন্য ধরে জেটা টেনে নিয়ে চললো ওসিরিসের মন্দিরে। ওখানে দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলিদান করবেন রাজা। থিবেসের হাজারো জনতা পবিত্র এই আভেন্যুর দুই পাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানালো। ফারাও, তার স্ত্রী এবং রাজকুমারের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করলো তারা গগনবিদারী হুঙ্কারে।
সেই রাতে যখন লসট্রিস আর ওর শিশুপুত্রের সান্নিধ্যে ছিলাম, ও ফিসফিস করে বললো, টাইটা, ভীড়ের মধ্যে ট্যানাসকে দেখেছিলে? দুঃখ আর সুখের একটি মিশ্র দিন ছিলো এটা। ভীষণ কান্না পাচ্ছিলো আমার প্রিয়তমের জন্যে। কী লম্বা আর সাহসী ওআর, আর নিজের সন্তানকে অন্যের হতে দেখতে হলো তাকে! ইচ্ছে করছিলো, সটান দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলি, এই পুত্রসন্তান, ট্যানাস, লর্ড হেরাবের।
আমাদের সবার জন্যেই আমি আনন্দিত; অন্তত একবারের জন্যে হলেও নিজের বড়ো জীভটাকে সামলে রাখতে পেরেছিলে, মহারাণী।
খিলখিল হাসিতে ভেঙে পড়ে লসট্রিস এই কথায়। কী অদ্ভুত কী বললে যেনো মহারাণী! নিজেকে কেমন প্রকাণ্ড মনে হলো! এক বুক থেকে থেকে অপর বুকে শিশু মেমননকে স্থানান্তর করলো ও। এই নড়াচড়ায় বিকট শব্দে বায়ু নির্গমন করে দিলো মেমনন।
