লসট্রিসের খাবার নিয়ে বিশেষ সতর্ক থাকলাম, এক বিন্দু মদও মুখে তুলতে দিলাম না ওকে। তাজা ফলমূল, শাক-সবজি খেতে দিয়ে সমস্ত চর্বিযুক্ত খাবার বর্জন করলাম। জানি, ওতে করে পেটের বাচ্চাটা থলথলে হবে। নিজ হাতে ওর খাবার প্রস্তুত করতাম আমি, প্রতিরাতে শোবার আগে বিশেষ শক্তি বর্ধক মিশ্রণ খাইয়ে দিতাম–এতে করে পেটের শিশু আরো শক্ত হবে।
যখনই লসট্রিস ঘোষণা করলো, গ্যাজেলের যকৃত এবং বৃক্ক থেকে তৈরি পায়া খাবে সে; অথবা কাঠ বেড়ালীর ঝলসানো মাংস তার মনে ধরেছে, সাথে সাথে একশ শিকারী পাঠিয়ে মরু থেকে ওসব আনার বন্দোবস্ত করলেন ফারাও। ট্যানাসকে অবশ্য লসট্রিসের এ ধরনের বিচিত্র খায়েশের কথা বলিনি আমি, সেক্ষেত্রে হয়তো ভুয়া ফারাও-এর সাথে যুদ্ধ ফেলে রেখে গ্যাজেল শিকারে রওনা হতো উত্তরের বাহিনী।
ওর বাচ্চা হওয়ার সময়কাল এগিয়ে আসতে চিন্তায় রাত জেগে কাটালাম আমি। রাজকুমার জন্মানোর প্রতিশ্রুতি করেছি ফারাওকে; কিন্তু এতো দ্রুত পুত্রের জন্মের আশা করছেন না তিনি। এমনকি, একজন দেবতার পর্যন্ত ওসিরিসের উৎসবের সময়কাল থেকে এখন পর্যন্ত দিনক্ষণ হিসেব করতে পারার কথা। যদি, ছেলে না হয়ে মেয়ে হয়, কিছুই করবার নেই আমার; কিন্তু অন্তত তাড়াতাড়ি সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার ব্যাপারে তাকে প্রস্তুত রাখতে তো পারি।
ইদানীং গর্ভাবস্থা এবং সন্তান জন্মদানের প্রক্রিয়া নিয়ে ফারাও-এর উৎসাহ, মন্দির আর সমাধি নিয়ে মাতামাতিকে ছাড়িয়ে যেতে বসেছে। প্রায় প্রতিদিন তাঁকে অভয় দিয়ে আমাকে বলতে হলো, লসট্রিসের সরু কোমর, সন্তান জন্মানোর পথে কোনো অন্তরায় নয়। এবং, ওর কম বয়স আসলে সন্তান ভূমিষ্ঠের জন্যে উপযোগী।
এই সুযোগে তাকে জানিয়ে রাখলাম, পৃথিবীর তাবৎ বিখ্যাত যোদ্ধা, মহান বীরদের জন্ম সময়ের আগেই হয়েছিলো।
আমার মনে হয়, ম্যাজেস্টি, এ অনেকটা অলস লোকের মতো যারা বহুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থেকে শক্তি, সময়ের অপচয় করে; অন্যদিকে মহান মানুষ মাত্রেই আগে ঘুম ভেঙে উঠেন। আমি লক্ষ্য করেছি, মহান ফারাও, আপনি সূর্যোদয়ের আগেই বিছানা ছাড়েন। কোনো সন্দেহ নেই, আপনি নিজেও সময়ের আগেই পৃথিবীতে চলে এসেছিলেন। আমি অবশ্য জানতাম, ফারাও মোটেও সময়ের আগে জন্মাননি, কিন্তু কিছু বললেন না তিনি। যদি আপনার পুত্র তার পবিত্র পিতাকে অনুকরণ করে একটু আগেই পৃথিবীতে চলে আসে তবে বুঝতে হবে, ওর উপর দেবতাদের আশীর্বাদ রয়েছে। আশা করছি, আমার এই বাগাড়ম্বরে কাজ হয়েছে, কেননা সন্তুষ্ট চিত্তে মাথা দোলালেন ফারাও।
শেষমেষ অবশ্য নির্ধারিত সময়ের পরও দুই সপ্তাহ মায়ের পেটে থেকে আমার কাজ সহজ করে দিলো বাচ্চাটা, আমিও তাড়াতাড়ি ওকে পৃথিবীর আলো দেখানোর কোনো চেষ্টাই করলাম না। এখন, প্রত্যাশিত সময়ের এতো কাছাকাছি চলে এসেছে জন্মক্ষণ, কারো রা করার উপায়টি নেই। অবশ্য, ফারাও-এর কাছে সময়ের আগে জন্মানো বরঞ্চ কাঙ্ক্ষিত হয়ে পড়েছিলো।
এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে আমার কর্ত্রীর গর্ভযন্ত্রণা শুরু হলো সবচেয়ে অদ্ভুত সময়ে। রাতের তৃতীয় প্রহরে পানি ভাঙলো ওর। আমার কাজ সহজ করার মতো কিছু কখনো করেনি সে, এবারেও তার ব্যত্যয় ঘটবে কেনো? এতে করে অবশ্য ওই নোংরা ধাত্রীগুলোর সাহায্য না নেওয়ার উপযুক্ত কারণ পেয়ে গেলাম আমি।
ঘুম ভেঙে জেগে উঠে, গরম মদে হাত ধুয়ে আমার যন্ত্রপাতিগুলো আগুনে শুকিয়ে নিলাম; এই সময় গুঙিয়ে উঠে আমুদে স্বরে লসট্রিস জানালো, একবার একটু দেখো তো, টাইটা। আমার মনে হয়, কিছু একটা ঘটছে ওখানে। একবার তাকিয়েই চেঁচিয়ে দাসী মেয়েগুলোকে ডাকলাম আমি।
তাড়তাড়ি যাও, অলস শয়তানের দল! রাজবধুদের ডেকে নিয়ে এসো!
কোন্ জন?
যে কোনো একজনকে! সবাইকে! যদি জন্মদান প্রক্রিয়া না দেখা হয়, তবে কোনো রাজকুমারই দ্বৈত-মুকুটের উত্তরাধিকার পাবে না।
প্রথমবারের মতো নিজেকে প্রদর্শন করলো শিশুটা, ঠিক এমন সময়ে এলো রাজবধুদের দল। দারুন ব্যথায় মোচড় খেয়ে উঠলো লসট্রিস, মাথা দেখা গেলো বাচ্চার। আমি ভয় করছিলাম, আগুনে-লাল রঙের চুলে মাথা ভরা থাকবে ওর; কিন্তু বাদামি রঙের ঘন চুল দেখে আশ্বস্ত হলাম। পরে অবশ্য, ওগুলোর ডগা থেকে লাল আগুন ঠিকই দেখা দিয়েছিলো কিন্তু সে অনেক পরের কথা।
চাপ দাও! লসট্রিসকে বললাম, জোরে! প্রচণ্ড ব্যথায় দাঁতে দাঁত চেপে সাড়া দেয় সে। ওর কোমরের তরুণ হাড় ফাঁক হয়ে গিয়ে পথ করে দেয় নবজাতককে; পিচ্ছিলকারক যথেষ্ট তরল অবশ্য ছিলো ওখানে। একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থায় আমার হাতে চলে এলো শিশুটা। গুলতি থেকে ছুটে আসা পাথর খণ্ডের মতো গতিতে আমার হাতে এসে পড়লো ওটা, আর একটু হলে পড়ে গিয়েছিলো পিছলে।
বাচ্চাটাকে ঠিকমতো ধরার আগেই কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে মাথা উঁচালো লসট্রিস, ঘামে ভিজে মাথার সাথে লেপ্টে গেছে মাথার চুল; মুখাবয়বে দারুন উৎকণ্ঠা । ওটা কী ছেলে? বলো আমাকে।
আমাদের পৃথিবীতে নবজাতকের প্রথম কর্ম সম্পাদনের সময় ঝুঁকে এলো কক্ষভর্তি মহিলারা। আমার কড়ে আঙুলের সমান পুরুষাঙ্গ থেকে প্রায় ছাদ ছুঁয়ে দেওয়া ঝর্ণাধারা ছুঁড়ে দিলো রাজকুমার মেমনন ওই নামধারী প্রথম ফারাও। মৃদু গরম সেই জলধারার পথে পড়লাম আমি, একেবারে ভিজে গেলো মুখ।
