অন্য সমস্ত ক্ষেত্রে তার ইচ্ছেমতো হয়েছিলো সব কিছু। একবার, ট্যানাস যখন মিশরীয় নৌবাহিনীর বিন্যাস নিয়ে রাজার সাথে কথা বলছিলো, লসট্রিস উপস্থিত ছিলো সেখানে। ট্যানাসের বক্তব্য শেষ হওয়া পর্যন্ত পর্দার অন্তরালেই রইলো সে; অবশেষে, ট্যানাস চলে যেতে নরম স্বরে মন্তব্য করলো, আমি শুনেছি, আমাদের সেনাপতিদের মধ্যে ট্যানাস শ্রেষ্ঠ বীর। তাকে মিশরের সাহসী সিংহ উপাধিতে ভূষিত করে উত্তর বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত করাটা কি যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন, মহান ফারাও? আবারো, তার এহেন বাড়াবাড়ি মন্তব্যে শ্বাস আটকে ফেললাম আমি। ফারাও অবশ্য চিন্তাযুক্তভাবে মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
একই কথা আমার চিন্তাতেও এসেছে, প্রিয়তমা। যদিও এমন গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য তার বয়সটা বেশি কম হয়ে যায়।
পরদিন, রাজসভায় ডেকে পাঠানো হলো ট্যানাসকে। সেই দিনই, মিশরের সাহসী সিংহ উপাধি এবং উত্তর মিশরীয় বাহিনীর প্রধান নির্বাচিত হলো সে। তার পূর্ববর্তী বৃদ্ধ সেনাপ্রধানকে উপযুক্ত সম্মান এবং ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করে অব্যহতি দেওয়া হলো। এখন ট্যানাসের কতৃত্বে রয়েছে তিনশো যুদ্ধ গ্যালি আর প্রায় ত্রিশ হাজার যোদ্ধা। এই পদোন্নতির ফলে নেমবেট এবং আর কয়েকজন মাত্র বৃদ্ধ সেনাপতির পরেই রইলো ট্যানাসের অবস্থান।
লর্ড ট্যানাস একজন গর্বিত মানুষ, লসট্রিস জানালো আমাকে, যেনো আমি তাকে চিনিই না। তার পদোন্নতির পেছনে আমার হাত আছে–এ কথা যদি কখনো তাকে বললো তুমি, সাথে সাথেই প্রথম সিরিয় বণিকের কাছে তোমাকে বিক্রি করে দেবো খন!
এই সময়ে প্রায় প্রতি দিনই একসময়ের মসৃণ, সুন্দর পেটটা বড়ো হতে লাগলো লসট্রিসের। অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো এর খবরও প্রতিদিন শুধু ফারাওকে নয়, উত্তর মিশরীয় বাহিনীর প্রধানকেও জানাতে হলো আমাকে।
*
ফারাও-এর নির্দেশের পাঁচ সপ্তাহের মধ্যে মেমনন প্রাসাদের নির্মাণকাজ আরম্ভ করলাম আমি। এতোটা সময় চূড়ান্ত নকশা তৈরির জন্যে ব্যয় হলো। রাজা এবং আমার কর্ত্রী দু জনেই এক বাক্যে স্বীকার গেলো, আমার নকশা তাদের প্রত্যাশার চাইতেও ভালো হয়েছে। মিশরের বুকে এটাই হবে শ্রেষ্ঠ বাসস্থান।
যেদিন কাজ শুরু হলো, সেদিনই লাল-ফারাও-এর বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে উত্তর থেকে আসা জাহাজ নোঙর করলো থিবেসে। বিব্লস থেকে সিডার কাঠ নিয়ে এসেছে ওটা। জাহাজের অধিনায়ক আমার বন্ধু মানুষ; সে জানালো তার কাছে নাকি আমার জন্যে খবর আছে।
প্রথমত, সে বললো, ইনটেফকে গাঁজায় দেখা গেছে। বহু দেহরক্ষি সমেত পুবের উদ্দেশ্যে চলছিলেন তিনি। নিঃসন্দেহে সেক্ষেত্রে সিনাই মরু পাড়ি দিতে সক্ষম হয়েছেন; অথবা, নীল নদের মুখ বরাবর সামনে এগোনোর জন্যে কোনো জাহাজের সাহায্য পেয়েছিলেন, সাগরের তীর ঘেঁষে এরপর পুবে এগিয়েছেন।
আরো কিছু খবর ছিলো জাহাজীর কাছে, যা সেই মুহূর্তে খুব একটা গুরুত্ববহ মনে হয়নি; কিন্তু আমাদের এই মিশর এবং যারা নীল নদের তীরে এই দেশে বাস করে, তাদের সবার ভাগ্য পাল্টে দিয়েছিলো সেই সংবাদ। উড়ো সংবাদে জানা গেছে, সিরিয়ার পূবে কোনো এক অজানা স্থান থেকে যুদ্ধবাজ একটা গোত্র মিশরের দিকে আসছে। কেউই এদের সম্পর্কে সঠিক করে কিছু বলতে পারলো না; তবে তারা নাকি বিশেষ এক ধরনের যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করেছে, যা আগে কেউ কখনো দেখেনি। বিশাল দূরত্বে এক লহমায় পেরিয়ে যেতে পারে তারা, পৃথিবীর কোনো সেনাবাহিনী তাদের বিরুদ্ধে কিছুই নয়।
আমাদের মিশরে এ ধরনের গুজবের খুব প্রচলন ছিলো, সব সময়ই কোনো না কোনো বাহিনীর আক্রমণের কথা শুনে আসতাম আমরা। এর আগেও প্রায় পঞ্চাশবার এর ধরনের কথা শুনেছি আমি–একটুও পাত্তা দিলাম না। তবে, সেই জাহাজী অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য লোক ছিলো, তাই পরবর্তী সাক্ষাতে এই সংবাদটা ট্যানাসকে জানালাম আমি।
কোনো বাহিনীই এই রহস্যময় দলের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না? ট্যানাস হাসে। আমার যোদ্ধাদের সাথে লেগে দেখুক, পরাজয়ের স্বাদ নিতে দেরি হবে না। কি বললে, কী নাম এদের?
শোনা যায়, তারা নাকি নিজেদের রাখাল-রাজা বলে ডাকে, উত্তরে আমি বললাম। হিকসস্। যদি তখন আমি বুঝতাম, আমার উচ্চারিত ওই শব্দ পুরো পৃথিবীকে নাড়া দেবে, তবে হয়তো অতোটা সহজভাবে উচ্চারণ করতাম না।
রাখাল, হুম? ঠিক আছে, আমার যোদ্ধারা এতো সহজে চড়াবার মতো কোনো জন্তু নয়। এ বিষয়ে শেষ কথা বলে দিয়ে ইনটেফের খবরে আগ্রহ দেখালো ট্যানাস। যদি তার অবস্থানের সঠিক খোঁজ-খবর পেতাম, লোক পাঠিয়ে ধরে এনে বিচারের মুখোমুখি করা যেতো। আজকাল মনে হয়, বাবার আত্মা আমার সঙ্গে আছে। তার হয়ে প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত আমার শান্তি নেই।
এতো সহজ নয়, মাথা নেড়ে বললাম, মরুর শেয়ালের মতোই ধূর্ত ইনটেফ। আমার মনে হয়, মিশরে আর কখনো তার টিকিটিরও দেখা মিলবে না। জানি না, আমার এই কথায় হয়তো অন্ধকারের দেবতারা মুচকি হেসেছিলেন তখন।
*
আমার কর্ত্রীর গর্ভাবস্থা এগিয়ে যেতে ওর স্বাধীন চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলাম আমি। হাসপাতাল বা আশ্রমগুলোতে ওর যাওয়া বন্ধ করতে হলো, পাছে অনাগত সন্তানের নাজুক শরীরে কোনো অসুখ ছড়িয়ে পরে। রাজ-উজিরের জন্যে জলবাগানে যে বারাঙ্খা তৈরি করেছিলাম, দিনের গরমের সময়টাতে ওখানে বিশ্রাম নিতে বললাম লসট্রিসকে। এ ধরনের অলস জীবনযাত্রায় ও বিরক্ত হয়ে যেতে বাদকদল পাঠিয়ে দিলেন ফারাও; বাগানে সুর বাজিয়ে লসট্রিসের মনোরঞ্জনে ব্যাপৃত হলো তারা। মেমননের প্রাসাদের নির্মাণ কাজ ফেলে রেখে আমাকে সারাদিন ওর পাশে বসে থাকতে হলো; গল্প-কথা, ট্যানাসের সর্বশেষ বীরত্ব ইত্যাদি নানান বিষয়ে তার আগ্রহের কোনো শেষ নেই।
