লসট্রিস তোমার সন্তার বহন করছে পেটে। ও পাঠিয়েছে আমাকে, তুমিই প্রথম ব্যক্তি যে এই কথা জানলো, এমনকি রাজারও আগে। মুখ খুলে শ্বাস নিলাম আমি। এবারে ছাড়ো আমাকে! না হয় মরে যেতে পারি! হঠাৎই ছেড়ে দিতে আর একটু হলে পড়ে গিয়েছিলাম।
আমার সন্তান! আমার ছেলে! ফুঁপিয়ে উঠলো ট্যানাস। কী আশ্চর্য, ওরা দু জনেই জন্মের আগেই সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় সম্পর্কে এতোটা নিশ্চিত ছিলো! এ যে অত্যাশ্চর্য ঘটনা! হোরাসের উপহার ও!
আমার ছেলে! বোকার মতো হাসছিলো সে। আমার নারী আর আমার ছেলে। এখনি ওর কাছে যাবো আমি! পাটাতন ধরে রওনা হলো সে, দৌড়ে পেছন থেকে গিয়ে ধরলাম। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আটকে রাখলাম ওকে, না হয়, একছুটে প্রাসাদের হারেমে গিয়ে থামতো। শেষমেষ, ট্যানাস শান্ত হতে বন্দরের কাছেই একটা পানশালায় গেলাম দুজনে। আগে থেকেই নীল বাহিনীর বেশ কিছু সদস্য ছিলো সেখানে, তাদের সবাইকে মুফতে পানাহারের ঘোষণা করলো ট্যানাস।
মদ্য পান শেষ হতে সরাসরি প্রাসাদে চললাম আমি। আমাকে দেখে যার-পর নাই আনন্দিত হলেন ফারাও। এখনি তোমাকে খুঁজতে লোক পাঠাচ্ছিলাম, টাইটা। আমার ধারণা, সমাধি-মন্দিরের দরোজাটা একটু রাজকীয় হলে ভালো হয়
ফারাও! চেঁচিয়ে উঠলাম আমি। মহান, পবিত্র মিশর! দারুন সুখবর আছে আমার কাছে! দেবী আইসিস তার প্রতিজ্ঞা রেখেছেন! আপনার বংশধারা চির অমর। আমন রার ইন্দ্রজাল সত্যি হতে চলেছে। আমার কর্ত্রীর রজঃচক্র মিশরীয় সঁড়ের খুঁড়ের ঘায়ে বন্ধ হয়ে গেছে। তার পেটে এখন আপনারই সন্তান!
অন্তত একবারের জন্যে হলেও সমাধি-মন্দিরের সমস্ত চিন্তা ফারাও-এর মন থেকে সরে গেলো। ঠিক ট্যানাসের মতোই, তার প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিলো লসট্রিসের কাছে ছুটে যাওয়ার। রাজার নেতৃত্বে প্রাসাদের গলিপথ ধরে ছুটলাম আমরা; সভাষদ, মহপ্রাণ সবাই যেনো নীলের অপ্রতিরোধ্য এল-প্রবাহের মতো ছুটছি। হারেমের বাগানে অপেক্ষায় ছিলো লসট্রিস। নারী চরিত্রের ধূর্ততার পরিচয় দিয়ে দারুন সুন্দর করে সেজেছে সে। চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে ফুলের সমারোহ; তারই মাঝে উঁচু একটা ঢিবিতে বসেছিলো ও, পেছনে চিরবহতা নীল নদ। একবার মনে হলো, রাজা হয়তো ঝুঁকে আদর করবেন ওকে, কিন্তু এমনকি অমরত্বের হাতছানিও তাকে তার মর্যাদা ভুলিয়ে দিলো না।
বদলে, শুভেচ্ছা আর প্রশংসার বন্যায় তাকে ভাসিয়ে দিলেন ফারাও। খুব করে খোঁঝ-খবর করলেন তার স্বাস্থ্যের। সর্বক্ষণ তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রইলো লসট্রিসের পেটে, যেখানে লুকিয়ে আছে তার অমরত্বের চিহ্ন। যাওয়ার আগে জানতে চাইলেন, প্রিয়, নিজের সুখের জন্যে আর কিছু কি আছে, যা তোমার প্রয়োজন? এই সময়ে তোমার স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যে কিছু কী করার আছে আমার?
আবারো, আমার কর্ত্রীর জন্যে গর্বে ভরে গেলো বুকের ভেতরটা। মূলত, তার সময়জ্ঞান এতো প্রখর ছিলো, ইচ্ছে করলেই বিজ্ঞ সমরনায়ক না হয় শস্য-বণিক হতে পারতো ও। সম্মানিত ফারাও, বললো লসট্রিস, থিবেস আমার জন্মের স্থান। মিশরের আর কোথাও এতোটা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য পাই না, যতোটা এখানে পাই। আপনার উদারতা আর বিচক্ষণতার প্রতি আমার আস্থা আছে; আমি চাই আপনার সন্তান এই থিবেসেই জন্ম নিক। দয়া করে গজ-দ্বীপে ফিরে যেতে বলবেন না আমাকে।
শ্বাস আটকে ফেললাম আমি। এক শহর থেকে অন্য শহরে পুরো রাজসভা পরিবর্তন কোনো চাট্টিখানি কথা নয়। মাত্র ষোলো বছর বয়সী কোনো নারীর অনুরোধে এমনটি ঘটে না প্রতিদিন।
এমন অনুরোধে যেনো বিস্ময়াভূত হয়ে পড়লেন রাজা; কিছু সময় নকল দাড়িতে হাত চালালেন। তুমি থিবেসে বসবাস করতে চাও? ঠিক আছে, তবে তাই হোক! এখন থেকে রাজসভা থিবেসে বোসবে! এরপর আমার দিকে ফিরলেন ফারাও। টাইটা, নতুন একটি প্রাসাদের নকশা করো। মিসট্রেসের দিকে ফিরে যোগ করলেন, পশ্চিম তীরে হলে কেমন হয়, প্রিয়তমা? নদীর ওপারে আঙুল তুলে নির্দেশ করলেন তিনি।
মাথা নেড়ে সায় দেয় লসট্রিস।
তাহলে পশ্চিম তীরেই হবে প্রাসাদ। টাইটা, নকশা যেনো অসাধারণ হয়। ফারাও-এর পুত্রের বাসস্থান যেনোতেনো ভাবে করলে হবে না। আমি ওর নাম দিলাম মেমনন–প্রভাতের শাসক! ওই প্রাসাদ হবে মেমননের প্রাসাদ।
এইভাবেই, সামান্য দু একটি কথায় আমার উপর গুরুদায়িত্ব চাপিয়ে দিলো লসট্রিস। পেটের বাচ্চার দোহাই দিয়ে সেই থেকে এটা-ওটা নানান কিছু রাজার কাছে আবদার করে হাসিল করতো সে। এরপর থেকে লসট্রিসের কোনো ইচ্ছেতেই অমত করেননি ফারাও; তা সে ওর প্রিয়জনকে সম্মানিত পদ বা উপাধি দেওয়া হোক বা ওর আশ্রয়ে থাকা কাউকে আর্থিক সাহায্য প্রদানই হোক। দুষ্ট কোনো বাচ্চার মতোই নিজের এই হঠাৎ পাওয়া ক্ষমতার পরিধি পরীক্ষা করে দেখছিলো সে।
কখনো তুষার দেখেনি লসট্রিস। অবশ্য, আমার ফিকে হয়ে আসা স্মৃতি থেকে এ সম্পর্কে শুনছে সে। পাহাড়ি এলাকায় জন্মেছিলাম আমি। তো, নীলের তপ্ত উপত্যকায় গরমে অতিষ্ট হয়ে তুষারের ঠাণ্ডা অনুভব করার খায়েশ হলো লসট্রিসের। সাথে সাথেই বিশেষ একটি শরীর কসরৎ প্রতিযোগিতার আয়োজন করলেন ফারাও। উচ্চ-রাজ্যের দ্রুততম একশ দৌড়বিদ অংশগ্রহণ করবে সেই প্রতিযোগীতায়। আমার নকশা করা একটি বিশেষ বাক্সে করে সেই সিরিয়া থেকে তুষার নিয়ে আসতে হবে তাদের। সম্ভবত লসট্রিসের অপূর্ণ মনোবাঞ্ছণা কেবল এটিই ছিলো, কেননা, সেই দূর দূরান্ত থেকে যখন ফিরে এলো তারা বাক্সে কেবল সামান্য ভেজা ভাব ছাড়া আর কিছুই নেই।
