আমার কর্ত্রীকে ট্যানাসের এহেন বাড়াবাড়ির কথা বলতেই, দারুন উৎসাহিত হয়ে নিজের হাজার ডেবেন অর্থ ব্যয় করে বিভিন্ন ভবনে গরিবের জন্যে আশ্রয়কেন্দ্র আর হাসপাতাল নির্মাণে লেগে পড়লো সেও। যতোই বললাম, এ ঠিক হচ্ছে না, পাত্তাই দিলো না লসট্রিস।
বলার অপেক্ষা রাখে না, কীর এই নতুন পাগলামী পালন করার জন্যে ছুটোছুটির বেশিরভাগটাই করতে হলো দাস টাইটাকে; অবশ্য লসট্রিস নিজে প্রতিদিন পরিদর্শন করতো এই আশ্রয়কেন্দ্রগুলো। কাজেই, থিবেসের কোনো ভিক্ষুক, মাতালের জন্যে একবেলা ভালো আহার করা কোনো ব্যাপারই ছিলো না সেই সময়ে। আর, অনেক সময় তো আমার কী নিজ হাতে আহার, পানীয় বিলাতেন। অসুস্থ লোকগুলোর পঁচা ক্ষত চিকিৎসায় আমাদের এই মিশরের সেরা চিকিৎসক তার হাত লাগালো।
এমন কয়েকজন লিপিকার আর পুরোহিতের খোঁজ পেলাম আমি, যারা টাকা বা দেবতাদের চেয়ে মানুষকে বেশি ভালোবাসেন। তাদেরকে চাকরিতে নিয়ে নিলো আমার কর্ত্রী। রাতে, শহরের গলি-ঘুপচি আর পথে পথে ঘুরে ফিরতাম আমরা, রাস্তার এতিম ছেলেমেয়েদের কুড়িয়ে নিতাম। বন্য বেড়ালের মতোই আঁচড়ে-কামড়ে তবেই আমাদের সাথে আসতে সম্মত হলো তারা।
আমার কর্ত্রীর নতুন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর একটিতে রাখার বন্দোবস্ত করা হলো তাদের। ওখানে, পুরোহিতেরা ধৈর্য্যের সাথে শিক্ষাদানে নিয়োজিত হলেন। লিপিকারেরা শেখাতে লাগলেন পড়াশোনার প্রথম পাঠ। বেশিরভাগ শিশুই পাঁচদিনের মধ্যে পালিয়ে গেলো; নিজেদের দুর্গন্ধময় আস্তাকুঁড় তাদের কাছে বড়ো বেশি আরাধ্য। কিন্তু কিছু ছেলেমেয়ে রয়ে গেলো। প্রায় জন্তু থেকে মানুষে ধীরে উত্তরণ ঘটতে লাগলো তাদের; দারুন আনন্দে যেনো পাগল হয়ে গেলো লসট্রিস।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বিধবা আর পঙ্গু লোকগুলো হাত তুলে আমার মিসট্রেসকে আশীর্বাদ করতো। বুনো ফুল, সস্তা রুটি, ছেঁড়া প্যাপিরাসে মৃতের পুস্তক থেকে বিভিন্ন উদ্ধৃতি লিখে তাকে উপহার হিসেবে দিতো তারা। যখন হেঁটে যেতো লসট্রিস, সার বেঁধে দাঁড়িয়ে ওর ছোঁয়া পেতে চাইতো তারা; যেনো একটু ছোঁয়া তাদের সমস্ত দুঃখ-কষ্ট দূর করে দেবে। ময়লা শিশুদের চুমো খেতো সে, আমি সতর্ক করে দিয়েছিলাম, ওটা স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর; তামার মুদ্রা বৃষ্টির মতো বর্ষণ করতো সে ওদের মাঝে।
এটা আমার নগরী, আমাকে বলেছিলো লসট্রিস, একে, এর প্রতিটি লোককে আমি ভালোবাসি। ওহ টাইটা, গজ-দ্বীপে ফিরতে হবে ভাবলে খুব খারাপ লাগছে। এই থিবেস ছাড়া কোথাও ভালো লাগে না আমার।
সত্যিই কী এই শহর ছাড়তে খারাপ লাগবে তোমার? আমি জানতে চাইলাম, নাকি, এখানে বসবাসকারী কোনো এক মূর্খ সৈনিককে ছেড়ে যেতে? হেসে উঠে আমাকে চড় কষালো ও।
কিছুই কি তোমার কাছে পবিত্র বলে মনে হয় না? এমনকি, সত্য-শুভ্র প্রেমও নয়? যতোই ওই স্ক্রোল লেখো আর ভালো ভালো কথা বলো ভেতরে ভেতরে তুমি একটা বর্বর!
*
দিনগুলো দ্রুত কেটে যেতে লাগলো আমাদের সবার জন্যে। হঠাৎই একদিন দিনপঞ্জি হিসাব করে দেখি, ফারাও-এর শয্যাপাশে লসট্রিস যাওয়ার পর দুই মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। যদিও ওকে দেখে এখনো কিছু বোঝার কোনো উপায় নেই, ফারাওকে তাঁর আসন্ন পিতৃত্বের সুসংবাদ দেওয়ার সময় এসে গেছে। যখন লসট্রিসকে জানালাম এ কথা, শুধু একটা ব্যাপারেই মনোযোগী হয়ে উঠলো সে। প্রথমেই আমাকে দিয়ে শপথ করিয়ে নিলো, ফারাওকে জানানোর আগে আমি যেনো ট্যানাসের সাথে কথা বলে তাকে জানাই, অনাগত সন্তানের প্রকৃত পিতা সে-ই। সেই বিকেলেই কাজে নেমে পড়লাম। নদীর পশ্চিম তীরে, জাহাজ তৈরির কারখানায় ট্যানাসকে খুঁজে পেতে দেখি, কাজে ভুল হলে শ্রমিকদের পানিতে ছুঁড়ে ফেলে কুমীরের খাদ্য বানানোর হুমকি দিচ্ছে সে। অবশ্য, আমাকে দেখতে পেয়ে রাগ কমলো ওর, সেই সকালেই পানিতে নামা নতুন একটা গ্যালির উপরে গিয়ে বসলাম আমরা। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হলে কী করে পাটাতনের উপর থেকে পাম্পের সাহায্যে পানি নেমে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে গর্বের সাথে আমাকে দেখালো ট্যানাস। ও সম্ভবত ভুলেই গেছে, আমি নিজে সেই যন্ত্রের নকশা প্রস্তুত করেছিলাম; শেষমেষ চাতুর্যের সাথে মনে করিয়ে দিতে হলো।
পরে দেখা যাবে, নিজের পরিকল্পনার জন্যে আমার কাছে অর্থ চাইছো তুমি, বুড়ো বন্ধু। কসম, তুমি একেবারে সিরিয় বণিকদের মতোই ধূর্ত। আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে পাটাতনের শেষ মাথায় নিয়ে গেলো ট্যানাস, ওখান থেকে যোদ্ধারা আমাদের কথা শুনতে পাবে না। গলা নামিয়ে বললো, তোমার কর্ত্রীর কী খবর? গতরাতে স্বপ্নে দেখেছি তাকে। ভালো আছে তো সে? আর, ওর এতিম সন্তানগুলোর কী খবর? কতো সুন্দর ওর মন, দেখেছো! থিবেসের সবাই ওকে ভালোবাসে। যেখানেই যাই, কেবল ওর নাম শুনি। সত্যি, যেনো বর্শার মতো আমার বুকে বিধে ওই নাম!
খুব শীঘ্রই একটি নয়, দুটো নাম পাবে ভালোবাসার জন্যে, বললাম আমি। বিস্ময়ে অভিভূত ট্যানাস হা হয়ে চেয়ে থাকে আমার পানে। খামসিনের রাতে, ট্রাস এর সমাধিতে আরো বেশি কিছু ঘটেছিলো হে!
এতো জোরে আমাকে জড়িয়ে ধরলো ট্যানাস, আর একটু হলে দম বন্ধ হয়ে মারা পড়তাম। এ কি কোনো ধাঁধা? পরিষ্কার করে বলো, না হয় পানিতে ছুঁড়ে ফেলবো! কী বলছো, বুড়ো বন্ধু? শব্দের খেলা খেলো না আমার সাথে!
