স্বর্গের সুখ-স্বপ্ন দেখে ভালো করে ঘুমাও, টাইটা, প্রহরী যোদ্ধা ডেকে উঠলো পেছন থেকে। গলায় স্বর নেই আমার, কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। কখনো ভাবিনি, র্যাসফারের জন্যে কাঁদবো; হয়তো তা করিও নি। হয়তো নিজের জন্যেই কেঁদেছিলাম সেদিন, কে বলতে পারে?
*
ফারাও এর ঘোষণায় গজ-দ্বীপে আমাদের ফিরতি যাত্রা প্রাথমিকভাবে এক মাসের জন্যে পিছিয়ে গেলো। নতুন সম্পদে মোহাবিষ্ট রাজা দারুন ঘোরে আছেন। কখনো তাঁকে এতেটা তৃপ্ত, সন্তুষ্ট হতে দেখিনি। বুড়ো মানুষটাকে ততদিনে ভালো লাগতে শুরু করেছে আমার। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে তার সাথে মাঝে মধ্যে সম্পদের তালিকা তৈরি করতে সহযোগীতা করলাম লিপিকারদের।
অন্যান্য সময়ে, সমাধি-মন্দির এবং রাজ-সমাধির বিভিন্ন অংশের নকশার পরিবর্তন নিয়ে আমার পরামর্শ চাইলেন ফারাও। এখন যেহেতু নতুন সম্পদ উদ্ধার করা হয়েছে, খরচ বাড়লেও তাতে আপত্তি নেই তার। হিসাব করে দেখলাম, উদ্ধারকৃত সম্পদের প্রায় অর্ধেকই চলে যাবে নতুন নকশার সমাধিতে। ইনটেফের স্বর্ণালঙ্কার থেকে বেছে বেছে সেরা পনেরো টাখৃ স্বর্ণ পাঠানো হলো সমাধি-মন্দিরের স্বর্ণকারদের; ওগুলোকে সমাধি-সজ্জার কাজে লাগাবেন তারা।
সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করতে অবশ্য মাঝে-মধ্যে ট্যানাসকে ডেকে পাঠালেন তিনি। তার বাহিনীর সেরা একজন সেনাপতি হিসেবে ইতিমধ্যে ট্যানাসকে বিবেচনা করতে শুরু করেছেন ফারাও।
এর কয়েকটি সভায় আমি উপস্থিত ছিলাম। নিম্ন-রাজ্যের ভুয়া ফারাও-এর আক্রমণের হুমকি সব সময়ই আছে। দারুন চাতুরতার সাথে এই ভয় কাজে লাগালো ট্যানাস; ফারাওকে ইনটেফের চুরি করা ধন-সম্পদ থেকে ছোট্ট একটা অংশ ব্যয় করে পাঁচটি নতুন যুদ্ধ গ্যালি তৈরি করিয়েছিলো সে, নতুন অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত করেছিলো। প্রহরীদের। যোদ্ধাদের বেতন চুকিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তার অনুরোধ রেখেছিলেন ফারাও। প্রায় অর্ধ-বছর পেরিয়ে গেছে, তখনো বেতন পায়নি অনেক যোদ্ধা। এই প্রাপ্তিতে তাই দারুন খুশি হলো তারা, বিলক্ষণ বুঝলো, কার প্ররোচনায় বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ফারাও। তাই যখনই ট্যানাস পরিদর্শনে আসতো, সিংহের মতো গর্জন করে, হাত উঁচিয়ে সালাম জানিয়ে নিজেদের কৃতজ্ঞতা আর আনুগত্য প্রদর্শন করতে তারা।
যখনই কোনো কারণে রাজসভায় ট্যানাসের উপস্থিতি ঘটতো, কোনো না কোনো অজুহাতে লসট্রিস থাকতো সেখানে। অবশ্য, পর্দার আড়ালেই থাকতো সে, তবে মাঝে-সাজে তার এবং ট্যানাসের দৃষ্টি বিনিময় ঘটলে কেবল আমি টের পেতাম, কতোটা আবেগ লুকিয়ে আছে ওই দৃষ্টিতে।
যদি লসট্রিস জেনে ফেলতো, ট্যানাসের সাথে ব্যক্তিগত কোনো কারণে দেখা হবে আমার আবেগপূর্ণ, বিশাল বার্তা পাঠাতো সে। ফিরতি পথে আবার একই রকমের বড়ো উত্তর নিয়ে আসতাম, ট্যানাসের পক্ষ থেকে। অবশ্য একই কথাই বারবার বলতো দু জনেই মনে রাখতে খুব একটা সমস্যা হতো না আমার।
যে কোনো অযুহাতে আবার ট্যানাস এবং তার একান্তে দেখা করিয়ে দেওয়ার জন্যে আমাকে খুব করে বলতো মিসট্রেস। ওর নিজের এবং অনাগত সন্তানের নিরাপত্তার কথা ভেবে; সবচেয়ে বড়ো কথা, নিজের চামড়া বাঁচানোর তাগিদে ওদের দু জনের দেখা করানোর ব্যাপারে সম্মত হলাম না আমি। ট্যানাসকে একবার এ নিয়ে দোনোমনো করে কী একটা বলতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লো সে, ট্রাস-এর গোরস্থানের সেই মিলন ছিলো পাগলামী, টাইটা। কখনোই রাজ-পত্নীর অসম্মান করা আমার উদ্দেশ্যে ছিলো না, কিন্তু ওই খামসিন ওটার কারণে…। আবারো সেই ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না। ওকে বলো, নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি আমি ওকে। বলো, সারাজীবন ওর অপেক্ষায় থাকবো।
এমন ভালোবাসার বার্তা পেয়েও আমার মিসট্রেস রাগে মাটিতে পা ঠকতো, বলতো, তার প্রিয়তম মূলত একটা একরোখা মূর্খ, কোনোদিকেই কোনো খেয়াল নেই তার। এক-দুটা পাত্র ভেঙে, রাজার উপহার দেওয়া সাজ-সজ্জার আয়না পানিতে ছুঁড়ে ফেলে শেষমেষ বিছানায় পড়ে রাতের খাবার সময় অবধি কাঁদতো সে।
*
যুদ্ধ গ্যালি তৈরি পরিদর্শনের সামরিক দায়িত্বের বাইরে আজকাল আরো একটি কাজ করে ট্যানাস; উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির দেখভাল সেটি।
এই বিষয়ে প্রায় প্রতিদিন আমার সঙ্গে পরামর্শ করে সে। যেহেতু, সম্পত্তিগুলো এতোকাল ইনটেফের দখলে ছিলো, ওতে শ্রাইকদের হাত পড়েনি। কাজেই রাতারাতি উচ্চরাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনবান ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছে ট্যানাস। আমার শত বাধা সত্ত্বেও নিজের বাহিনীর লোকেদের ভরণ-পোষণ আর অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত করার পেছনে বেশিরভাগ সম্পদ ব্যয় করতে লাগলো সে। এই উদারতার জন্যে মিশরীয় সেনাবাহিনীতে দারুন সম্মানের স্থান পেলো সে।
কেবল এ-ই নয়, আসতেস, রেমরেম এবং ক্ৰাতাসকে পাঠিয়ে বিগত সমস্ত নদীপথের যুদ্ধে আহত, পঙ্গু, অন্ধ যোদ্ধা থিবেসের পথে পথে ভিক্ষা করে বেঁচে থাকাই হয়ে পড়েছে যাদের নিয়তি, তাদের বরণ করে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলো ট্যানাস। উপত্যকার উপরে, নিজের মালিকানাধীন এলাকায় তাদের জন্যে আশ্রম করে ভালো খাওয়া-দাওয়া আর পানীয়ের বন্দোবস্ত করলো সে। থিবেসের রাস্তায় রাস্তায়, অলিতে-গলিতে তার সুস্বাস্থ্য কামনা করে পান করতে লাগলো সাধারণ জনতা, সৈনিক।
