কাঠের প্রধান ফটকে প্রথমে ভোলা হলো র্যাসফারকে। তিনজন দড়ি-দড়া সহ উপরে রইলো, প্যারাপিটে, আরো চারজন প্রয়োজন হলো নিচে। ওরা ধরে রাখলো তাকে, ওদিকে সেনাবাহিনীর একজন যোদ্ধা পাশের মই বেয়ে উপরে উঠে এলো, হাতে পাথরের মাথাওয়ালা হাতুড়ি।
তামার তৈরি প্রথম পেরেক যখন মাংস গলে ঢুকে পড়লো, তামাশা ভুলে গেছে র্যাসফার; তার বিশাল পায়ের হাড় ফুড়ে গেঁথে গেছে পেরেক। মোচড়ে উঠে, গগনবিদারী আর্তনাদে কেঁপে উঠলো বর্বরটা; ওদিকে নেচে-গেয়ে, উৎসাহ দিয়ে চললো জনতা।
অবশেষে, সমস্ত পেরেক গাথা শেষ হতে যখন নিচে নেমে নিজের হাতের কাজ দেখতে লাগলো হাতুড়ে সৈনিক, শাস্তির নির্মমতা প্রত্যক্ষ হলো। উল্টো করে ঝুলে থাকা রাসফারের পা বেয়ে রক্ত ঝরছে। পেটের থলথলে চর্বি উল্টো দিকে ঝুলে পড়েছে, বিশাল জননাঙ্গ বাড়ি খাচ্ছে পেটের চামড়ায়। নড়াচড়া সাথে সাথে পায়ের আঙুলের মাঝখান দিয়ে পথ করে এগোলো পেরেক, মাংস, চামড়া, মাংসপেশি ফুঁড়ে বেরিয়ে গেলো। মাটিতে আছড়ে পড়লো র্যাসফার। চেঁচিয়ে উৎসাহ জোগালো জনতা, এ হিংস্র প্রদর্শনী দারুন মনে ধরেছে তাদের।
প্রয়োজনীয় উৎসাহ পেয়ে আবারো রাসফারকে উপরে তুলে পেরেক গেঁথে দিলো যোদ্ধারা। বিশাল ওজন ধরে রাখার জন্যে ট্যানাসের পরামর্শে হাত এবং পায়ে তামার মোটা পেরেকগুলো গাঁথা হলো এবারে।
সত্যিই, প্রচেষ্টা সার্থক হলো বলা যায়। মাথা নিচে, অতিকায় কোনো তারামাছের মতো হাত-পা ছড়িয়ে থিবেসের প্রধান ফটকের সঙ্গে লটকে থাকলো র্যাসফার। পেটের ভেতরের নাড়ি-ভুড়ি উল্টো চাপ দিচ্ছে ফুসফুঁসে, চিৎকার বন্ধ হয়ে গেছে তার। ফুঁপিয়ে শ্বাস টানছে এখন।
একের পর এক অভিশপ্ত আসামীদের পেরেক-গাঁথা করা হলো প্রধান ফটকে। হুঙ্কার, চেঁচামেচিতে উন্মাদ হয়ে গেছে জনতা। শুধুমাত্র বাস্তির গলা থেকে কোনো আওয়াজ বেরুলো না; নিষ্ঠুর বাস্তি বলে দুর্নাম আছে তার।
দিন গড়িয়ে চললো। তপ্ত সূর্য প্রখর রৌদ্র বিতরণ করলো ক্রুশবিদ্ধ আসামীদের। শেষ বিকেল নাগাদ ব্যথা, তৃষ্ণা আর রক্ত ক্ষরণে এতো দুর্বল হয়ে পড়লো তারা, জীবনের চিহ্ন পর্যন্ত টের পাওয়া গেলো না। উৎসাহ হারিয়ে যে যার পথে চলে গেলো জনতা। সারাদিন টিকে রইলো বাস্তি। ঠিক যখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে, শেষবারের মতো কেঁপে উঠে শ্বাস নিয়ে নিথর হয়ে গেলো তার দেহ।
সবার চেয়ে বেশি সময় ধরে বেঁচে রইলো র্যাসফার। গাঢ়, কালচে রক্ত এসে জমা হয়েছে তার মুখে, স্বাভাবিকের প্রায় দ্বিগুন আকৃতি পেয়েছে। কলিজার রঙের জিহ্বা ঠোঁটের ফাঁক গলে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। কিছু সময় পর পরই জান্তব একটা আওয়াজ বেরুলো তার গলা চীরে, কেঁপে উঠে খুলে যেতে লাগলো চোখ দুটো। ঠিক যতোবার ওরকম করলো র্যাসফার, ওর যন্ত্রণা বুঝতে পারলাম আমি। ঘৃণার শেষ বিন্দুটুকুও বহু আগেই নিঃশেষিত হয়েছে আমার, করুণায় ভরে গেলো ভেতরটা, ঠিক কোনো নির্যাতিত জন্তুর প্রতি যেমন করুণা বোধ করে মানুষ।
অনেক আগেই চলে গেছে জনতা। একা আমি বসে আছি দর্শক হয়ে। রাজার নির্দেশে এহেন বর্বর দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে বলে খেদ প্রকাশে কোনো কমতি করলো না ট্যানাস,–সূর্যাস্ত পর্যন্ত নিজের অবস্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো সে। শেষমেষ অধঃস্তন একজন যোদ্ধাকে পাহারায় রেখে প্রস্থান করলো ট্যানাস।
এখন প্রধান ফটকের নিচে জনা দশ প্রহরী, আমি আর কয়েকজন ভিক্ষুক-ভবঘুরে ছাড়া কেউ নেই। ফটকের দুই পাশে জ্বালানো মশালের আলো থেকে থেকে নিভু নিভু হয়ে যাচ্ছে নদী থেকে আসা দমকা বাতাসে, ভয়াল দৃশ্যের উপর ভূতুরে আলো ছড়াচ্ছে ।
আবারো গুঙ্গিয়ে উঠলো র্যাসফার। এবারে আর সহ্য করা সম্ভব হলো না আমার পক্ষে। সঙ্গে করে নিয়ে আসা থলে থেকে সুরার পাত্র বের করে ট্যানাসের অধঃস্তন সৈনিকের উদ্দেশ্যে এগোলাম। সেই মরুর লড়াইয়ের সময় পরিচয় হয়েছিলো এর সঙ্গে, আমার অনুরোধ শুনে ক্লিষ্ট হেসে মাথা নাড়লো সে, তুমি একটা নরম মনের বোকা মানুষ, টাইটা। অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে বদমাশটা, ওকে নিয়ে দুঃখ করার কিছু নেই। বললো সৈনিক। ঠিক আছে। কিছু সময়ের জন্যে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকবো আমি, কী করবে, করো। কিন্তু তাড়াতাড়ি।
প্রধান ফটকের কাছে হেঁটে গেলাম আমি। র্যাসফারের মাথা এখন আমার মাথার সমানে ঝুলছে। নরম স্বরে তার নাম ধরে ডেকে উঠতেই কেঁপে খুলে গেলো চোখ দুটো। জানি না, কতটুকু কি বুঝলো সে, আমি বললাম, সামান্য একটু মদ আছে আমার কাছে।
শুষ্ক গলায় ঢোক গেলার চেষ্টা করলো র্যাসফার। চোখ দুটো আমাকেই দেখছে। যদি এখনো অনুভব শক্তি থেকে থাকে তার, তো তৃষ্ণায় দারুন কষ্ট পাচ্ছে। ধীরে, কয়েক ফোঁটা করে মদ ঢেলে দিতে লাগলাম র্যাসফারের শুষ্ক জীভে, একটি ফোঁটাও যেনো নাকে না ঢোকে, সেদিকে লক্ষ্য রাখলাম। দুর্বল ভঙ্গিতে গিলতে চাইলো সে, কিন্তু কারো পক্ষেই ব্যাপারটা সম্ভব হতো না, এমনকি ভয়াল র্যাসফারের জন্যেও না; পানিটুকু ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়িয়ে ময়লা চুলের জটে হারিয়ে গেলো।
বন্ধ হয়ে গেলো র্যাসফারের চোখ, এর অপেক্ষাতেই ছিলাম আমি। পশমের চাদরের ভেতর থেকে ছুরিটা বের করে হাতে নিলাম, ধীরে বর্বরটার কানের পেছনে ফলাটা নিয়ে সোজা হাতল পর্যন্ত সেঁধিয়ে দিলাম ওটা। শেষ যন্ত্রণায় বাঁকা হয়ে গেলো র্যাসফার, এরপর শিথিল হয়ে গেলো দেহ। টেনে ছুরি বের করতে সামান্য একটু রক্ত বেরুলো। চাদরের ভাজে ওটা লুকিয়ে চলে যাওয়ার জন্যে ঘুরলাম আমি।
