কেমন করে? কষ্টার্জিত স্বরে জানতে চাইলো ট্যানাস, নিচু টেবিলের উপর থেকে পাত্রগুলো তুলে নিলাম আমি, কোনো সন্দেহ নেই ওগুলো থেকেই রাতের আহার করেছিলো সৈন্যরা। শুঁকে দেখতে বিষের গন্ধ এখানেও নাকে এসে ঝাঁপটা মারলো।
রাধুনিকে জিজ্ঞেস করে দেখা যায়, বললাম। এরপর রাগের আতিশায্যে দেয়ালে ছুঁড়ে ফেললাম একটা পাত্র। আমার প্রাণপ্রিয় পোষ্যরা ঠিক একইভাবে মরেছিলো, আজ মরলো প্রিয় বন্ধু খেতখেত।
বড়ো একটা শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করার প্রয়াস পেলাম। নির্ঘাত বন্দী পালিয়েছে? কিছু না বলে ইনটেফের শয্যাকক্ষের দিকে চলে ট্যানাস। শূন্য কক্ষের শেষ মাথার দেয়ালে কালো গর্তটা সাথে সাথেই নজরে এলো।
তুমি জানতে, এখান দিয়ে পালানোর গোপন পথ আছে? ট্যানাসের প্রশ্নের উত্তরে নীরবে মাথা নাড়লাম এপাশ-ওপাশ।
ভেবেছিলাম, সবকিছু জানা আছে আমার; ভুল, হতাশা ঝরে পড়লো আমার কণ্ঠে। কেনো জেনো আমার মন বলছিলো, ইনটেফকে কখনো বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো যাবে না। অন্ধকারের দেবতারা তাকে রক্ষা করবে।
রাসফারও কি পালিয়ে গেছে, ইনটেফের সাথে? নেতিবাচক ঢঙে মাথা নাড়ে ট্যানাস।
না, তাইক নেতাদের সাথে বাহিনীর বন্দীশালায় আটক আছে সে। তবে ইনটেফের দুই ছেলে, মেনসেট আর সোবেক পালিয়েছে। কোনো সন্দেহ নেই, আমার লোকেদের হত্যা আর পিতার পলায়নের পেছনে এদেরই হাত ছিলো। উন্মত্ত রাগে লাগাম টেনেছে ট্যানাস। তুমি ইনটেফকে সবচেয়ে ভালো চেনো, টাইটা। কী করবে সে এখন? কোথায় যাবে? কেমন করে ধরবো তাকে?
একটা কথা বলতে পারি এমন দিনের কথা আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলেন ইনটেফ। জানি, আগে থেকেই নিম্ন-রাজ্যে নিজের জন্যে সম্পদ লুকিয়ে রাখার বন্দোবস্ত করা ছিলো তার। এমনকি, ভুয়া ফারাও-এর সাথেও তার যোগসাজশ ছিলো। মনে হয়, যোদ্ধাদের গোপন খবর সে-ই পাচার করতো ওখানে। উত্তরে বিশাল অভ্যর্থনা অপেক্ষা করছে তার জন্যে।
ইতিমধ্যেই পাঁচটি গ্যালি উত্তরের উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিয়েছি আমি, ট্যানাস জানালো। যে জাহাজই পাক, আমার কাছে নিয়ে আসার হুকুম রয়েছে।
লোহিতসাগরের ওপারে বহু বন্ধু-বান্ধব আছে ইনটেফের, বললাম। উত্তর সাগরের তীরে, সেই গাঁজা এলাকার বণিকদের কাছে নিজের জন্যে সম্পদ পাঠিয়েছিলেন ইনটেফ। বেদুঈনদের সাথেও দহরম-মহরম আছে তার; অনেকে বেতনও পায় তার কাছে থেকে। ওরা তাকে নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও মরু পেরোতে সাহায্য করবে।
হে হোরাস! এ যে দেখছি ইঁদুরের মতো বহু ফাঁকফোকর রয়েছে বেরুনোর জন্যে, হতাশ ভঙ্গিতে বলে উঠলো ট্যানাস। কেমন করে এর সবগুলো বন্ধ করবো আমি?
পারবে না, আমি বললাম। আর এখন, ফারাও তো বসে আছেন শাস্তি কার্যকর দেখার জন্যে। তাঁকে এ সমস্তই জানাতে হবে তোমার।
উনি খেপে যাবেন, অবশ্য কারণও আছে। ইনটেফকে পালিয়ে যেতে দিয়ে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছি আমি।
ট্যানাসের কথা অবশ্য ভুল প্রমাণিত হলো। ইনটেফের পলায়নের খবর শান্ত ভাবেই গ্রহণ করলেন রাজা। এর পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না; হয়তো এতো বিশাল সম্পদের হঠাৎ-প্রাপ্তিতে মজেছেন তিনি। হতে পারে, হৃদয়ের গভীর কোনো কোণে ইনটেফের জন্যে হয়তো কিছুটা স্নেহ এখনো আছে তাঁর। আবার, এমনও হতে পারে, কাউকে পেরেক-বিদ্ধ করার মতো নৃশংস দৃশ্য তার দয়ালু মনে খুব একটা আগ্রহ জাগায় নি।
অবশ্য, কিছুটা রাগের বহিঃপ্রকাশ ছিলো তার কথায়; এই যেমন, বিচার প্রতারণার শিকার হলো ইত্যাদি ইত্যাদি; কিন্তু যতোটা সময় তাঁর কাছে ছিলাম, কেবল উদ্ধার করা ধন-সম্পদে নিবদ্ধ ছিলো দৃষ্টি। এমনকি, আসামী পলায়নের পুরো দায়ভার যখন নিতে চাইলো ট্যানাস, পাত্তাই দিলেন না ফারাও।
রক্ষিদের নেতার সব দোষ; আর বিষের পাত্র থেকে খেয়ে মরে গিয়ে তার প্রায়শ্চিত্ত করেছে সে। পলাতকের পেছনে বাহিনী আর গ্যালি পাঠিয়ে যা করার, করেছো তুমি। এর বেশি আর কিছু করার ছিলো না। এখন, বাদবাকি আসামীদের শাস্তি কায়েম করা হোক।
ফারাও কী শাস্তিপ্রদর্শন দেখার ইচ্ছে করেন? ট্যানাসের প্রশ্নের উত্তরে যেনো অযুহাত তৈরির জন্যেই নিজের চারপাশের ধন-সম্পদ আর খাজনা-আদায়কারীদের প্রতিবেদনের দিকে তাকালেন ফারাও।
এখানে আমার অনেক কাজ পড়ে আছে, লর্ড ট্যানাস। যা করার, করো। শাস্তি পালিত হলে আমাকে জানিয়ো।
*
সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের শাস্তি দেখতে আমিও জড়ো হয়েছিলাম লাখো থিবেসবাসীর মতো। সরাসরি র্যাসফারের দিকে তাকিয়ে নিজের ঘৃণার আগুনে ঘি ঢালতে চাইলাম। প্রতিটি হিংস্র, নৃশংস আচরণ, যা আমার সাথে করেছে র্যাসফার, তার সবকিছু মনে করিয়ে দিলাম নিজেকে। সেই খোঁজা করা ছুরি, চাবুকের আঘাত, এলাইদা সবকিছু। কিন্তু যতটুকু ঘৃণা এ বদমাশের প্রাপ্য, ততোটা হয়তো বুকে ধারণ করতে পারলাম না।
দূর থেকে আমাকে দেখতে পেয়ে দাঁত বের করে হাসলো সে। অবশ মুখের এক পাশ হাসলো শুধু, ব্যাঙ্গের হাসি; শুনলাম র্যাসফার বলছে, আমাকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্যে দেখছি খোঁজা ব্যাটাও এসেছে! কে জানে, স্বর্গের জমিনে তোর সাথে আবার দেখা হবে আমার; ওখানে তাহলে আর একবার বিচি কাটার সুযোগ পাবো!
ওর প্রতি আমার ঘৃণা আরো বেশি হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে বদমাশটা; কিন্তু কেনো যেনো, পারলাম না। উত্তরে বললাম, নদীর তলায় কাদা মাটিতে যাচ্ছো তুমি, স্বর্গে নয় হে। এর পরেরবার যে মাছটা ধরে ভেজে খাবো, ওটার নাম র্যাসফার রাখবো আমি!
