বাক্ হার! ফারাও সর্বো! তিনি চিরজীবি হোন! জনতার গগনবিদারী হুঙ্কারের সাথে আনন্দে নেচে উঠলো আমার কর্ত্রীও; শুধু ও-ই নয়, সমস্ত মেয়েরা নাচছে এখন।
এবারে, আমাকে অবাক করে দিয়ে সরাসরি লসট্রিসের পাশে বসে থাকা আমার দিকে তাকালেন ফারাও। আরো একজন আছে, যার সেবা পেয়েছি আমি; লুকোনো সম্পদের হদিশ যে বাতলে দিয়েছিলো। দাস টাইটা, সামনে এসে দাঁড়াক!
সিংহাসনের সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়ালাম। মৃদু কণ্ঠে রাজা বলে উঠলেন, বিশ্বাসঘাতক ইনটেফ আর তার দোসর, বদমাশ র্যাসফারের হাতে অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করতে হয়েছে। তাদের চাপে পড়ে এমনকি ম্রাটের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়েছে তোমাকে। কিন্তু এ সমস্তই তুমি করেছো ইচ্ছের বিরুদ্ধে; দাস বলে মালিকের ইচ্ছেয় নিষেধ করার কোনো উপায় ছিলো না তোমার। আজ, তোমার উপর থেকে যে কোনো রকম দায়-দায়িত্ব তুলে নিলাম আমি। আমার চোখে তুমি নিষ্পাপ; রাজার প্রতি তোমার আনুগত্যের জন্যে দুই টাখ সেরা স্বর্ণ পুরস্কার হিসেবে ঘোষণা করলাম ইনটেফের চুরি করা সম্পদ থেকে ওটা দেওয়া হবে তোমাকে।
বিস্ময়ের ধ্বনি উঠলো সবার মধ্যে। দম আটকে ফেললাম আমি। বিশাল একটা পরিমাণ ওটা দেশের সম্পদশালী অনেক জমিদারেরও এতো অর্থ নেই। নদীর ধারের সবচেয়ে উর্বর জমি কেনা থেকে শুরু করে রাজকীয় বাড়ি তৈরি, তিনশো শক্তিশালী দাস ক্রয়; এমনকি আমাদের বাহিনীর সমস্ত জাহাজ সজ্জিত করে পুরো পৃথিবী ঘুরিয়ে আনা যাবে ওই অর্থ দিয়ে। আমার কল্পনার চেয়েও বেশি ওই পরিমাণ। কিন্তু রাজার কথা এখনো শেষ হয়নি।
যেহেতু তুমি একজন দাস–এই পুরস্কার সরাসরি তোমাকে দেওয়া হবে না। কিন্তু লসট্রিস যে তোমার কর্ত্রী, ফারাও-এর কনিষ্ঠ পত্নী, তার জিম্মায় রাখা হবে সমুদয় অর্থ। আমার বোঝা উচিত ছিলো, এতো সম্পদ পরিবারের মধ্যেই রাখতে চাইবেন ফারাও।
আমি, মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্যে যে মিশরের শ্রেষ্ঠ ধনবান ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলাম, রাজাকে কুর্নিশ করে আমার কর্ত্রীর পাশে নির্ধারিত স্থানে চলে এলাম। আমার হাতে চাপ দিয়ে সান্তনা দিতে চাইলো লসট্রিস, অবশ্য একটুও অসুখী ছিলাম না তখন, সত্যি বলছি। আমাদের নিয়তি একই সুতায় গাঁথা পার্থিব কোনো কিছুই আমাদের সম্পর্কে চির ধরাতে পারবে না।
সবশেষে, সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা আসামীদের শাস্তি শোনাতে মুখ খুললেন ফারাও, যদিও পুরোটা সময় ইনটেফের দিকেই তাকিয়ে রইলেন।
তোমাদের অপরাধের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। পূর্ববর্তী যে কোনো সময়ের যে কোনো শাস্তি এর জন্যে যথেষ্ট নয়। তো আমার রায় হলো–ওসিরিসের উৎসব শেষে, আগামী সূর্যোদয়ের পরে থিবেসের রাস্তা ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে তোমাদের, হাত-পা বাঁধা অবস্থায়, নগ্ন শরীরে। জীবিত দেহে পেরেক ঠুকে শহরের প্রধান ফটকের সাথে গাঁথা হবে তোমাদের মাথা ঝুলবে নিচে। কাকে না ঠুকরে খাওয়া পর্যন্ত ওখানেই ঝুলবে তোমরা। এরপর, সমস্ত হাড় গুঁড়ো করে ফেলা হবে নীল মাতার জলে।
ইনটেফ পর্যন্ত টলে উঠলেন এমন ঘোষণায়। শবদেহ মমি করার কোনো উপায় রাখেননি ফারাও। চিরতরে অভিশপ্ত হয়ে থাকবে তাদের আত্মা। একজন মিশরীর মানবের জন্যে এরচেয়ে ভয়ঙ্কর আর কিছু হতে পারে না। স্বর্গের জমিনে কোনোদিনও স্থান হবে না এদের।
*
শাস্তির দিন সকালে, প্রাসাদের বাগানগুলো তখনো অন্ধকারে আচ্ছন্ন, হারেম ছেড়ে রওনা হলাম আমি । জল-বাগানের ধার ঘেঁষে যেতে যেতে কালো পানির বুকে তারাদের প্রতিবিম্বে চোখ আটকে গেলো। ইনটেফের ব্যক্তিগত প্রকোষ্ঠে, যেখানে আটকে রাখা হয়েছে তাকে, তার কাছাকাছি পৌঁছতেই ভেতরে মশালের আলো চোখে পড়লো । চিৎকার করে কেউ নির্দেশ দিচ্ছে অপর কাউকে। সাথে সাথেই বুঝলাম, গোলমেলে কিছু একটা ঘটছে ওখানে। দৌড়ে চললাম। আর একটু হলেই প্রকোষ্ঠের রক্ষী বর্শা বিধিয়ে দিয়েছিলো শরীরে, শেষ মুহূর্তে আমাকে চিনতে পেরে ক্ষান্ত দিলো সে।
প্রকোষ্ঠের সামনের স্থানে দাঁড়িয়ে ট্যানাস। ফাঁদে পড়া সিংহের মতো গর্জন করছে সে, যেনো সামনে আসছে ঘুষি পাকিয়ে তেড়ে যাচ্ছে তার দিকে। এমন রাগ করতে কখনো দেখিনি ওকে। কথা বলার শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে যেনো। তার বাহিনীর সাহসী যোদ্ধারা কেউ সামনে যেতে পারছে না।
সোজা তার দিকে গিয়ে একটা ঘুষির নিচে মাথা নামালাম; চেঁচিয়ে বলছি, ট্যানাস! সামলাও নিজেকে! পাগল হয়ে গেলে নাকি?
প্রায় মেরে বসেছিলো ও আমাকে, এরপর নিজের সাথেই যুদ্ধ করে থামলো।
দেখো, এদের জন্যে কিছু করার আছে কি না! প্রকোষ্ঠের সামনের ঘরে এলোমেলোভাবে পড়ে থাকা শরীরগুলো দেখিয়ে বললো সে। যেনো যুদ্ধ হয়ে গেছে এখানে।
আঁতকে উঠে লক্ষ্য করলাম, তাদের মধ্যে রয়েছে খেতখেত-বাহিনীর জ্যেষ্ঠ যোদ্ধা, খুব পছন্দ করতাম আমি একে। প্রচণ্ড ব্যথায় কুঁকড়ে, পেট চেপে ধরে আছে। সে। গালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা দেখলাম মৃতের মত ঠাণ্ডা।
আফসোসে মাথা নেড়ে বললাম, আর কিছু করার নেই। বন্ধ চোখের পাতা উল্টাতে দৃষ্টিহীন চোখদুটো নজরে এলো। ঝুঁকে পড়ে মুখের গন্ধ নিতে চাইলাম। পরিচিত সেই গন্ধ।
বিষ, দাঁড়িয়ে বললাম। বাকিদের ক্ষেত্রেও একই কথা। মেঝেতে আরো পাঁচটি দেহ পড়ে আছে কুণ্ডলী পাকিয়ে।
