হাতুড়ি, বাটাল আর ছেনি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো রাজমিস্ত্রির দল, দেয়ালচিত্র রক্ষা সম্পর্কিত আমার কথায় বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করলো না। রঙ, ধুলো, কাদামাটির স্তর ভেঙে পড়লো নিমিষেই। পশমী শাল দিয়ে মুখ-মাথা ঢেকে রাখলো রাজ-বধূরা।
ধীরে পলেস্তারার নিচ থেকে উদয় হলো পাথুরে চৌকোনা মুখ। বিস্ময়ধ্বনি বেরুলো ফারাও-এর কষ্ঠ চীরে, ধুলো-ময়লা অগ্রাহ্য করে সামনে এগোলেন তিনি। পাথরের খণ্ডগুলোর মধ্যে একটি খণ্ড একটু আলাদা, ঠিক যেখানটায় চক দিয়ে এঁকেছিলাম আমি।
ওটার পেছনে লুকোনো দরোজা আছে! চেঁচিয়ে উঠলেন রাজা। ভাঙো, ঢোকো ওখানে!
রাজার উৎসাহে জোর হাত লাগালো মিস্ত্রির দল। দ্রুতই পথ করে ফেললো ভেতরে ঢোকার। কালো গর্তের মতো প্রবেশমুখের সামনে দাঁড়িয়ে মশাল জ্বালানোর নির্দেশ দিলেন ফারাও।
এই দেয়ালের পেছনে পুরো স্থানটাই একটা লুকোনো প্রকোষ্ঠ। তাকে বললাম আমি। ইনটেফের নির্দেশে আমি তৈরি করেছিলাম এটা।
মশাল জ্বালানো হতে, সেটা হাতে রাজার সামনে পথ দেখালো ট্যানাস। ফারাও এর ঠিক পেছনেই রইলাম আমি ।
বহুদিন হলো, ওখানে শেষবার পা রেখেছি, অন্য সবার মতোই আমিও দারুন আগ্রহ নিয়ে দেখতে লাগলাম চারপাশে। কিছুই পাল্টে নি। সিডার আর একাশিয়া কাঠের বাক্সগুলো আগের মতোই আছে, ঠিক যেমন করে সাজিয়ে রেখে গিয়েছিলাম। যে বাক্সগুলো আগে দেখা প্রয়োজন, ওগুলো চিহ্নিত করতে রাজা হাঁক দিয়ে উঠলেন, অভ্যর্থনা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হোক বাক্সগুলো!
শক্ত লোক দরকার হবে, শুষ্ক কণ্ঠে যোগ করলাম। প্রচুর ভারী ওগুলো।
নীল বাহিনীর তিন তিনজন দশাসই লোক দরকার হলো বাক্সগুলো বহন করে নিয়ে যেতে।
জীবনেও ওগুলো দেখিনি, প্রতিবাদ করে বললেন ইনটেফ যখন রাজ-উজিরে সিংহাসনের সামনে একে একে জড়ো করা হলো বাক্সগুলো। দেয়ালের ওপাশের গোপন প্রকোষ্ঠের কথা আমার জানা ছিলো না। নির্ঘাত আমার পূর্বসুরি কেউ তৈরি করেছেন ওটা।
ম্যাজেস্টি, বাক্সের ঢাকনার সীলটি ভালোভাবে লক্ষ্য করুন, আমার অনুরোধে উঁকি মেরে দেখলেন ফারাও, বাক্সের ভেতরে।
ওটা কিসের প্রতীক? জানতে চাইলেন তিনি।
রাজ-উজিরের মধ্যমার আংটিটি লক্ষ্য করুন, বিড়বিড় করে জানালাম, দয়া করে। একটু মিলিয়ে দেখুন দুটো প্রতীক।
লর্ড ইনটেক, তোমার আংটি আমাকে দাও দয়া করে, ব্যঙ্গপূর্ণ কণ্ঠে সম্মান জানালেন ফারাও। কিন্তু বাম হাত শরীরের পেছনে আড়াল করলেন ইনটেফ।
মহান মিশর, গত বিশ বছর ধরে ওই আংটি আমার হাতে আছে। আঙুল মোটা হয়ে গেছে তো, এখন আর খুলতে পারি না।
লর্ড ট্যানাস, ট্যানাসের দিকে ফিরে বললেন রাজা। তলোয়ার হাতে নাও। আংটিসহ ইনটেফের আঙুল কেটে আমার সামনে উপস্থাপন করা হোক। বাধ্যগতের মতো তলোয়ার বের করার ভঙ্গি করে সামনে এগুলো ট্যানাস–ঠোঁটে ক্রুর হাসি।
আমার ভুলও হতে পারে, তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন ইনটেফ। দেখি, খুলতে পারি কি না। সহজেই আঙুল থেকে খুলে এলো আংটিটা। এক হাঁটুর উপর ভর করে রাজার সামনে সেটা পেশ করলো ট্যানাস।
মনোযোগের সাথে বাক্সের ঢাকনার সঙ্গে আংটির প্রতীক মিলিয়ে দেখলেন ফারাও। যখন সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, তাঁর মুখ ক্রোধের আগুনে জ্বলছে।
একদম মিলে গেছে। এই প্রতীক তোমার আংটির, ইনটেফ। কিছুই বললেন না ইনটেফ এই কথায়। দুই হাত ভাঁজ করে বুকে বেঁধে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।
সীল ভাঙ্গো! খোলো এই বাক্স! ফারাও-এর নির্দেশে বাক্সের মুখ খুলে ফেললো ট্যানাস। ঢাকনা খুলে পড়ে যেতে ভেতরের সম্পদ দৃশ্যমান হলো। চেঁচিয়ে উঠলেন ফারাও, দেবতাদের কসম! হুড়োহুড়ি পড়ে গেলো সবার মধ্যে, ভেতরে কী আছে দেখতে উদগ্রীব তারা।
স্বর্ণ! দুই হাতে স্বর্ণের আংটি মুঠো ভরে তুললেন রাজা, তাঁর আঙুলের ফাঁক গলে ঝরতে লাগলো সোনালি জলপ্রপাত। একটি আংটি চোখের সামনে ধরে ভালো করে লক্ষ্য করলেন ফারাও। দুই ডেবেন স্বর্ণ। এই বাক্সে এ রকম আর কয়টি আছে, আর এরকম বাক্সই বা কয়টি আছে ওখানে? বিস্ময়াভূত হয়েই প্রশ্নটা করেছিলেন তিনি, কিন্তু উত্তরে আমি বললাম, এই বাক্সে আছে ঢাকনার নিচে আমারই লিখে রাখা হিসাব দেখে নিলাম। এতে আছে এক টাখ তিনশো ডেবেন বিশুদ্ধ স্বর্ণ। আর আমার স্মৃতি প্রতারণা না করে থাকলে, তেপান্নো বাক্স স্বর্ণ আর তেইশ বাক্স রৌপ্য আছে গোপন স্থানে। তবে, অলঙ্কার কতগুলো আছে, এ আমার মনে নেই।
এমন কেউ কী নেই, যাকে বিশ্বাস করতে পারি আমি? হাহাকার ধ্বনিত হলো ফারাও-এর কণ্ঠে। তুমি ইনটেফ তোমাকে আপন ভাইয়ের চেয়ে কিছু কম মনে করিনি কখনো। এমন কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই, যা তুমি পাওনি আমার দরবার থেকে। এইভাবে প্রতিদান দিলে তার?
*
সেদিন রাতে রাজার শয্যাকক্ষে যখন তার ক্ষতের পরিচর্যা করছিলাম, প্রধান খাজনা আদায়কারী এলেন দেখা করতে। সমস্ত ধন-সম্পদের সম্পূর্ণ হিসাব পেশ করলেন তারা। বিস্ময়ে, রাগে, আনন্দে অভিভূত হয়ে গেলেন রাজা।
বদমাশটা দেখছি আমার চাইতেও ধনী ছিলো। এমন শয়তানের জন্যে কোনো শাস্তিই যথার্থ নয়। আমাকে, আমার খাজনা-আদায়কারীদের সে ধোঁকা দিয়ে ডাকাতি করেছে!
শুধু তাই নয়, প্রভু হেরাবের সমস্ত সম্পদ নষ্ট করে তাকে খুন করেছে, মনে করিয়ে দিয়ে বললাম আমি। হয়তো এটা বলা আমার পক্ষে একটু ধৃষ্টতা ছিলো, কিন্তু তততদিনে আমার কাছে অনেক ঋণ হয়ে গেছে ফারাও-এর এতোটুকু ঝুঁকি তো আমি নিতেই পারি।
