আমার উদ্দেশ্যে হানা আঘাত শেষ করতে পারলো না বর্বরটা। প্রচণ্ড শব্দে মাটিতে আছাড় খেলো সে। অবশ হাত থেকে ছুটে গেলো অস্ত্রটা, শূন্যে পাক খেয়ে আছড়ে পড়লো ফারাও-এর সিংহাসনের এক ধারে, গেঁথে গিয়ে কাঁপতে লাগলো। বিস্ময়ে মুখ হা-সেদিকে চেয়ে রইলেন রাজা। ধারালো ফলায় তার হাতের চামড়া কেটে গেছে, ফারাও-এর শ্বেত-শুভ্র বস্ত্রে ঝরলো ফোঁটা ফোঁটা রক্ত।
অসহনীয় নীরবতা ভেঙে গেলো ট্যানাসের বজ্রকঠিন কণ্ঠস্বরে, মহান মিশর, আপনি দেখেছেন, শয়তানটাকে কে ইশারা করেছিলো। আপনার জীবন যে বিপদে ফেলে দিয়েছে, আপনি চিনলেন তাকে। সামনের যোদ্ধার থেকে জট ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো ট্যানাস, লাফিয়ে ইনটেফের সামনে গিয়ে এক হাতে ধরে মোচড় দিতে লাগলো যতক্ষণ পর্যন্ত না হাঁটুর উপর পড়ে গিয়ে ব্যথায় চেঁচিয়ে উঠলেন রাজ-উজির।
এ সব আমাকে দেখতে হবে, ভাবি নি কোনোদিন, রাজ-উজিরের দিকে তাকিয়ে দুঃখ ভরে বললেন ফারাও। সারাজীবন তোমাকে বিশ্বাস করে এসেছি, ইনটেক, আর তুমি আমার উপর থুতু ছুঁড়ে মারলে!
মহান মিশর, আমার কথা শুনুন! নিচু হয়ে বললেন ইনটে, কিন্তু ফারাও তাঁর মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন অন্যদিকে ।
অনেক শুনেছি তোমার কাছ থেকে। ট্যানাসের উদ্দেশ্যে মাথা ঝাঁকালেন রাজা। তোমার লোকেদের বলল, একে পাহাড়া দিয়ে রাখতে। যথাযথ সম্মান অবশ্যই দেবে, কেননা তার কোনো অপরাধ এখনো প্রমাণিত হয়নি।
সবশেষে, জনতার মুখোমুখি হলেন তিনি। বড়ো আশ্চৰ্য্য আর অনির্ধারিত ঘটনা ঘটে গেলো। দাস টাইটার দেওয়া প্রমাণ খতিয়ে দেখা পর্যন্ত এই সমাবেশ আমি মুলতবি করলাম। আগামীকাল দুপুরে, ঠিক এইখানে, আমার রায় শোনার জন্যে আবার জড়ো হবে থিবেসবাসী। এ আমার নির্দেশ।
*
রাজ-উজিরের প্রাসাদের দর্শনার্থী কক্ষের প্রধান দরোজা গলে ঢুকলাম আমরা। কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন রাজা; র্যাসফারের আঘাতে সৃষ্ট তার ক্ষতটা এমন মারাত্মক কিছু নয়, তবু সাদা লিনেন কাপড়ে ওটা মুড়ে দিয়েছি আমি।
পুরো কক্ষটা ধীরে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন ফারাও। লম্বা কক্ষের শেষ মাথায় রয়েছে রাজ-উজিরের সিংহাসন। অ্যালাস্টারের নিখাদ একটি খন্ড থেকে তৈরি ওটা। গজ-দ্বীপে, ফারাও-এর সিংহাসনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কামরার উঁচু দেয়ালগুলো মসৃণ কাদা মাটিতে লেপা, তারই উপর আঁকা রয়েছে সমগ্র মিশরের সেরা দেয়ালচিত্র আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ ওগুলো। বিশাল কক্ষটাকে যেনো আমোদ-প্রমোদের স্বর্গেরাজ্যে পরিণত করেছে চিত্রকর্মগুলো। ইনটেফের দাস ছিলাম যখন, তখনকার সৃষ্টি এরা, আজ আমি নিজেও যেনো আবেগে কেঁপে উঠলাম দেখে।
কেবলমাত্র এই কাজগুলোর জন্যেই মিশরের ইতিহাসের সেরা শিল্পীর উপাধি পাওয়ার যোগ্য আমি; বাকি কাজের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। দুঃখের বিষয়, এখন আমাকেই এগুলো নষ্ট করে ফেলতে হবে।
কক্ষের ভেতর দিয়ে ফারাওকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চললাম। সমস্ত রাজকীয় আচরণ বাদ দিয়ে একেবারে বাচ্চাদের মতো আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন তিনি। এতো নিকটে দাঁড়িয়ে আমার পিছু পিছু চলছিলেন, বারবার পায়ে ধাক্কা লাগছিলো। পেছন পেছন তার আগ্রহী সভাদ।
সিংহাসনের পেছনের দেয়ালের কাছে তাদের নিয়ে চললাম আমি । সূর্যের দেবতা, আমন রার বিশাল একটি ম্যুরালের সামনে এসে দাঁড়ালাম। কিছু সময় মুগ্ধ নয়নে চিত্রকর্মটির দিকে তাকিয়ে রইলেন ফারাও।
আমাদের পেছনে, পুরো কক্ষটি অর্ধেক ভরে গেছে সভাষদ, যোদ্ধা, জমিদারবর্গের কাফেলায়; রাজ-বধূ আর উপপত্নীদের কথা না হয় বাদ দিলাম প্রসাধনে মুখ ঢেকে দারুন উৎসাহ নিয়ে তারাও সামিল হয়েছেন এই অনুষঙ্গে। স্বাভাবিকভাবেই আমার কর্ত্রী একেবারে সামনের সারিতে রয়েছে। রাজার এক পা পেছনে ট্যানাস। রাজ প্রহরীদের দায়িত্ব এখন নীল কুমীর বাহিনী পালন করছে।
ট্যানাসের দিকে ফিরলেন রাজা। তোমার লোকেদের বলল, লর্ড ইনটেফকে নিয়ে আসতে।
বরফ শীতল ভাবাবেগের সাথে ইনটেফকে দেয়ালচিত্রের সামনে নিয়ে এলো ক্ৰাতাস, নগ্ন তলোয়ারের ফলা তাক করে রেখেছে তার দিকে।
টাইটা, তুমি এগোও! রাজা আমাকে নির্দেশ দিতেই দেয়ালের মাপজোক শুরু করলাম। দেয়ালের সবচেয়ে দূরবর্তী কোণ থেকে ঠিক ত্রিশ পা সরে এলাম আমি, হাতের চক দিয়ে চিহ্ন দিয়ে রাখছি।
এই দেয়ালের ওপাশে রয়েছে রাজ-উজিরের নিজস্ব সম্পদশালা, রাজাকে ব্যাখ্যা করে বললাম। শেষবার যখন মেরামতের কাজ করা হয়েছিলো প্রাসাদে, কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। ইনটে সব সময় তার সম্পদ হাতের কাছেই রাখতে চাইতেন।
কোনো কোনো সময় তুমি বেশ বাঁচাল, টাইটা, প্রাসাদের স্থাপত্য সম্পর্কিত আমার বর্ণনায় একটু বিরক্ত হলেন রাজা। কী দেখাবে দেখাও। কী লুকোনো আছে ওখানে, দেখতে উতলা হয়ে আছি আমি।
রাজ-মিস্ত্রিরা এগিয়ে আসুক! হাঁক দিতেই, চামড়ার থলেতে নিজেদের সরঞ্জাম নিয়ে এগিয়ে এলো মিস্ত্রিদের ছোট্ট একটা দল। ফারাও-এর সমাধি মন্দিরের নির্মাণ কাজ ছেড়ে ওদের নিয়ে এসেছি আমি, নদীর ওপার থেকে।
একজনের হাত থেকে মাপজোকের যন্ত্র নিয়ে কাদার দেয়ালে চিহ্ন আকলাম। এরপর পেছনে সরে, রাজমিস্ত্রিদের নেতাকে আহ্বান জানিয়ে বললাম, ধীরে। দেয়ালচিত্রটা যতোটা সম্ভব রক্ষা করার চেষ্টা করুন। অসাধারণ একটা শিল্পকর্ম ওটা।
