আমি টাইটা–এক সময় ইনটেফের দাস ছিলাম। চিৎকার করে বললাম। দ্রু কুঁচকে আমার পানে তাকালেন রাজা। আমার কিছু বলার আছে, মহান মিশর।
সামনে এসে দাঁড়াওচিকিৎসক। তোমার কী বলার আছে?
নিজের অবস্থান ছেড়ে রাজার সম্মুখে যেতে যেতে ইনটেফের দিকে চাইলাম। আর একটু হলে পড়ে গিয়েছিলাম, এমন তীব্র ঘৃণা তার চোখে-মুখে ।
পবিত্র মিশর–এ ব্যাটা হলো গে চাকর! শান্ত স্বরে বললেন ইনটেফ। একজন। চাকর অভিযুক্ত করবে থিবেসের অভিভাবককে? এ কেমন তামাশা?
রাজ-প্রতাঁকের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিলেন রাজা। তোমার সম্পর্কে আমাদের ভালো ধারণা রয়েছে, ইনটেফ। আইন আমারই তৈরি, আমিই তা লঙ্ঘন করতে পারি। যে কারো মতো প্রকাশের অধিকার আছে উঁচু বা নিচু।
মাথা ঝুঁকিয়ে চুপ করলেন ইনটেফ। কিন্তু চেহারাই বলে দিলো, এবারে ভয় পেয়ে গেছেন।
এবারে, আমার দিকে দৃষ্টি দিলেন রাজা। বেশ অপরিকল্পিত ঘটনাবলি ঘটছে আজ। যা হোক, দাস টাইটা–একটা ব্যাপারে তোমাকে সতর্ক করে দিতে চাই, আজে-বাজে, ভিত্তিহীন কিছু বলার অর্থ হবে মৃত্যুদন্ড।
কেঁপে উঠলাম আমি। যখন ইনটেফের দাস ছিলাম, আমি ছিলাম তার বার্তাবাহক এবং চর।
প্রত্যেকটি শ্রাইক নেতাকে আমি চিনি। ক্রাতাসের জিম্মায় থাকা বন্দীদের দিকে দেখিয়ে বললাম। আমিই ইনটেফের নির্দেশ নিয়ে ওদের কাছে যেতাম!
মিথ্যে কথা! অন্তঃসারশূন্য কোনো প্রমাণ নেই, আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলেন ইনটেফ। কী প্রমাণ আছে?
থামো! হিংস্র কণ্ঠে সাবধান করে দিলেন রাজা। দাস টাইটার সাক্ষ্য শুনবো আমরা। সরাসরি আমার চোখে তাকালেন তিনি।
বাস্তির কাছে আমি নিয়ে যেতাম ইনটেফের নির্দেশ। পিয়াংকি, প্রভু হেরাবের সমস্ত সম্পত্তি ধ্বংসের নির্দেশ ছিলো সেগুলো। আমি জানতাম, রাজ-উজিরের পদ অত্যন্ত আকাঙ্ক্ষিত ছিলো ইনটেফের। তার সমস্ত নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়েছিলো তখন। শেষ হয়ে গিয়েছিলেন প্রভু হেরাব; ফারাও-এর আনুকূল্য-ভালোবাসা হারিয়ে নিরুপায় হয়ে শেষমেষ ধুতুরার বিষ পান করেন তিনি। আমি, টাইটা, এর সাক্ষ্য দিচ্ছি।
ঠিক, বাঁধা-হাত সিংহাসনের দিকে তাক করে বাস্তি। টাইটা যা বলছে প্রতিটি কথা সত্য।
বাক-হার! শ্রাইক নেতারা সমস্বরে বলে উঠে, সত্যি কথা। টাইটার প্রতিটি কথা সত্য।
কিন্তু, এ সবই কথা, রাজা বললেন, প্রমাণ কী?
জীবনের বেশিরভাগ সময় রাজ-উজিরের লিপিকার এবং কোষাধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেছি। সমস্ত হিসাব তাঁর হয়ে আমি রাখতাম। রাহা-খরচ, সম্পদের হিসাব সমস্ত লেখা আছে আমার স্লোলে। শ্রাইকদের দেওয়া মোটা অঙ্কের অর্থের সব কিছু লেখা আছে।
ওই স্ক্রোলগুলো দেখাতে পারবে, টাইটা? ধন-সম্পদের উল্লেখে পূর্ণিমার চাঁদের মতো জ্বলজ্বল করে উঠলো ফারাও-এর মুখাবয়ব। এখন তার পূর্ণ মনোযোগ আমার উপর নিবদ্ধ।
না, ম্যাজেস্টি, পারবো না । ওগুলো সব সময় ইনটেফের কাছে থাকতো।
হতাশা গোপনের কোনো চেষ্টা করলেন না ফারাও; শক্ত মুখে বসে রইলেন । ওদিকে আমি বলে চললাম, স্ক্রোলগুলো আমি দেখাতে পারবো না, কিন্তু আপনার এবং জনগনের যে সমস্ত ধন-সম্পদ ইনটে চুরি করে জমা করেছেন, সেগুলো কোথায় রাখা আছে সম্ভবত সেখানে নিয়ে যেতে পারবো। আমি নিজেই সেই গোপন প্রকোষ্ঠগুলো তৈরি করেছিলাম। শ্রাইক নেতাদের থেকে পাওয়া সমস্ত রত্ন-ভাণ্ডার সেখানে লুকিয়ে রাখা আছে। ফারাও-এর খাজনা আদায়কারীরা সেই সম্পদের কোনো হদিশ পায়নি।
আবারো, আগ্রহের আতিশায্যে সামনে ঝুঁকে বসেন রাজা। সরাসরি না তাকিয়েও, ইনটেফের মনোভাব বুঝতে চাইলাম। বেশ বড়ো একটা ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছি; যেখানে দেখে এসেছিলাম লুকোনো সম্পদ, এখনো সেখানেই আছে এটা ঠিক নাও হতে পারে। তবে এতো বিশাল পরিমাণ সম্পদ অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। আর তাছাড়া, ইনটেফ ভাবতেন আমি মারা গেছি।
মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েছি আমি। দম আটকে রেখে, তামার দরোজায় ইনটেফের প্রতিবিম্ব দেখতে লাগলাম মনোযোগ দিয়ে। তার চেহারার আতঙ্কই যা বলার বলে দিলো জিতে গেছি আমি। যেখানে দেখে এসেছি, ওখানেই আছে সব ধন-সম্পদ। এখন আমি জানি, ফারাওকে গোপন প্রকোষ্ঠে নিয়ে যেতে পারবো আমি।
কিন্তু এতো সহজে হেরে যাওয়ার মানুষ ইনটেফ নন। ডান হাতে কিছু একটা ইশারা করলেন তিনি, ঠিক বুঝলাম না, কার উদ্দেশ্যে। যখন বুঝলাম, বড়ো দেরি হয়ে গেছে।
উত্তেজনায় এতোক্ষণ র্যাসফারের কথা ভুলে গেছিলাম। ইনটেফের ইশারায়, শিকারী কুকুরের মতো ঝট করে লাফিয়ে উঠলো সে। সমস্ত হিংস্রতা নিয়ে আমার উদ্দেশ্যে ঝাঁপিয়ে পড়লো র্যাসফার। মাত্র দশ গজ দূর থেকে তলোয়ার বাগিয়ে ছুটে আসছে সে।
ক্রাতাসের দুইজন যোদ্ধা র্যাসফারের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে। দুই জনকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দেয় র্যাসফার, একজন হুমড়ি খেয়ে গিয়ে পড়ে ট্যানাসের সামনে, ওর পথ আটকে। অসহায় আমি দাঁড়িয়ে রইলাম র্যাসফারের সম্মুখে, দুই হাতে তলোয়ার উঁচিয়ে ধরে সে যেনো আমার খুলি ফুটো করে পুরো সেঁধিয়ে দেবে ফলা। নড়াচড়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেললাম।
জানি না, কীভাবে, নিজের তলোয়ার ছুঁড়ে দিয়েছিলো ট্যানাস। সময় ধীরে বয়ে যেতে লাগলো আমার জন্যে, মনে হলো, শূন্যে তলোয়ারের প্রতিটি ঘূর্ণন দেখতে পারছি। পুরো এক পাক ঘোরার আগেই হাতলটা আছড়ে পড়লো র্যাসফারের মাথায়। ঠিক ঝড়ো বাতাসে নাড়া খাওয়া গাছের শাখার মতো ল্যাগব্যাগিয়ে উঠলো র্যাসফারের ঘাড়; কোটড়ের মধ্যে পাক খেলো চোখ দুটো।
