অন্যদের মতো তাকে অবশ্য টেনে সরিয়ে নেওয়া হলো না। তার উদ্দেশ্যে ট্যানাস বললো, রাজাকে বলো–পিয়াংকি, প্রভু হেরাবকে কী তুমি চিনতে?
নিশ্চয়ই। তার সাথে আমার ব্যবসা ছিলো।
কী সেই ব্যবসা? ভয়ঙ্কর কণ্ঠে জানতে চায় ট্যানাস।
তার ক্যারাভানগুলো ধ্বংস করেছিলাম আমি। ফসল জ্বালিয়ে দিয়েছি, সেস্রাতে তার খনিগুলোতে হানা দিয়ে তার লোকজনকে মেরেছি। পুড়িয়ে দিয়েছি তার আবাস। আমার লোকজন পাঠিয়ে শহরে তার নামে কুৎসা রটিয়েছি, যাতে করে তার সততা আর একনিষ্ঠতায় কালি পড়ে। অন্যদেরকেও ইন্ধন জুগিয়েছি তার অনিষ্ঠ সাধনে। শেষমেষ, নিজের পাত্র হতে ধুতুরা বিষ খেয়ে মরেছে ব্যাটা।
রাজ্যের প্রতীক হাতে ধরা আঙুলগুলো কাঁপছে ফারাও-এর–লক্ষ্য করলাম ।
কার নির্দেশে এগুলো করেছিলে?
ইনটেফ। এক টাখ বিশুদ্ধ সোনা উপহার হিসেবে আমাকে দিয়েছিলেন তিনি।
প্রভু হেরাবকে ধ্বংস করে ইনটেফের কী লাভ?
দাঁত বের করে হাসলো বাস্তি। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললো, ইনটেফ হলেন রাজ উজির; আর কোথায় পিয়াংকি? কবরে।
তুমি স্বীকার করছো, আমার নিকট থেকে কোনোরকম চাপের বশবর্তী না হয়ে এগুলো বলছো? জানো, এর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড?
মৃত্যু? অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বাস্তি। জীবনেও ওটাকে ভয় পাইনি আমি। কত শত জনকে মরণ উপহার দিয়েছি, ইয়ত্তা নেই। আর এখন আমি ভয় পাবো?
ট্যানাসের চোখে খুনে দৃষ্টি। তলোয়ারের বাটে ধরা হাত সাদা হয়ে গেছে তার।
নিয়ে যাও একে! হুঙ্কার ছাড়ে সে। রাজার শাস্তির জন্যে অপেক্ষা করুক! নিজের সাথে যুদ্ধ করে ভাবাবেগ সামলালো সে। রাজার সম্মুখে হাঁটু গেড়ে বসলো।
যা কিছু আপনি আমাকে বলেছিলেন, অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি মহান মামোস, কেমিট-এর প্রভু। আপনার পরবর্তী আদেশের অপেক্ষায় থাকলাম।
অনুভব করলাম, কি যেনো একটা দলা পাকিয়ে গেছে গলার ভেতর।
এখনো নীরবতা বজায় রয়েছে মন্দিরের ভেতরে । লসট্রিসের বড়ো বড়ো শ্বাসের শব্দ পাচ্ছি।
মুখ খুললেন ফারাও। বিস্ময়ের ব্যাপার, দ্বিধা আর হতাশা তাঁর কণ্ঠে। যেনো এ সব সত্যি, এ তিনি মেনে নিতে পারছেন না। এতো গভীর বিশ্বাস ছিলো তার ইনটেফের প্রতি, নাড়া খেয়ে গেছেন।
লর্ড ইনটেফ, তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনেছো? কী বলার আছে তোমার?
মহান ফারাও, এগুলো কোনো অভিযোগ হলো? ইর্ষা আর হিংসার আগুনে জ্বলতে থাকা একজন মাথা গরম তরুণের কল্পনা এসব। একজন ঘৃণ্য আসামী এবং বিশ্বাসঘাতকের পুত্রের কাছ থেকে এর বেশি কী আশা করেন আপনি? ট্যানাসের উদ্দেশ্যে পরিষ্কার। তার ধারণা, বিশ্বাসঘাতক পিয়াংকি আমার স্থানে রাজ-উজির হতো। যেনো তার বাবার অধঃপতনের জন্যে আমি দায়ী!
তাচ্ছিল্যের সাথে ট্যানাসের কথা উড়িয়ে দিলেন ইনটেফ। এতো চমৎকার অভিনয়ের সামনে আরো দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লেন রাজা। সন্দেহ গাঢ় হচ্ছে তার।
আর শ্রাইকদের নেতাদের সাক্ষ্য? জানতে চাইলেন ফারাও। সে সম্পর্কে কী বলবে?
নেতা? ইনটে যেনো আকাশ থেকে পড়লেন। এ ধরনের উপাধি দিয়ে ওদের সম্মান দেওয়ার কী আছে? বদমাশের শিরোমণি এরা খুনী, চোর, ধর্ষকামী । জঙ্গলের প্রাণীর মতো কতকগুলো লোকের কথায় বিশ্বাস করার কোনো মানে হয় না। সত্যিই, অর্ধ-নগ্ন, হাত-বাঁধা লোকগুলোকে জম্ভর মতোই দেখাচ্ছে। তাকান ওদের দিকে, পবিত্র ফারাও। এদেরকে দিয়ে তো মার আর অর্থের বিনিময়ে যে কোনো কিছু বলিয়ে নেওয়া সম্ভব। আপনার সেবক একজনের বদলে এদের কথা শুনবেন আপনি?
হালকা করে মাথা নাড়লেন ফারাও, ঠিক যেমন করে বন্ধুর কথায় সায় দেয় মানুষ।
সত্যি। তোমার সেবা আমি সব সময় পেয়েছি। আর এই বদমাশগুলো সত্যিই জংলী। হতে পারে, তাদের হয়তো মিথ্যে বলানো হচ্ছে।
ফাঁক পেয়ে গেছেন ইনটেফ।
এ পর্যন্ত কেবল শুনেই গেলাম, মহান প্রভু। নিশ্চই, সত্যিকারের কোনো প্রমাণ আছে আমার বিরুদ্ধে? মুখের কথা নয়, এই মিশরে কি এমন কেউ আছেন যার কাছে আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ আছে? থাকলে, সামনে এসে দাঁড়াক সে। আমি জবাবদিহি করবো।
একেবারে হকচকিয়ে গেছেন ফারাও এই কথায়। মন্দির প্রাঙ্গনে দৃষ্টি বুলিয়ে যেনো কাউকে খুঁজলেন।
ট্যানাস, বর্বর এই লোকগুলোর মুখের কথা ছাড়া আর কি প্রমাণ আছে তোমার কাছে?
নিজের সমস্ত চিহ্ন ভালো মতোই মুছে এসেছে সে। স্বীকার গেলো ট্যানাস। ইনটেফের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই আমার কাছে। কিন্তু, নিশ্চই কারো না কারো কাছে আছে। এমন কেউ, যে আজকের ঘটনাবলিতে সাহস পেয়ে মুখ খুলবে। হে মহান মিশর, আপনি আপনার লোকেদের জিজ্ঞেস করুন–এমন কেউই কি নেই, যার কাছে কোনো প্রমাণ আছে?
ফারাও, এ যে ইন্ধন জোগানো। এখন আমার শত্রুরা উৎসাহিত হয়ে মিথ্যে বলবে, করুণ স্বরে বলে উঠলেন ইনটেফ। কিন্তু হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিলেন ফারাও। মিথ্যে কথা বললে নিজেদের কবর নিজেরাই খুঁড়বে তারা। এরপর, জনতার উদ্দেশ্যে আহ্বান জানালেন ফারাও।
হে আমার দাসেরা! থিবেস-এর নাগরিক! আমার বিশ্বস্ত, প্রিয় উজিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনেছো তোমরা। কারো কাছে ট্যানাসের বক্তব্যের প্রমাণ থাকলে সামনে এসে দাঁড়াও!
কিছু বোঝার আগেই দেখি, দাঁড়িয়ে পড়েছি আমি। নিজের কণ্ঠস্বরের প্রাবল্যে নিজেই চমকে গেলাম।
