অসাধারণ গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেলো মন্দিরের ভেতরে। ইনটেফের হাতে নির্যাতিত বহু লোক আছে এখানে, যারা তাকে দারুনভাবে ঘৃণা করে; কিন্তু একটি কণ্ঠও আনন্দ উল্লাসে মত্ত হয়না। সবাই জানে, তার ক্ষমতার পরিধি কতো ব্যাপক। বাতাসে যেনো তাদের ভীতির গন্ধ পেলাম আমি। প্রত্যেকে জানে, এমনকি ট্যানাসের অর্জন, তার শক্তিমত্তা পর্যন্ত কোনোরকম প্রমাণ ছাড়া ইনটেফের বিরুদ্ধে করা এই অভিযোগ থেকে তাকে রক্ষা করার জন্যে যথেষ্ট নয়। আর এই অনুষঙ্গে আনন্দ প্রকাশ করার অর্থ হলো নিশ্চিত মৃত্যু।
এরই মাঝে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন ইনটেফ। তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে ট্যানাসের দিকে পিঠ ফিরিয়ে সরাসরি ফারাও-এর উদ্দেশ্যে বললেন, মরুর সূর্যে সম্ভবত বেচারার মগজ পুড়ে গেছে। পাগল হয়ে গেছে সে। এক বর্ণও সত্যি নয়, যা সে বলছে। আমার হয়তো রাগ করা উচিত, কিন্তু একজন দক্ষ যোদ্ধার এহেন অধঃপতনে দারুন দুঃখ পেলাম। দুই হাত উঁচু করে মর্যাদার সাথে বলে চললেন ইনটেফ। সারাজীবন ফারাও আর তার লোকেদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছি। আমার মর্যাদা এমন নয় যে, কোনো পাগলের কথায় প্রতিবাদ করতে হয়। কোনোরকম দ্বিধা ছাড়াই পবিত্র সিংহাসনের সিদ্ধান্তে আস্থা পোষণ করলাম নিজেরে জিহ্বার চেয়ে আমার কর্ম এবং ফারাও-এর প্রতি আমার ভালোবাসা আমার হয়ে কথা বলুক।
রাজার প্রসাধন-চর্চিত মুখে ফুটে উঠলো দ্বিধা আর সিদ্ধান্তহীনতা লক্ষ্য করলাম আমি। ঠোঁট কাঁপছে, ভ্রু কুঞ্চিত। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা তার কোনো কালেই ছিলো না। কিছু সময় পর মুখ খুললেন তিনি, কিন্তু কিছু বলার আগেই তরবারি উঁচিয়ে মঠের খোলা প্রবেশ পথের দিকে ইশারা করে ট্যানাস।
এমন অদ্ভুত মানুষের কাফেলা প্রবেশ করতে থাকে মঠে, বিস্ময়ে মুখ ঝুলে পড়লো ফারাও-এর। লোকগুলোর নেতৃত্বে রয়েছে ক্ৰাতাস; তার পেছন পেছন শুধুমাত্র নেংটি পড়া, খালি হাত-পায়ের মানুষ হেঁটে আসছে। হাত পিছমোড়া করে বাঁধা ঠিক যেনো দাস বিক্রির হাটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের।
ইনটেফের চেহারার দিকে চেয়ে ছিলাম আমি। দেখলাম, ঘটনার আকস্মিকতায় আঁতকে উঠেছেন তিনি, যেনো কিছু একটা আঘাত করেছে মুখে। বন্দী লোকগুলোকে অবশ্যই চিনেছেন তিনি, হয়তো ভেবেছিলেন, বহু আগেই মারা গেছে তারা। লিনেনের পর্দা দিয়ে আড়াল করা ছোট্ট দরোজার দিকে আড়চোখে তাকালেন বার কয়েক। একমাত্র ওখান দিয়ে সম্ভব পলায়ন করা। কিন্তু এগিয়ে এসে দরোজা আটকে দাঁড়ালো রেমরেম, পালানোর সমস্ত পথ এখন রুদ্ধ। সিংহাসনের দিকে তাকিয়ে এবারে গলার স্বর্ণের হারে হাত বোলালেন ইনটেক; আত্মবিশ্বাসী ভাবভঙ্গি।
হাত বাঁধা অবস্থায় সিংহাসনের সামনে এসে দাঁড়ালো ছয় বন্দী। ক্রাতাসের নরম স্বরের আদেশে হাঁটু গেড়ে মাথা নিচু করলো তারা।
এরা কারা? জানতে চাইলেন ফারাও। প্রথমজনের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো ট্যানাস, বাধা-হাত ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে দিলো। বন্দীর চামড়ায় গুটি বসন্তের বিচ্ছিরি দাগ, অন্ধ চোখটা রুপোর মুদ্রার মতো ধ্বক ধ্বক করছে।
মহান ফারাও তোমার পরিচয় জানতে চাইছেন, নরম স্বরে বললো ট্যানাস। তার প্রশ্নের উত্তর দাও!
মহান মিশর, আমি শুফতি, বলে উঠে বন্দী। আমি শাইকদের একজন নেতা ছিলাম। কিন্তু আকহ্ হোরাস, তার বাহিনী নিয়ে গালালা মরুতে আমার বাহিনী ধ্বংস করেছে।
রাজাকে বলো–কে তোমায় আদেশ দিতো?
আকহ,সেথ্ ছিলেন আমার প্রভু। উত্তরে বলে চলে শুফতি। রক্ত শপথ করেছি তার প্রতি, লুটের এক চতুর্থাংশ তাকে দিয়ে এসেছি। বদলে, আইনের হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়ে এসেছেন তিনি, আমার শিকারদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।
যাকে আকহ্ সেথ বলে জানো, দেখাও তাকে! গর্জে উঠে নির্দেশ দেয় ট্যানাস। যেনো নিতান্ত অনিচ্ছায় ধীরে হেঁটে ইনটেফের সামনে দাঁড়ায় শুফতি। একগাদা থুতু ছুঁড়ে মারে রাজ-উজিরের পরিপাটি পোশাকে। এ-ই হলো আকহ্ সেথ্! নরকে পঁচে মরুক শালা!
একপাশে টেনে নিয়ে যায় ক্ৰাতাস তাকে। পরবর্তী বন্দীকে টেনে দাঁড় করিয়ে দেয় ট্যানাস, বলো, কে তুমি।
আমি আখেকু, শাইকদের নেতা ছিলাম। আমার সমস্ত লোক নিহত এখন।
কে ছিলো তোমার নির্দেশদাতা? কাকে লুটের বখরা দিতে তুমি?
ইনটেফ ছিলেন আমার মালিক। তাকে বখরা দিয়ে এসেছি আমি।
গর্বিত ভঙ্গিতে ঠায় বসে রইলেন ইনটেফ, যেনো এ সবে তার কিছুই আসে যায় না। একের পর এক শ্রাইক নেতা রাজা সামনে এসে সত্য বয়ান করতে থাকে, কোনো প্রতিবাদ করলেন না ইনটেফ।
ঠিক গরমের মতোই অসহ্য হয়ে উঠে মন্দির প্রাঙ্গনের নীরবতা। ঘৃণা, নিঃশব্দ আতঙ্ক, অথবা অবিশ্বাস আর দ্বিধা নিয়ে তাকিয়ে রইলো জনতা। কিন্তু একজনও ইনটেফের বিরুদ্ধে কোনো শব্দ করার সাহস দেখালো না।
শেষ দস্যু নেতাকে ইনটেফের সামনে হাজির করানো হলো। লম্বা, পাতলা গড়নের মানুষ সে, রোদে-পোড়া চামড়া । এর রক্ত বেদুইনের কালো চোখ, উঁচু নাক। ঘন, কোঁকড়ানো দাড়ি, হাবভাবে হামবড়া।
আমার নাম বাস্তি, সবচেয়ে পরিষ্কার স্বরে বলে উঠলো সে। লোকজন অবশ্য আমাকে নিষ্ঠুর বাস্তি বলে জানে–কেনো, কে জানে! হেসে উঠে যোগ করলো বাস্তি । আমি ছিলাম শ্রাইকদের বাহিনীর একজন নেতা, আকহ হোরাস আমার লোকজনকে মেরে ফেলেছে। ইনটেফ আমার নেতা।
